ইরান থেকে ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফে শিয়া মুসলিম ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের যাতায়াতের জন্য ফ্লাইট চালুর ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি অবগত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রটি জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির আওতায় এই সীমিত ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ছাড়ের ফলে ইরাকের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ইরাকি এয়ারওয়েজ এক মাসের জন্য ইরান ও নাজাফের মধ্যে যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে। পরে এই ছাড় আরও দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইরান থেকে যাওয়া এবং ইরানে যাওয়ার সব ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছিল ইরাক।
বাগদাদের জন্য কঠিন ভারসাম্য

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদির সরকারের ওপর চাপ কমাতেই ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে। ইরাক একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি ইরানের সঙ্গেও দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধ জোরদার করায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ইরানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কমাতে বাধ্য হচ্ছে। তবে ইরাকের মতো দেশগুলোর জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ ইরানের সঙ্গে ইরাকের রয়েছে শক্তিশালী ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ।
জায়েদির কার্যালয় গত সপ্তাহান্তে জানিয়েছিল, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ধর্মীয় তীর্থযাত্রার জন্য ইরান ও ইরাকের মধ্যে যাতায়াতে ছাড় চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবেদন করেছে বাগদাদ।
একজন ইরাকি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নাজাফগামী ফ্লাইটের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান-নাজাফ বিমান চলাচল আবার শুরু হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
শুধু ইরাক নয়, আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগেও চাপ

ইরানের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বন্ধ করার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকসহ কয়েকটি দেশ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বড় ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ একের পর এক বন্ধ করা হলে তারাও আঞ্চলিক বিমান চলাচল সীমিত বা বন্ধ করার মতো পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।
ইরান ও ইরাকের মধ্যে বিমান যোগাযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিয়া মুসলিম তীর্থযাত্রী ইরান থেকে ইরাকে যান। তাদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য নাজাফ ও অন্যান্য ধর্মীয় শহর।
নাজাফ শিয়া ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও শিক্ষাকেন্দ্র। শহরটিতে ইমাম আলীর মাজার অবস্থিত। একই সঙ্গে সেখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন সক্রিয় ইসলামী কবরস্থানগুলোর একটি। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ধর্মীয় কারণে নাজাফে ভ্রমণ করেন।
নিষেধাজ্ঞার রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা
ইরান থেকে নাজাফে সরাসরি বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, ইরাকের শিয়া জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অনুসারী, আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইরাকের গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানির ধর্মীয় নেতৃত্ব অনুসরণ করে। নাজাফের সঙ্গে এই ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
ফ্লাইট বন্ধের মতো পদক্ষেপ এই বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ইরাক সরকারের বিরুদ্ধে একই অবস্থানে নিয়ে আসতে পারে। এতে ইরানের প্রভাব কমানোর মার্কিন প্রচেষ্টাই উল্টো বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় বাগদাদ ফ্লাইট চালুর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন আশ্বাস দিয়েছে। সূত্রটি জানিয়েছে, ইরাক কঠোর যাত্রী যাচাই, তথ্য বিনিময় এবং নিরাপত্তা তদারকির ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি এসব ফ্লাইট যাতে অস্ত্র, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ব্যক্তি কিংবা অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের কাজে ব্যবহার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরাক।
ফলে নাজাফগামী ফ্লাইটে সীমিত ছাড়ের সিদ্ধান্তটি শুধু ধর্মীয় যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন-তেহরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার বড় হিসাবও।










