লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলা বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। টানা পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া, নতুন কর্মসংস্থানের সংকট এবং পরিবারের ভরণপোষণের চাপ মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
২০ বছরের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হঠাৎ বন্ধের নোটিশ
রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়া এলাকায় অবস্থিত বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ চলতি বছরের ১৫ মে হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কারখানার ফটকে স্থায়ীভাবে বন্ধের নোটিশ ঝুলিয়ে দেয় মালিকপক্ষ।

কারখানাটির ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকদের অনেকেই এখন দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। শুক্রবার কারখানা এলাকায় অন্তত ১২ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রায় সবার পরিস্থিতি একই। কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কেউ স্বামী বা বাবা হারিয়ে সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
৩৫ বছর বয়সী রহিমা আক্তার (ছদ্মনাম) প্রায় ১০ বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করতেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর কলেজপড়ুয়া দুই মেয়ে ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে সংসার চালাচ্ছিলেন মাসে ছয় হাজার টাকা বেতনে। কারখানা বন্ধ হওয়ায় এখন পুরো পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে নারী শ্রমিকরা
পুরুষ শ্রমিকদের অনেকে বিকল্প কাজ খুঁজে পেলেও নারী শ্রমিকদের বড় অংশ নতুন কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। সোনাপুর এলাকার শ্রমিক সুমি আক্তার জানান, যুবতী ও মধ্যবয়সী নারীরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।
শ্রমিকদের ভাষ্য, স্থানীয় শিল্পাঞ্চলেও যোগাযোগ করা হয়েছে, কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বিশেষ করে বিধবা ও একমাত্র উপার্জনক্ষম নারীদের পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম, হাবিবুর রহমান ও মানিক হোসেনও জানান, সামান্য সঞ্চয় দিয়ে এতদিন চললেও স্থানীয় বাজারে নতুন কাজের সুযোগ কম এবং মজুরিও তুলনামূলকভাবে কম।
ব্যাংকিং জটিলতায় বন্ধ কারখানা

কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে ব্যাংকঋণসংক্রান্ত জটিলতা ও আর্থিক সংকটের কথা জানিয়েছে মালিকপক্ষ। বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী টিপু সুলতান ও প্রশাসনের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার বিপ্লব পাল জানান, দীর্ঘ ২০ বছর লাভ-ক্ষতির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ব্যাংকিং জটিলতার কারণে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেননি।
তাদের দাবি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাংকিং সুবিধা পুনরুজ্জীবিত করে কারখানাটি পুনরায় চালুর সুযোগ দিলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ফিরে আসতে পারে।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার জানান, ব্যাংক সুবিধাজনিত সংকটের কারণেই কারখানাটি বন্ধ হয়েছে বলে তাঁরা জেনেছেন। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ ও পরিস্থিতি সমাধানে কয়েক দফা বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ স্থায়ীভাবে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে।
পুনরায় চালুর দাবি
কারখানা বন্ধের আগে বকেয়া বেতন পরিশোধ ও প্রতিষ্ঠানটি চালুর দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভও করেছিলেন। এখন তাঁরা দ্রুত বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং কর্মসংস্থান ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
রায়পুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া বলেন, বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে হাজারো পরিবারের জীবিকা জড়িত ছিল। তাই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করতে সরকারের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।












