পাকিস্তানে শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা এখন আর শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশজুড়ে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার প্রায় ২ হাজার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে সিনেটর শেরি রহমানের উদ্ধৃত পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় চারটি ঘটনা কর্তৃপক্ষের কাছে এসেছে। বছরের পর বছর জনমত, সরকারি প্রতিশ্রুতি এবং শিশু সুরক্ষা জোরদারের নানা দাবি থাকলেও এই পরিসংখ্যান দেশটির শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার দিকটি সামনে এনেছে।
পরিসংখ্যানের আরও কিছু দিক পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের প্রায় ৪৩ শতাংশ ভুক্তভোগী শিশুর পরিচিত ছিলেন। প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে শিশুদের নিজেদের বাড়ির ভেতরে। মোট ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে পাঞ্জাব থেকে। আবার ৫৭ শতাংশ ঘটনা শহরাঞ্চল এবং ৪৩ শতাংশ গ্রামীণ এলাকা থেকে রিপোর্ট হয়েছে। এসব তথ্য দেখায়, শিশু নির্যাতনকে শুধু কোনো নির্দিষ্ট এলাকা, শ্রেণি বা আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র ধরা পড়বে না।
বিশেষ করে অভিযুক্তদের একটি বড় অংশ শিশুর পরিচিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর কাছে পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং পরিচিত পরিবেশ সাধারণত নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু নির্যাতনের ঘটনা যদি সেই পরিবেশের মধ্যেই ঘটে, তাহলে শিশুর জন্য সাহায্য চাওয়ার পথ অনেক কঠিন হয়ে যায়। পরিবারের সদস্য বা কর্তৃত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত হলে শিশুটি শাস্তির ভয়, অবিশ্বাস, সামাজিক কলঙ্ক কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় মুখ খুলতে নাও পারে।
এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনার পর পাকিস্তানে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়। রাজনৈতিক নেতারা বিবৃতি দেন, সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়, কমিটি গঠিত হয় এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। কিন্তু কয়েক দিন পর অন্য কোনো ঘটনা বা ইস্যু সামনে এলে সেই মনোযোগ অনেক সময় কমে যায়। বছরের পর বছর এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ইঙ্গিত দেয়, ক্ষোভ ও নিন্দার পর যে প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা যথেষ্ট ধারাবাহিক হয়নি।
শিশু সুরক্ষায় তাই সাময়িক কোনো প্রচারাভিযানের বদলে প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যা নিয়মিত ও কার্যকরভাবে কাজ করবে। শিশু ও তাদের পরিবার যেন নিরাপদে নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে পারে, অভিযোগ পেশাদারভাবে তদন্ত হয়, ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি বা চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হয়—এগুলোকে একটি কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্যাতন ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিরোধকেও নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
পুলিশের কাছে প্রায় ৮৯ শতাংশ ঘটনার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি ইতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু অভিযোগ নথিভুক্ত করাই পুরো প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র। অভিযোগের পর কত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে তদন্ত হয়, ফরেনসিকসহ অন্যান্য প্রমাণ কতটা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়, মামলা নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগে, পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকলে কতগুলো মামলায় কার্যকর বিচার হয়—এসব প্রশ্নই আসলে ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। একই সঙ্গে তদন্ত ও বিচার চলাকালে শিশুটি নিরাপদ আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বিচারপ্রক্রিয়াই কখনো কখনো একটি শিশুর জন্য নতুন মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। নির্যাতনের পর একটি শিশুকে পুলিশ, চিকিৎসক, তদন্তকারী, আইনজীবী ও আদালতের মুখোমুখি হতে হয়। একই ঘটনার বর্ণনা বারবার দিতে হলে বা সংবেদনশীলতার অভাবে প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হলে শিশুর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিচারব্যবস্থাকে শুধু অপরাধের তদন্ত ও বিচার করার জায়গা হিসেবে নয়, ভুক্তভোগী শিশুকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।
এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ছড়িয়ে আছে। প্রাদেশিক সরকারগুলোকে শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত অর্থ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বড় শহর নয়, প্রত্যন্ত এলাকাতেও যেন শিশুরা সেবা পায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের শিশু ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আচরণ, অভিযোগ তদন্ত এবং প্রমাণ সংরক্ষণ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একইভাবে সরকারি কৌঁসুলিদের কার্যকরভাবে মামলা পরিচালনার সক্ষমতা এবং আদালতের দ্রুত ও শিশুবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষক, চিকিৎসক এবং অন্যান্য পেশাজীবীরা অনেক সময় শিশুর আচরণ, শারীরিক অবস্থা বা মানসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্যাতনের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখতে পারেন। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে কীভাবে অভিযোগ জানাতে হবে এবং শিশুকে কোথায় সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে হবে—এ বিষয়ে তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। সামাজিক কল্যাণ বিভাগ ও শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গে এসব ব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি, যাতে কোনো অভিযোগ একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে না যায়।
প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সংস্থা অবহেলা, দুর্বল প্রক্রিয়া কিংবা সমন্বয়ের অভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতা শনাক্ত করার এবং সংশোধনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতটি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। অভিযোগের পর কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তদন্ত কতটা কার্যকর হয়েছে এবং শিশুর নিরাপত্তা ও অধিকার কতটা নিশ্চিত হয়েছে—এসবও বিবেচনায় আনতে হবে।
পরিবার ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা ও অভিভাবকদের শিশু নির্যাতনের সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে শিশু অস্বস্তিকর বা ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বললে তাকে দোষারোপ বা অবিশ্বাস না করে গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশু ও তার পরিবারের প্রতি সামাজিক কলঙ্কের প্রবণতা কমানোও জরুরি।
তবে শিশু সুরক্ষার পুরো দায়িত্ব শুধু বাবা-মায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি শিশুর পরিচিত বা তার ওপর কর্তৃত্ব রাখেন, তাহলে শিশুটির পক্ষে নিজে থেকে প্রতিবাদ বা অভিযোগ করা কঠিন হতে পারে। তার বয়স, নির্ভরশীলতা, ভয় এবং সামাজিক অবস্থান—সবকিছু বিবেচনায় রেখে সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধার ভিত্তিতে নয়, শিশুর প্রয়োজন ও ঝুঁকির ভিত্তিতে ব্যবস্থা সাজানো জরুরি।
শিশু নির্যাতন নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে। কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো ঘটনাগুলো মোট ঘটনার পূর্ণ চিত্র নয়। ভয়, সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক চাপ, সচেতনতার অভাব কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর সীমিত সুযোগের কারণে অনেক ঘটনা রিপোর্ট নাও হতে পারে। তাই নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা গেলে কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি, কোন ধরনের শিশু বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কী ধরনের নির্যাতন বারবার ঘটছে এবং কোথায় সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েছে—এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
পাকিস্তানে শিশু সুরক্ষা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। উদ্বেগ, নিন্দা এবং ‘শূন্য সহনশীলতা’র মতো বক্তব্যও এখন পরিচিত। কিন্তু শুধু ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের যোগ তৈরি করা।
শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত বোঝা যাবে কয়েকটি বাস্তব প্রশ্নের মাধ্যমে—নির্যাতনের ঘটনা কমছে কি না, ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আগেই সাহায্য পাচ্ছে কি না, অভিযোগ দ্রুত ও পেশাদারভাবে তদন্ত হচ্ছে কি না এবং বিচারপ্রক্রিয়ার পুরো সময়ে ভুক্তভোগী শিশু সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছে কি না। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জবাবদিহির মুখোমুখি করাও নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৬ সালের মাত্র ছয় মাসে প্রায় ২ হাজার ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য তাই এমন একটি সতর্কবার্তা, যা পরবর্তী কোনো আলোচিত ঘটনার আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাকিস্তানের প্রয়োজন স্থায়ী, পর্যাপ্ত অর্থায়নপ্রাপ্ত এবং জবাবদিহিমূলক শিশু সুরক্ষা কাঠামো—যা নির্যাতনের আগে প্রতিরোধে, ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় এবং পরবর্তী সময়ে শিশুর নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
শিশুরা প্রতিটি ঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। তাই কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর শুধু ক্ষোভ প্রকাশ নয়, এমন একটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে নির্যাতন প্রতিরোধ করা যায়, অভিযোগের দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় এবং কোনো শিশু তার ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের পরিণতি একা বহন করতে বাধ্য না হয়।












