যুদ্ধের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও বাড়তে দেখা গেছে।
কেপলারের তথ্য বলছে, ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সাত দিনে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত তেলজাত পণ্য, রাসায়নিক ও গ্যাসজাত অন্যান্য তরল পণ্যের সম্মিলিত রপ্তানি গড়ে প্রতিদিন ২ কোটি ২৪ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়।
সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বহনকারী জাহাজের সংখ্যাও বেড়েছে। ফেব্রুয়ারির পর এটি ছিল এক মাসে সর্বোচ্চ মাত্রা।

তবে এই পরিসংখ্যানে এমন কোনো জাহাজ অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যেগুলো শনাক্তকরণ এড়াতে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএসের সংকেত বন্ধ রেখে প্রণালি অতিক্রম করে থাকতে পারে। ফলে প্রকৃত জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন সাধারণত প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। এর মধ্যে ছিল তেলবাহী ট্যাংকার, গ্যাসবাহী জাহাজ, বাল্ক ক্যারিয়ার ও কনটেইনার জাহাজ। বিশ্বের দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
তবে জাহাজ চলাচল বাড়লেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমেনি। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান মারিস্কসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রণালি ও এর আশপাশে ট্যাংকারে হামলা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার পর্যন্ত অন্তত সাতটি ঘটনার কথা জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ অক্টোবর ‘কাজিমাহ থ্রি’ নামের একটি অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। তবে জাহাজের সব ক্রু নিরাপদ ছিলেন এবং পরে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, কাজিমাহ থ্রি সর্বশেষ ১৭ সেপ্টেম্বর ওমানের উপকূলে অবস্থিত রাস মারকাজ বন্দরে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল কুয়েতি অপরিশোধিত তেল খালাস করেছিল। জাহাজটির মালিক কুয়েত অয়েল ট্যাংকার কোম্পানির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২ অক্টোবর থেকে হরমুজ প্রণালি অথবা এডেন উপসাগরে প্রতিদিন অন্তত একটি করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মারিস্কসের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দ্রুত বাড়ায় সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পরিস্থিতিকে ‘উচ্চমাত্রার এবং ক্রমেই অনিশ্চিত’ সামরিক ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে হামলাগুলো নির্দিষ্ট কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে চালানো হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। মারিস্কস বলছে, পাওয়া তথ্য থেকে এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে যে ইরানি বাহিনী একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে এবং ওই এলাকায় থাকা জাহাজের রাডার সংকেতের ভিত্তিতে অস্ত্রগুলো লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে।
অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট জাহাজকে আগে থেকে বেছে নেওয়ার বদলে নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করাই কোনো বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ যুদ্ধপূর্ব মাত্রা ছাড়ালেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে হামলা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে তেল ও গ্যাস পরিবহনের খরচ, জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।













