ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় বড় চমক দেখিয়েছেন ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করে তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সঙ্গে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে মুখোমুখি হওয়ার টিকিট পেয়েছেন। ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে এই চূড়ান্ত লড়াই।
প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। লুলা পেয়েছেন প্রায় ৪৫ শতাংশ। অথচ ভোটের আগে বিভিন্ন বেসরকারি জরিপে লুলা প্রায় তিন শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। ফলে বলসোনারোর এই ফলাফল ব্রাজিলের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
নির্বাচনের আগে ব্রাজিলের মানুষের প্রধান উদ্বেগের জায়গায় ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্নীতি, অপরাধ ও নিরাপত্তা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ। একই সময়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থানও ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে।
ফল প্রকাশের পর ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের বলসোনারো বলেন, ব্রাজিল পরিবর্তন চায় এবং ফলাফলে তিনি খুবই খুশি। তিনি দাবি করেন, লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসানের সময় এসেছে।

ফ্লাভিও বলসোনারো সাবেক ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজয়ের পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের মামলায় জাইর বলসোনারো দোষী সাব্যস্ত হন এবং বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখেই এবার প্রেসিডেন্ট পদে লড়ছেন তার ছেলে ফ্লাভিও।
অন্যদিকে, সাও পাওলোতে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় লুলা জানান, তিনি প্রথম দফাতেই জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে এখন তিনি দ্বিতীয় দফার নতুন প্রচারাভিযানে নামবেন বলে জানান।
লুলা বলেন, আগামী দিন থেকেই নতুন প্রচার শুরু হবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কী কী করেছেন এবং তার সরকারের কাজের ফল কী, সেসব ভোটারদের সামনে তুলে ধরবেন তিনি।
জরিপকে ভুল প্রমাণ করলেন বলসোনারো
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জরিপের সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের এত বড় পার্থক্য। ইগারাপে ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মুগাহ বলেন, জরিপকারীরা বড় ধরনের ভুল করেছেন। তার মতে, দ্বিতীয় দফার যেসব জরিপে দুই প্রার্থীর লড়াই প্রায় সমানে সমান দেখানো হচ্ছে, সেগুলোও বলসোনারোর প্রকৃত সমর্থনকে কম দেখাতে পারে।
নির্বাচনের দিন সকালে রিও ডি জেনেইরোতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বলসোনারো জানিয়েছিলেন, তিনি এমন ভোটারদের সমর্থনের ওপরও নির্ভর করছেন, যারা অন্য কোনো প্রার্থীকে ভোট দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু লুলার বিরোধিতা করেন।
সাও পাওলোতে ভোট দিতে যাওয়ার সময় ৪১ বছর বয়সী আইনজীবী থাইসে লিমা জানান, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল লুলার ওয়ার্কার্স পার্টিকে ক্ষমতা থেকে সরানো। তিনি বলেন, ফ্লাভিওকে তিনি সেরা প্রার্থী মনে করেন না, তবে দ্বিতীয় দফায় তাকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তার পছন্দের আরেকজন ছিলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক অগুস্তো কুরি, কিন্তু তিনি নির্বাচনে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেননি।
৪৯ বছর বয়সী ব্যবস্থাপনা পরামর্শক ফার্নান্দো টেম্পেলও প্রথমে মিনাস জেরাইস রাজ্যের সাবেক গভর্নর রোমেউ জেমাকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ফ্লাভিও বলসোনারোকেই ভোট দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাফায়েল ফাভেত্তির মতে, এই প্রতিবাদী ভোট দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে তার মতে, এই ধরনের ভোটের বড় অংশ ইতোমধ্যেই ফ্লাভিওর দিকে চলে এসেছে। ফলে দ্বিতীয় দফায় নতুন করে সমর্থন বাড়ানোর ক্ষেত্রে তার জন্য কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও অপরাধ বড় ইস্যু
ব্রাজিলের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও লুলা ভোটারদের একটি বড় অংশকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি। দেশে বৈষম্য কমেছে এবং বেকারত্বও নিচের দিকে রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনো উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবারের ঋণের চাপ এবং অপরাধ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
