মালয়েশিয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর প্রথম ধাপ শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার প্রায় দেড় হাজার জনকে ফেরত পাঠানো হয়। মালয়েশিয়া সরকারের ভাষ্য, মোট ৫ হাজার জন স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রোহিঙ্গা কতজন, তা স্পষ্ট করা হয়নি। মালয়েশিয়ার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বৃহস্পতিবার কড়া আপত্তি জানিয়েছেন জাতিসংঘের একজন বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কুয়ালালামপুরে ইউএনএইচসিআরের কার্যালয়ের সামনে শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটকের পর এই পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছিল।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ বলেছেন, রাখাইনে সশস্ত্র সংঘাত ও ব্যাপক সহিংসতা চলছে। সেখানে সব পক্ষই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। তাই নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সত্যিকারের স্বেচ্ছায় ফেরার পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। রাখাইনের বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরগুলোর অবস্থা অকল্পনীয় পর্যায়ে খারাপ হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি মালয়েশিয়াকে চলমান প্রত্যাবাসন বন্ধ করে জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্য, রাখাইনে সব পক্ষের সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে রোহিঙ্গা বেসামরিক মানুষের ওপর নতুন নৃশংসতার খবর আসছে। চলমান গৃহযুদ্ধ মিয়ানমার থেকে নতুন শরণার্থীর স্রোতও তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক আইনে বিপদের মুখে কাউকে ফেরত না পাঠানোর যে নীতি আছে, সেটি মানার কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।
এর আগে ১৬০টির বেশি নাগরিক সংগঠন যৌথ বিবৃতিতে প্রত্যাবাসন বন্ধের দাবি জানায়। তাদের আশঙ্কা, ফেরার পর রোহিঙ্গাদের জোর করে সামরিক বাহিনী, আরাকান আর্মি কিংবা আরসার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হতে পারে। সংগঠনগুলো ফিলিস্তিন প্রশ্নে মালয়েশিয়ার সোচ্চার অবস্থানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রতি আচরণের বৈপরীত্যও তুলে ধরেছে। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়া সফরে আমন্ত্রণ জানাবেন। প্রত্যাবাসন দ্রুত করাই এর উদ্দেশ্য। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, কর্মসূচিটি স্বেচ্ছামূলক। আরও সাড়ে তিন হাজার জনকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনাও নিশ্চিত করেছে দেশটি।
বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনা সরাসরি প্রাসঙ্গিক। কক্সবাজার ও ভাসানচরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আছেন। প্রায় এক দশক ধরে ঢাকা তাঁদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু রাখাইনের পরিস্থিতির কারণে টেকসই প্রত্যাবাসন এখনো শুরু হয়নি। এ বছর জাতিসংঘের রোহিঙ্গা সহায়তা আবেদনও তহবিল সংকটে ছেঁটে ৭১ কোটি ডলারে নামানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকের হিসাবে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ৩৫ শতাংশ এখন সংকট পর্যায়ের ক্ষুধায় ভুগছেন। মালয়েশিয়ার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কীভাবে এগোয়, তা আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান বোঝার একটি পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। ফেরত যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে খারাপ খবর এলে বাংলাদেশের ক্যাম্পেও আতঙ্ক ছড়াতে পারে। আবার ফেরার পর নতুন করে কেউ পালিয়ে এলে চাপ বাড়বে বাংলাদেশের সীমান্তেই।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন আটককেন্দ্রে বর্তমানে মিয়ানমারের ১০ হাজার ৩৮৮ জন নাগরিক আছেন। প্রত্যাবাসনের জন্য রাজি হওয়া ৫ হাজার জন সেই সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ ফেরত পাঠানোর তালিকা তৈরি হচ্ছে মূলত আটক মানুষদের মধ্য থেকে। আটক অবস্থায় দেওয়া সম্মতি কতটা স্বেচ্ছায়, সেই প্রশ্নই এখন মালয়েশিয়ার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কর্মসূচির সবচেয়ে বড় বিতর্ক।












