এশিয়ার দেশগুলোতে তেলের মজুত বাড়াতে সহযোগিতার উদ্যোগ নিচ্ছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমদানি-নির্ভর এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা জোরদার করতে দুই দেশ তেল রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারে।
জাপানের নেতৃত্বাধীন এশিয়ান জিরো এমিশনস কমিউনিটির (এজেক) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক বৃহস্পতিবার ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ১১ দেশের এই জোটের বৈঠকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা বিশেষ আলোচনায় অংশ নেবেন। সেখানে এশিয়ার তেল মজুত বাড়াতে সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশের আগ্রহ প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামী ১১ অক্টোবর সৌদি আরবে তেল উৎপাদক ও আমদানিকারক দেশগুলোর মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপ ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ফোরাম অনুষ্ঠিত হবে। জাপানও এতে অংশ নেবে এবং এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার একটি কাঠামো তুলে ধরতে পারে।

এজেক বৈঠকের পর একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হতে পারে। সেটি এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদক দেশগুলোর মজুত বাড়ানোর বিষয়ে পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। পরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এই উদ্যোগের পরিধি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সংশ্লিষ্ট এশীয় দেশগুলোতে তেল রপ্তানি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে এসব দেশকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হতে পারে।
এই সহযোগিতা শুধু এশিয়ার জন্য নয়, তেল উৎপাদক দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। আমদানিকারক দেশগুলোতে তেল মজুত রাখার জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা গেলে সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যাহত হলেও সংরক্ষিত তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে জাপানের বিদ্যমান ব্যবস্থাকে একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাপান দেশটির বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তেল সংরক্ষণাগারের কিছু অংশ সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য ইজারা দেয়। এসব সংরক্ষণাগারে রাখা অপরিশোধিত তেল জরুরি পরিস্থিতিতে জাপান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিনতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা এশিয়ার অন্যান্য দেশেও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে জাপান আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। এ বছরের এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ১০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা কেন্দ্র করে ‘পাওয়ার এশিয়া’ নামে একটি জ্বালানি সহযোগিতা পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আসন্ন এজেক বৈঠকে সম্ভাব্য সমঝোতার ভিত্তিতে তেল মজুত গড়ে তুলতে এ অর্থায়ন ও জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত এই নির্ভরতার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে এশিয়ার তেল সরবরাহ দ্রুত চাপের মুখে পড়তে পারে।
১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে জাপান দীর্ঘদিন ধরে বড় আকারের জ্বালানি মজুত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশটির কাছে বিশ্বের অন্যতম বড় তেল মজুত রয়েছে, যা প্রায় ২০০ দিনেরও বেশি চাহিদা মেটাতে সক্ষম। তবে এশিয়ার অনেক দেশ এখনো একই ধরনের প্রস্তুতি নিতে পারেনি।

জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে থাইল্যান্ডে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি মিলিয়ে প্রায় ৬১ দিনের মজুত ছিল। ফিলিপাইনে এই মজুত ছিল প্রায় ৫৩ দিনের। ভিয়েতনামে তা ছিল মাত্র ৩০ দিনের সমপরিমাণ।
হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার পর এশিয়ার কয়েকটি দেশকে জ্বালানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছিল। কোথাও কোথাও গাড়িতে পেট্রল নেওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা দেওয়া হয়। ফলে পর্যাপ্ত তেল মজুত না থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু পরিবহন বা বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। জাপানের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা হলে শিল্প ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। দেশটির চিকিৎসা খাতে ব্যবহৃত রাবারের গ্লাভস ও হেমোডায়ালাইসিসের নলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিনির্ভর। এসব পণ্যের ৯৯ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আসে, যার বড় অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আমদানি করা হয়।
ফলে এশিয়ায় তেল মজুত বাড়ানোর এই উদ্যোগকে শুধু জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতি ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার স্থিতিশীলতা রক্ষার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল সরবরাহ এবং জাপানের অর্থ ও অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যৎ জ্বালানি সংকটে এশিয়ার দেশগুলোর ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।












