ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দেশটির রাজনীতি ততই দুই প্রধান প্রার্থীর দিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ৪ অক্টোবরের প্রথম দফার নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বোলসোনারোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দুজনের ব্যবধান খুবই কম। ২৪ সেপ্টেম্বরের দাতাফোলহা জরিপে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফায় লুলা ৪৭ শতাংশ এবং ফ্লাভিও ৪৫ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন; অন্য একটি জরিপে ব্যবধান পরিসংখ্যানগতভাবে প্রায় সমান ছিল।
নির্বাচনটি শুধু দুই রাজনৈতিক পরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। ব্রাজিলের সামনে একই সঙ্গে রয়েছে সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি, উচ্চ সুদ, সামাজিক ব্যয়, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন। দুই প্রার্থীই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলছেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কঠিন কোন পদক্ষেপ কীভাবে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়।
বিপুল সম্পদের দেশ, তবু অর্থনৈতিক চাপ
ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম সম্পদসমৃদ্ধ দেশ। দেশটির রয়েছে বিপুল কৃষি উৎপাদন, তেল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুত। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। কৃষি খাতেও ব্রাজিল বিশ্ববাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। একই সঙ্গে বিরল খনিজের মজুত দেশটিকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।
কিন্তু এসব সম্ভাবনা অর্থনৈতিক সমস্যাকে দূর করতে পারেনি। উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগ ও ভোগে চাপ তৈরি করছে। সরকারি ঋণও বড় উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের হাতে অবকাঠামো, শিক্ষা ও অন্যান্য খাতে স্বাধীনভাবে ব্যয় করার সুযোগ কমছে।
লুলার সরকার সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়েছে। সম্প্রতি তার সরকারের প্রধান সামাজিক কর্মসূচি বোলসা ফামিলিয়ার ভাতাও বাড়ানো হয়েছে। সরকারের যুক্তি, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং এই সমন্বয় প্রয়োজন। তবে সমালোচকেরা বলছেন, সামাজিক ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ফ্লাভিও বোলসোনারো ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোরতার কথা বলছেন। কিন্তু তার ক্ষেত্রেও কোন খাতে কতটা কাটছাঁট করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তরুণদের জন্য ব্যয় ও পেনশন বড় চাপ
ব্রাজিলের বাজেটের বড় অংশই এমন খাতে ব্যয় হয় যা সহজে কমানো যায় না। পেনশন ও বিভিন্ন সামাজিক সুবিধার সঙ্গে ন্যূনতম মজুরি ও অন্যান্য সূচকের সম্পর্ক থাকায় সরকারি ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়তে পারে।
এর ফলে সরকারের হাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য অর্থ কমে যায়। অথচ ব্রাজিলের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন ব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং বিভিন্ন কর-ছাড়ও বিতর্কের বিষয়। অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এসব সুবিধা কমানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন। ফলে যে প্রেসিডেন্টই নির্বাচিত হন, তাকে কংগ্রেস, বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী এবং সামাজিক চাপের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।
বোলসোনারো পরিবারের প্রভাব
ফ্লাভিও বোলসোনারো সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর বড় ছেলে এবং ডানপন্থী লিবারেল পার্টির প্রার্থী। তার প্রচারণায় বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ফ্লাভিও তার বাবার ক্ষমতাসীন সময়ের রাজনৈতিক অবস্থানকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি জাইর বোলসোনারোর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন এবং তাকে ক্ষমা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তার প্রচারণা নিয়ে আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারোর সঙ্গে আর্থিক যোগাযোগের অভিযোগকে ঘিরে। এ বিষয়ে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং তিনি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারণায় কঠোর অপরাধ দমন, রক্ষণশীল সামাজিক নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে তার সম্ভাব্য সরকার ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলে কী পরিবর্তন আনবে, সেটিও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পের প্রভাব
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে বোলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ব্রাসিলিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে।
বিশেষ করে ব্রাজিলের বিরল খনিজের মজুত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের আগ্রহ বাড়ছে। বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ব্রাজিল ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে।
