কোয়ান্টাম যুগে সাইবার নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে ভারত। দেশটি প্রথমবারের মতো ফ্রি-স্পেস কোয়ান্টাম কী ডিস্ট্রিবিউশন বা কিউকেডি প্রযুক্তির মাধ্যমে ৫ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার দূরত্বে নিরাপদ যোগাযোগ স্থাপনের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সম্ভাব্য হুমকি থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার প্রযুক্তি উন্নয়নে ভারতের সক্ষমতার একটি নতুন দিক সামনে এসেছে।
ভারতের কোয়ান্টাম-নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান কিউনু ল্যাবস, ভাস্করাচার্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস অ্যাপ্লিকেশনস অ্যান্ড জিও-ইনফরমেটিকস বা বিসাগ-এন এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি গান্ধীনগরের যৌথ উদ্যোগে এই পরীক্ষা চালানো হয়।
গত ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে পরীক্ষাটি পরিচালিত হয়। এতে বিসাগ-এন এবং আইআইটি গান্ধীনগরের মধ্যে ৫ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার দূরত্বে একটি নিরাপদ কোয়ান্টাম যোগাযোগ চ্যানেল স্থাপন করা সম্ভব হয়।
কিউনু ল্যাবসের তৈরি ‘পয়েন্টিং, অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ট্র্যাকিং’ ব্যবস্থা ব্যবহার করে পরীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়। এতে কোয়ান্টাম বিট এরর রেট ৫ শতাংশের নিচে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি সেকেন্ডে ২৩০ থেকে ২৬০ বিট হারে নিরাপদ কী বা গোপন সংকেত তৈরি করা হয়েছে।
পরীক্ষায় তৈরি করা এসব নিরাপদ কী বিসাগ-এনের ‘বেদিক কবচ’ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মে কোয়ান্টাম-পরবর্তী ক্রিপ্টোগ্রাফি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক বার্তা সফলভাবে এনক্রিপ্ট ও ডিক্রিপ্ট করার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যকরভাবে প্রদর্শন করা হয়।
এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এতে কোয়ান্টাম নিরাপত্তার দুটি স্তর একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম স্তরে রয়েছে কিউনু ল্যাবসের হার্ডওয়্যারভিত্তিক কিউকেডি যন্ত্র ‘আর্মোস’। এটি ফ্রি-স্পেস অপটিক্যাল চ্যানেলের মাধ্যমে নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদান করে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে বিসাগ-এনের সফটওয়্যারভিত্তিক কোয়ান্টাম-পরবর্তী ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবস্থা। এর সঙ্গে কোয়ান্টাম র্যান্ডম নম্বর জেনারেশন প্রযুক্তিও যুক্ত রয়েছে।
এই সমন্বিত ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হলো যোগাযোগের কোয়ান্টাম চ্যানেল কোনো কারণে সাময়িকভাবে অকার্যকর হয়ে গেলেও নিরাপত্তার স্তর ধরে রাখা। অর্থাৎ শুধু একটি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা একসঙ্গে ব্যবহার করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিসাগ-এনের মহাপরিচালক বিনয় ঠাকুর বলেন, কিউনু ল্যাবসের কিউকেডি প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের সফটওয়্যারকে একীভূত করা বাস্তবভিত্তিক ও কোয়ান্টাম-সহনশীল যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
কিউনু ল্যাবসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুনীল গুপ্তার মতে, ৫ দশমিক ৫৬ কিলোমিটারের এই সফল পরীক্ষা ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ দূরত্বে কোয়ান্টাম-নিরাপদ নেটওয়ার্ক তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। একই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে স্যাটেলাইটভিত্তিক কোয়ান্টাম যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত অনেক এনক্রিপশন পদ্ধতি ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। এ কারণে এখন থেকেই এমন প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা চলছে, যা ভবিষ্যৎ কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের যুগেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুরক্ষিত রাখতে পারবে।
ফ্রি-স্পেস কিউকেডির সুবিধা হলো, এতে প্রচলিত ফাইবার-অপটিক অবকাঠামোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় না। খোলা বাতাসের মধ্য দিয়ে আলোক সংকেত ব্যবহার করে নির্দিষ্ট দুটি স্থানের মধ্যে কোয়ান্টাম কী আদান-প্রদান করা যায়। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি দূরবর্তী এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অবকাঠামো এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ভারতের এই পরীক্ষাকে তাই শুধু একটি প্রযুক্তিগত প্রদর্শনী হিসেবে নয়, বরং কোয়ান্টাম যুগের নিরাপদ যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।












