কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংস্কারকাজ পরিদর্শনের সময় প্রকৌশলী ফারহানা হকের মৃত্যুকে ঘিরে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ১৯৮৮ ব্যাচের প্রকৌশলীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিরাপত্তাব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।
রোববার রাজধানীর বনানীতে বুয়েট গ্র্যাজুয়েট ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানায় বুয়েট ১৯৮৮ ব্যাচ শিক্ষার্থী কল্যাণ ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে ফারহানার পরিবার দুর্ঘটনার কারণ ও তদন্তের ফল নিয়ে স্বচ্ছ, স্বাধীন ও লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার ১৮ দিনের মাথায় মৃত্যু
ফারহানা হক আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠান এনরুট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট আইওএমের কক্সবাজার অবকাঠামো ইউনিটে জ্যেষ্ঠ মাঠ প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন তিনি।
দুই বছরের এক শিশুসন্তানের মা ফারহানা ২৪ আগস্ট উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৩-এর আইওএম পরিচালিত একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংস্কারকাজ পরিদর্শনের সময় দুর্ঘটনার শিকার হন। পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাত্র ১৮ দিনের মাথায় প্রাণ হারান তিনি।
তদন্ত ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
ফারহানার পরিবারের অভিযোগ, দুর্ঘটনার কারণ বা তদন্তের ফল সম্পর্কে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। এ বিষয়ে তারা ৩ ও ১২ সেপ্টেম্বর আইওএমকে ই-মেইল করে ঘটনার প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তাব্যবস্থার বিবরণ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি জানায়।
১৭ সেপ্টেম্বর আইওএম পরিবারকে জানায়, ঘটনাস্থলের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সেখানে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ ও নথিপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময়কার দৃশ্য সিসিটিভিতে ধরা পড়েনি। অন্যদিকে এনরুট ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তাদের পর্যালোচনা ও তদন্ত এখনো চলছে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়নি।
বুয়েটের রাসায়নিক ও পেশাগত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার এবং নিয়োগকর্তার আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি নিরাপত্তার শেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তদন্তে দেখতে হবে, চালু জেনারেটরের ঘূর্ণায়মান অংশ যথাযথভাবে আবদ্ধ ছিল কি না এবং সংস্কারকাজের এলাকা নিরাপদভাবে পৃথক করা হয়েছিল কি না।
পাশাপাশি ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত তদারকি এবং জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল কি না, তাও তদন্তে খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। দুর্ঘটনাটি বাংলাদেশ শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী যথাযথভাবে রিপোর্ট করা হয়েছিল কি না, সেটিও যাচাইয়ের আহ্বান জানানো হয়।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
ফারহানার বাবা প্রকৌশলী এ কে ফজলুল হক মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে চান। তাঁর প্রশ্ন, ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল কি না।
সংবাদ সম্মেলন থেকে আইওএম বাংলাদেশ ও এনরুট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে পরিবারের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সব প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।