দেশটির বিভিন্ন এলাকায় গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফ্লাভিও বলসোনারো এই অসন্তোষকে নিজের নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগিয়েছেন।
অন্যদিকে লুলা অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। নির্বাচনী লড়াই ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার সরকার সামাজিক সহায়তা বাড়িয়েছে এবং পরিবারগুলোর ঋণের চাপ কমাতে নতুন ঋণ-সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে।
তবে অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে সরকারি ব্যয় ও ঋণ। দেশটির সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের ৮২ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে সরকার চলতি বছর ও আগামী বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ব্রাসিলিয়ায় ভোট দেওয়া ৫২ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা মার্সিয়ানো দে সুজা এ সিলভা বলেন, তিনি এমন একটি ব্রাজিলের জন্য ভোট দিয়েছেন, যেখানে অর্থনীতি আবার শক্তিশালীভাবে বাড়তে শুরু করবে।
নীতিগত বিতর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কেলেঙ্কারি
নির্বাচনী প্রচারে অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নীতি নিয়ে বিস্তারিত বিতর্কের সুযোগ খুব বেশি তৈরি হয়নি। দুই প্রধান প্রার্থীই গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন বিতর্কগুলো এড়িয়ে গেছেন। ফলে নির্বাচনী প্রচারের বড় অংশজুড়ে ছিল রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা।
এ ক্ষেত্রে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ব্যাংকো মাস্টার। ব্যাংকটির প্রধান ড্যানিয়েল ভোরকারোকে চলতি বছরের শুরুতে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বহু বিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির একটি পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তবে তিনি ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ ব্যাংকারটির সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের যোগাযোগ নিয়ে তদন্ত করছে। তদন্তে ফ্লাভিও বলসোনারোর নামও এসেছে এবং তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের সন্দেহে তদন্ত চলছে। বলসোনারো অবশ্য কোনো ধরনের অন্যায় করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়েও উদ্বেগ
নির্বাচনের আগে ব্রাজিলের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও আলোচনায় ছিল। লুলার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্ররা সতর্ক করে বলেছিলেন, তিনি জয়ী হলে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। এর পেছনে তারা ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।
ট্রাম্প এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেননি। তবে তিনি ফ্লাভিও বলসোনারোকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং প্রকাশ্যে তার প্রশংসাও করেছেন। ফলে ব্রাজিলের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

নির্বাচনের আগে ব্রাজিলের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ফ্রান্স ও জার্মানির একটি প্রতিনিধিদলকে সম্ভাব্য মার্কিন ও রুশ হস্তক্ষেপের বিষয়ে অবহিত করেছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নির্বাচনের দিন ব্রাজিলের নির্বাচন আদালতের প্রধান কাসিও নুনেস মার্কেস জানান, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
সামনে এখন ২৫ অক্টোবরের লড়াই
প্রথম দফার ফলাফল ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। জরিপে পিছিয়ে থাকা ফ্লাভিও বলসোনারো এখন লুলার সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ের সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে লুলাকে এখন প্রথম দফার তুলনায় আরও বড় পরিসরে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে হবে।
দ্বিতীয় দফায় যেসব প্রার্থী প্রথম দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাদ পড়েছেন, তাদের ভোট কোন দিকে যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ, সরকারি ঋণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দুর্নীতির মতো ইস্যুতে দুই প্রার্থী কে ভোটারদের বেশি আস্থা অর্জন করতে পারেন, সেটিও নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফল।
২৫ অক্টোবর ব্রাজিলের ভোটাররা শেষ পর্যন্ত ঠিক করবেন, লুলার নেতৃত্বে বর্তমান বামপন্থী ধারাই চলবে, নাকি জাইর বলসোনারোর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী ফ্লাভিও বলসোনারোর নেতৃত্বে দেশ নতুন দিকে মোড় নেবে।