লুলা অবশ্য বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি ব্রাজিলের নির্বাচনে বাইরের প্রভাবের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন এবং দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
লুলার সামনে অর্থনীতি ও প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ
লুলা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সামাজিক কর্মসূচি, দারিদ্র্য কমানো এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দিয়েছেন। তার বর্তমান সরকারের সময়ে বন উজাড় কমানোর নীতিও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে।
তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, তথ্যকেন্দ্র এবং বিরল খনিজের মূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে তোলার কথা বলেছেন। অর্থাৎ শুধু কাঁচামাল রপ্তানি না করে ব্রাজিলেই প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
কিন্তু এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা অর্থের জোগান। সরকারি আর্থিক চাপের মধ্যে একই সঙ্গে সামাজিক ব্যয়, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও শিল্পে বড় বিনিয়োগ করা কঠিন।
লুলার বয়সও নির্বাচনী আলোচনায় এসেছে। তিনি ৮০ বছর বয়সে আবার প্রেসিডেন্ট পদে লড়ছেন। তবে বয়স নিয়ে ব্যক্তিগত মন্তব্যের বদলে নির্বাচনের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে তার সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং পরবর্তী মেয়াদে সংস্কার বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পথ।
দুর্নীতি ও বিচারব্যবস্থার সংকট
নির্বাচনের ওপর ছায়া ফেলেছে ব্যাংক মাস্টারকে ঘিরে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিও। ব্যাংকটির মালিক ড্যানিয়েল ভোরকারোকে ঘিরে তদন্তে রাজনীতিক ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয় সামনে এসেছে। তদন্ত এখনো চলমান এবং অভিযোগগুলোর সবগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
এই ঘটনায় ব্রাজিলের রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফ্লাভিও এই ইস্যুকে তার রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে লুলা ব্যক্তিগতভাবে এই মামলায় অভিযুক্ত নন, যদিও তার রাজনৈতিক শিবিরের কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে বিভিন্ন তদন্ত ও অভিযোগ রয়েছে।
এ কারণে এবারের নির্বাচনে দুর্নীতি শুধু প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয় নয়; বরং ব্রাজিলের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করছে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
কংগ্রেস ছাড়া সংস্কার কঠিন
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট এককভাবে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার করতে পারেন না। কংগ্রেসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কংগ্রেসের সদস্যদের হাতে সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাবও বেড়েছে।
ফলে নতুন প্রেসিডেন্টকে বাজেট সংস্কার, পেনশন, কর-ছাড়, সরকারি কর্মচারীদের সুবিধা এবং বিনিয়োগের মতো কঠিন বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা করতে হবে।
এখানেই নির্বাচনের পরবর্তী সময়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রেসিডেন্ট যে-ই হন, কংগ্রেসে পর্যাপ্ত সমর্থন ছাড়া তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় অংশ বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
ব্রাজিলের সামনে সুযোগও কম নয়
রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ব্রাজিলের শক্তির জায়গাগুলোও স্পষ্ট। দেশটির কৃষি উৎপাদন, তেল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিরল খনিজ এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্পদের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বড় সরবরাহ ব্রাজিলকে তথ্যকেন্দ্র, কম কার্বনযুক্ত শিল্প এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের নতুন সুযোগ দিতে পারে।
দেশটির গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অতীতের সামরিক শাসন, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক সংকট পেরিয়ে ব্রাজিল অনেক দূর এগিয়েছে।
তাই ২০২৬ সালের নির্বাচনকে শুধু লুলা ও ফ্লাভিও বোলসোনারোর ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হবে নতুন সরকার কীভাবে অর্থনৈতিক চাপ সামলাবে, কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করবে, দুর্নীতি ও প্রতিষ্ঠানগত সংকট মোকাবিলা করবে এবং দেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে কাজে লাগাবে।
সাম্প্রতিক জরিপে লড়াইটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখা যাচ্ছে, তবে জরিপ কোনো নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করে না। ৪ অক্টোবরের প্রথম দফা এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী দফার ফলই শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের রাজনৈতিক পথ নির্ধারণ করবে।











