ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় তিগ্রে অঞ্চলে আবারও ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি বাহিনী তিগ্রের রাজধানী মেকেলের আলুলা আবা নেগা বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে। গত সপ্তাহে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো বিমানবন্দরটি দখল করেছিল। ২০২২ সালে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এটিই তিগ্রেতে সবচেয়ে বড় সহিংসতার ঘটনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণে সরকারি বাহিনী
শনিবার বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা বেনামি সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে জানায়, ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনী মেকেলের বিমানবন্দরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইথিওপীয় জেনারেল বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, বিমানবন্দরটি এখন সামরিক বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি একটি মানবিক সহায়তা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, সরকারি বাহিনী মেকেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় বিদ্রোহী যোদ্ধারা শহর ছেড়ে যাচ্ছিল।
তবে মেকেলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে, সে বিষয়ে ইথিওপিয়ার সরকার বা বিদ্রোহী পক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকা এবং গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় পরিস্থিতির নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা
মেকেলের নিয়ন্ত্রণ হারানো তিগ্রের পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংগঠনটি সম্প্রতি উত্তর ইথিওপিয়ার আরও কয়েকটি সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট গঠন করেছে।
চলতি বছরের শুরুতে তিগ্রেতে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগ করা প্রশাসনকে সরিয়ে দিয়ে টিপিএলএফ আবারও অঞ্চলে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে। পরে যুদ্ধকালীন সাবেক আঞ্চলিক নেতা ডেব্রেতসিয়ন গেব্রেমাইকেলকে আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট করা হয়।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের ইথিওপিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স নতুন করে শুরু হওয়া বিদ্রোহী হামলা মোকাবিলা করছে। ২৩ সেপ্টেম্বর টিপিএলএফ মেকেলের বিমানবন্দর দখলের পাশাপাশি প্রতিবেশী আফার ও আমহারা অঞ্চলে সরকারি অবস্থানেও হামলা চালায়। শুরুতে বিদ্রোহীরা কিছু সাফল্য পেলেও চলতি সপ্তাহে সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে তাদের অগ্রযাত্রা থেমে যায়।
টিপিএলএফের দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস

১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইথিওপিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি ছিল টিপিএলএফ। সংগঠনটি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকার উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করছে।
বৃহস্পতিবার ডেব্রেতসিয়ন গেব্রেমাইকেল এক বিবৃতিতে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা হামলা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। ২০২০ সালে মেকেলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরও টিপিএলএফ একই ধরনের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছিল।
২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিগ্রের গৃহযুদ্ধে ৬ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় ফের বড় ধরনের মানবিক ও আঞ্চলিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হর্ন অব আফ্রিকায় বাড়ছে উত্তেজনা
তিগ্রের সংঘাত শুধু ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। উত্তরাঞ্চলের নতুন সহিংসতা হর্ন অব আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
ইথিওপিয়া দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া, সুদান ও মিসর তিগ্রের বিদ্রোহীদের সহায়তা দিচ্ছে। তিন দেশই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর মধ্যেই গত সপ্তাহে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। দুই দেশই কূটনীতিক বহিষ্কার এবং দূতাবাস বন্ধের পদক্ষেপ নেয়।

আফ্রিকান ইউনিয়ন ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া ও মিসরের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে।
টিপিএলএফ নেতা ডেব্রেতসিয়ন এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, এই যুদ্ধ আঞ্চলিক রূপ নিয়েছে এবং এর সঙ্গে লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। ফলে তিগ্রেতে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত এখন ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি পুরো হর্ন অব আফ্রিকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
তিগ্রেতে নতুন সংঘাত, মেকেলে, ইথিওপিয়া, টিপিএলএফ, ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া উত্তেজনা এবং লোহিত সাগর ঘিরে আঞ্চলিক অস্থিরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।












