চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তাকে মার্কিন অস্ত্র কেনার বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন দাবি করেছেন চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ। তবে পরে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রির কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তাব নেই।
রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পারডিউ বলেন, শি জিনপিং গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরে গেলে ট্রাম্প তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে আগ্রহী কি না।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে আলোচনার সময় পারডিউ এই মন্তব্য করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্প শিকে বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। এরপর তিনি চীনা প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করেন, চীনও মার্কিন অস্ত্র কিনতে চায় কি না। তবে কথোপকথনটি ঠিক কখন হয়েছিল বা শি কী জবাব দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে পারডিউ বিস্তারিত কিছু জানাননি।
পারডিউর এই মন্তব্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের নতুন মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজের অনুমোদনের অপেক্ষা চলছে। ট্রাম্প এর আগে তাইওয়ানের জন্য ওই অস্ত্র প্যাকেজকে চীনের সঙ্গে আলোচনায় একটি ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ রয়েছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে দেখে এবং দ্বীপটির কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির তীব্র বিরোধিতা করে। অন্যদিকে, তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি রয়েছে।
তাইওয়ান সম্পর্কিত মার্কিন নীতিতে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অর্থাৎ, চীন তাইওয়ানে সামরিক হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন ইচ্ছাকৃতভাবেই স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি।
মার্কিন আইনে তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে। তবে চীনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পারডিউর বক্তব্য প্রকাশের পর হোয়াইট হাউস নিউইয়র্ক টাইমসকে জানায়, চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রির কোনো পরিকল্পনা নেই।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আইন চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ করে। দপ্তরটি আরও স্পষ্ট করে বলেছে, বেইজিংয়ের কাছে অস্ত্র বিক্রির ‘কোনো প্রস্তাব বা পরিকল্পনা’ নেই।
ফলে পারডিউর বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—ট্রাম্পের মন্তব্যটি কি কেবল বৈঠকের সময় করা একটি প্রশ্ন ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো বাস্তব নীতিগত চিন্তা ছিল। এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো, চীনের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির কোনো উদ্যোগ নেই।
এদিকে, তাইওয়ান চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছে। তাইওয়ানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চেন মিং-চি বলেছেন, চীনের সামরিক হুমকি গুরুতর। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বেইজিং তার সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরের সময়ও তাইওয়ান গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, শি ট্রাম্পকে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার’ বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্প শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর তাইওয়ান বিষয়ে শি তার অবস্থান বুঝেছেন বলে মন্তব্য করলেও পারডিউর বর্ণিত অস্ত্র কেনার প্রসঙ্গটি নিজে প্রকাশ্যে আর তোলেননি।
এর আগে শুক্রবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পারডিউ নিজেও বলেছিলেন, তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্পের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। অস্ত্র বিক্রির নীতিও অপরিবর্তিত রয়েছে বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে, শি-ট্রাম্প বৈঠকে মার্কিন অস্ত্র কেনার বিষয়ে কথিত ওই প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের একটি অস্বাভাবিক দিক সামনে এনেছে। তবে হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, বেইজিংয়ের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই। একই সময়ে তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ এবং দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের বিরোধও অব্যাহত রয়েছে।












