যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে পাঁচজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ব্রিটিশ পুলিশ। বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ঘাঁটিটি ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান ব্যবহারের কারণে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের হুমকির মধ্যে ছিল।
রোববার ভোরে পশ্চিম ইংল্যান্ডের রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির দিকে তিনটি বড় সাদা ভ্যান যাওয়ার খবর পাওয়ার পর পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে। ব্রিটিশ কাউন্টার টেররিজম কর্মকর্তারা তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে ইরানের কোনো ধরনের যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে রাশিয়ার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কিংবা ইসলামপন্থী কোনো ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাও তদন্তে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ আটক ব্যক্তিদের পরিচয় বা তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সন্দেহভাজনরা ‘বড় ধরনের ক্ষতি’ করার পরিকল্পনা করছিলেন। তাদের বিষয়ে ব্রিটিশ ও মার্কিন কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই তদন্ত করছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তবে ব্রিটিশ পুলিশের প্রকাশ্য বক্তব্যে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের ওই দাবির সব তথ্যের সমর্থন মেলেনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, ঘটনাটি গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক কোনো অভিযান ছিল না। যদিও ঘটনার আগেই ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল।
স্থানীয় এক কৃষক জানান, তিনি কয়েকজন ‘মাথা ও মুখ ঢাকা’ ব্যক্তিকে মাঠের দিকে দৌড়ে যেতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। বিবিসি রেডিওকে তিনি বলেন, তার জরুরি ফোনকলের কারণেই সন্দেহভাজনদের পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়ে থাকতে পারে।
তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, ওই কৃষকের কাছে ঘটনার ‘আংশিক চিত্র’ ছিল। চলমান তদন্তের মধ্যে তিনি সন্দেহভাজনদের উদ্দেশ্য নিয়ে অনুমান করতে চাননি।
তবে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ইরানের সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ইরান ও তাদের মিত্রগোষ্ঠীগুলো ব্রিটেনের ক্ষতি করতে চায় এবং দেশটির স্বার্থ ও মিত্রদের নিরাপত্তার জন্য নিয়মিতভাবে ইরানের হুমকি মোকাবিলা করতে হয়।
ইরানকে ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে জাতীয় সন্ত্রাসবাদী হুমকির মাত্রা ‘সিভিয়ার’ বা গুরুতর অবস্থায় রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে উত্তর লন্ডনে ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থাপনা ও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনার পর দেশটির হুমকির মাত্রা ‘সাবস্ট্যানশিয়াল’ থেকে বাড়িয়ে ‘সিভিয়ার’ করা হয়। এর অর্থ, আগামী ছয় মাসের মধ্যে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফেয়ারফোর্ডে আটক পাঁচজনের ঘটনাটিও এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাজ্য ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য হামলা ও নাশকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ব্রিটিশ পুলিশ জানিয়েছে, ইহুদি সম্প্রদায় কিংবা ইরানের ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনার ক্ষেত্রেও ইরানের সঙ্গে যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মে মাসে যুক্তরাজ্য ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। লন্ডনের অভিযোগ ছিল, তারা যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা এবং হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। তবে ইরান বরাবরই যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশে হামলা বা ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ফেয়ারফোর্ডে পাঁচজন আটকের পর যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও দেশটির নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। সেখানে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকতে এবং নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, সমাবেশ ও সংগঠনগুলো বাড়তি ঝুঁকিতে থাকতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
এর পর ব্রিটেনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বিমানঘাঁটির নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে।
ইরানে হামলায় ব্যবহৃত ঘাঁটি
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে এই ঘাঁটি থেকে বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালানোর অনুমতি দিয়েছে। ওই হামলার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালানো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা।
এর আগে জুলাইয়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড ব্রিটেনকে সতর্ক করে বলেছিল, ফেয়ারফোর্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান ইরানে হামলা চালালে ঘাঁটিটি বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই হুমকির পর ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে। রোববারের ঘটনার পর ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির চারপাশে ৪০০ মিটার এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ। নিরাপত্তার কারণে ৮৫টি বাড়ির বাসিন্দাদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের একটি রোবটকে তিনটি সাদা ভ্যানের আশপাশে কাজ করতে দেখা যায়। ঘাঁটির প্রধান প্রবেশপথে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং অন্য প্রবেশপথগুলো ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবিতে আটক কয়েকজনকে দেখা গেছে বলে দাবি করা হলেও ছবিগুলোর উৎস ও সত্যতা রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
আটক ব্যক্তিদের ব্যবহৃত একটি ভ্যানে ‘ফুয়েল ২ইউ’ লেখা ছিল। ব্রিটেনে ডিজেল সরবরাহকারী একই ধরনের নামের একটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ওই ভ্যানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ভ্যানটি কিংবা আটক ব্যক্তিদের কেউই তাদের পরিচালক, কর্মী বা বর্তমান ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নন।
ফেয়ারফোর্ডের ঘটনা এখন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের জন্য একাধিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—আটক ব্যক্তিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তারা কোনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কি না এবং ইরানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্নের কোনোটি নিয়েই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।












