নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবার ও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক অংশীদারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক কংগ্রেসীয় তদন্ত শুরু হতে পারে। ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক চুক্তি, ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সরকারি সুবিধা পাওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডকে সম্ভাব্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্র্যাটরা তদন্তের জন্য সমন জারি করার ক্ষমতা এবং অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের সুযোগ পাবেন। ফলে নির্বাচনের পরপরই তদন্তের প্রস্তুতি শুরু করে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন নথি ও তথ্য চাওয়া হতে পারে। এসব তদন্ত দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে গড়াতে পারে এবং ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদের দ্বিতীয়ার্ধে বড় রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলতে পারে।
ক্যাপিটল হিলের একাধিক কর্মকর্তা, আইনপ্রণেতা ও আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরে তার পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বাজারসহ বিভিন্ন খাতে ট্রাম্প পরিবারের প্রবেশ ঘটেছে। একই সময়ে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় ২২০ কোটি ডলার বেড়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য তদন্তের বিষয়ে সাবেক রিপাবলিকান হাউস স্পিকার মাইক জনসনের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা আইনজীবী অ্যাশলি ক্যালেন বলেন, ডেমোক্র্যাটরা দ্রুত নথি চাইতে পারেন এবং আগের মতো সময়ক্ষেপণের সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিসও ১৭ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে তারা প্রথম দিন থেকেই অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনবেন।
তবে হোয়াইট হাউস সম্ভাব্য তদন্তের সমালোচনা করেছে। মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের আমেরিকান জনগণের জীবন উন্নত করার কোনো পরিকল্পনা নেই; বরং তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিকে বাধাগ্রস্ত ও ভিত্তিহীনভাবে টার্গেট করার পরিকল্পনা করছে।

কেন ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা বড় লক্ষ্য
কংগ্রেসের তদন্তের ক্ষেত্রে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ হোয়াইট হাউসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাহী বিশেষাধিকারের কথা বলে সব ধরনের তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকার সুযোগ সাধারণত পায় না।
ডেমোক্র্যাটদের নজরে থাকা সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান এবং তার ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ১৭৮৯ ক্যাপিটাল। তবে এখনো তদন্তের কোনো চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও প্রতিনিধি জেমি রাসকিন।
ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও সম্ভাব্য তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করেছে এবং জনসংযোগ ও সংকট ব্যবস্থাপনার পরামর্শ নিচ্ছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন করপোরেট আইনজীবী, সংকট ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও কংগ্রেসের কর্মকর্তারা।
কুশনারের ব্যবসাও তদন্তের আওতায়
ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও সম্ভাব্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারেন। ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেমি রাসকিন বলেছেন, কুশনারের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্সের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজতন্ত্র ও সরকারগুলোর সম্পর্ক নিয়ে তিনি তথ্য জানতে চান।
কুশনার বর্তমানে শান্তি বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করছেন। একই সময়ে তার প্রতিষ্ঠান সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তি করেছে। রাসকিন এ সম্পর্ককে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
তবে কুশনারের আইনজীবী চ্যাড মিজেল অভিযোগগুলোকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, কুশনার কোনো প্রযোজ্য আইন বা বিধি লঙ্ঘন করেছেন—এমন একটি নির্দিষ্ট উদাহরণও এখন পর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেনি।

১৭৮৯ ক্যাপিটাল ও ৬২০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ
ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি নজর রয়েছে বিরল মাটির খনিজ নিয়ে কাজ করা ভলকান এলিমেন্টসের দিকে। পেন্টাগন প্রতিষ্ঠানটিকে ৬২০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দেয় ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ১৭৮৯ ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের প্রায় তিন মাস পর।
রাসকিন প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি চুক্তি বা অনুকূল নীতির সুবিধা পেতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানে ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ বিনিয়োগের বিষয়টি কীভাবে কাজ করেছে।
তবে ভলকান এলিমেন্টস জানিয়েছে, পেন্টাগনের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিনিয়োগকারীদের কোনো সহায়তা চাইতে বলা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি কংগ্রেসের সঙ্গে ভালো বিশ্বাসে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে।
অন্যদিকে ১৭৮৯ ক্যাপিটাল কংগ্রেসের সম্ভাব্য তদন্ত মোকাবিলায় শীর্ষ আইন প্রতিষ্ঠান কুইন ইমানুয়েলকে নিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বৈধ কংগ্রেসীয় নজরদারিকে তারা স্বাগত জানায়, কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোও নজরে
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে করপোরেট সম্পর্কের আরেকটি ক্ষেত্র তেল ও গ্যাস শিল্প। ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেলডন হোয়াইটহাউস সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলার অনুদান চাওয়ার পর এসব কোম্পানি করছাড়, ভর্তুকি ও শিথিল পরিবেশগত বিধির সুবিধা পেয়েছে।
এই অভিযোগও ভবিষ্যৎ কংগ্রেসীয় তদন্তের একটি সম্ভাব্য পথ খুলে দিতে পারে।
রিপাবলিকানদের কেউ কেউও তদন্তে যোগ দিতে পারেন
সম্ভাব্য তদন্ত নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে অবশ্য ভিন্নমত রয়েছে। নর্থ ডাকোটার রিপাবলিকান সিনেটর কেভিন ক্রেমার বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা যদি ট্রাম্প ও তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দেন, তাহলে ভোটারদের কাছ থেকে উল্টো প্রতিক্রিয়া পেতে পারেন।
তবে সব রিপাবলিকান যে তদন্তের বিরোধিতা করবেন, এমনটাও নয়। উটাহর নতুন রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস ইতোমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের কিছু ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে রাশিয়ার এক ধনকুবের ট্রাম্প জুনিয়রের বাহামাসে বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচ বহন করার অভিযোগের বিষয়টি তিনি তদন্তের আওতায় আনার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এ কারণে ভবিষ্যতে কিছু তদন্তে দলীয় বিভাজন আগের তুলনায় কম হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
করপোরেট নির্বাহীদের জন্যও ঝুঁকি
ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা কোম্পানিগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কংগ্রেসের তদন্তে দ্রুত সহযোগিতা করলে ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আবার সহযোগিতা না করলে কংগ্রেসের সঙ্গে আইনি সংঘাত, নির্বাহীদের ব্যক্তিগত আইনি ঝুঁকি এবং ভোক্তাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
আইনজীবী কেভিন এডগার বলেন, কংগ্রেসের যেকোনো তদন্তের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সুনামের ঝুঁকি জড়িত থাকে।
ইতোমধ্যে কিছু কোম্পানি কংগ্রেসের তথ্যের অনুরোধ হোয়াইট হাউসের কাছে পাঠাতে শুরু করেছে। এর একটি উদাহরণ ক্লার্ক কনস্ট্রাকশন। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বলরুম নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের বাড়তে থাকা ব্যয় সম্পর্কে তথ্য দিতে বলা হলে তারা জানায়, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এ ধরনের তথ্য হোয়াইট হাউসের মাধ্যমেই দিতে হবে।
তবে ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল সতর্ক করে বলেছেন, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে তিনি কংগ্রেসের সমন জারির ক্ষমতা ব্যবহার করবেন।
ফলে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণই নির্ধারণ করবে না; ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা, রাজনৈতিক দাতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করপোরেট সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন এক সংঘাতের সূচনাও করতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা সত্যিই যদি কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পরবর্তী সময়টি নীতি ও নির্বাচনী রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে কংগ্রেসীয় তদন্তের চাপেও কাটতে পারে।












