মিয়ানমারে সামরিক শাসন শুরুর পর আবাসিক সম্পত্তির বাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর দেশটিতে সম্পত্তির দাম প্রায় চারগুণ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ব্যবসায় অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী এখন স্বর্ণ বা ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে জমি ও বাড়িকে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখছেন।
ইয়াঙ্গুনের এক সম্পত্তি ক্রেতা মওয়ে মিন্ট জানান, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমিতে বিনিয়োগ শুরু করেন। পরে ইয়াঙ্গুনকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ বাড়ান। কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এখন পর্যন্ত তারা প্রায় ১০ লাখ ডলার ব্যয় করেছেন। তাঁর ভাষায়, মূল্যস্ফীতির কারণে সম্পত্তি বিক্রি করে নগদ অর্থে চলে গেলে সেই অর্থের মূল্য আরও দ্রুত কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২৬ সালের মিয়ানমার অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণেও সম্পত্তির দামের এই বড় উত্থানের কথা উঠে এসেছে। ইয়াঙ্গুনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ২০২১ সালে ৮৪ বর্গমিটারের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ৭ কোটি ৫০ লাখ কিয়াতে কেনা হয়েছিল। বর্তমানে সেটির মূল্য প্রায় ৩০ কোটি কিয়াত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক নির্মাণ ব্যবসায়ী।

সম্পত্তির বাজারে এই উত্থানের পেছনে শুধু বিনিয়োগের আগ্রহ নয়, মিয়ানমারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটও বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে দেশটির অর্থনীতি ২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ বাড়িয়েছে। একই সময়ে এ বছর দেশটিতে গড় মূল্যস্ফীতি ২৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক।
বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে সরকার আমদানি আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০২৪ সাল থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে রপ্তানি আয়ের প্রমাণ দেখানোর নিয়ম চালু করা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ইয়াঙ্গুন ও মান্দালেতে বৈধ পথে আনুষ্ঠানিক আমদানি প্রায় থেমে গিয়েছিল বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। ফলে পণ্য আমদানিতে আটকে থাকা অর্থের একটি অংশ জমি ও অন্যান্য সম্পদে চলে যাচ্ছে।
ইয়াঙ্গুনের সম্পত্তি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২২ সালের পর থেকে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত অর্থ জমিতে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। ইয়াঙ্গুনের ৩৬৫ রিয়েল এস্টেট গ্রুপের কো জ্যাকের মতে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অনেক এলাকায় জমির দাম বছরে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মোট দাম চারগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যাংকের প্রতিও মানুষের আস্থা কমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত সুদের হার ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃত অর্থমূল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর খুচরা সঞ্চয় আমানত কমেছে। ফলে অনেক পরিবার ও ব্যবসায়ী ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে নগদ অর্থ বা জমিতে বিনিয়োগ করছেন।
ইয়াঙ্গুনের প্রধান এলাকাগুলোতে জমির দাম এখন অনেক বেশি। ইনিয়া রোডের আশপাশে প্রায় ২২০ বর্গমিটারের একটি প্লটের দাম ৪৬ লাখ থেকে ৪৯ লাখ ডলার পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। কাবা আয়ে প্যাগোডা রোড এলাকায় একই আকারের জমির দাম প্রায় ২৮ লাখ থেকে ৩৭ লাখ ডলার। অধিকাংশ লেনদেন এখনো নগদে হয় এবং ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ চুক্তি।
বাজারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, অধিকাংশ জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না। পরিচিতজনের মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ হয়। অনেক ক্ষেত্রে ডলারে নগদ অর্থের লেনদেন আগে হয়, পরে মালিকানার কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। অনেক ক্রেতাই জমি কিনে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি বা ভবন নির্মাণ করছেন না। বরং মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থের মূল্য কমে যাওয়া ঠেকাতে জমি খালি রেখে দিচ্ছেন কিংবা ভাড়া দিচ্ছেন।

তবে নির্মাণ ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সম্পত্তি কিনলেও নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ইয়াঙ্গুনের এক ঠিকাদারের হিসাবে, দুই বছর আগে প্রতি টন হট-রোল্ড ৫০০ গ্রেডের ইস্পাতের দাম ছিল প্রায় ১৩ লাখ কিয়াত। সম্প্রতি সেই দাম বেড়ে ৪৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫৭ লাখ ৫০ হাজার কিয়াতে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ২০২৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ভবনের আকার নিয়ে নতুন বিধিনিষেধও নির্মাণকাজে বাধা তৈরি করছে। ওই ভূমিকম্পে ৫ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।
সম্পত্তির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকারও বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। জুলাইয়ের এক বক্তব্যে মিন অং হ্লাইং অভিযোগ করেন, ধনী ব্যক্তিদের একটি অংশ উৎপাদন ও শ্রমনির্ভর শিল্প থেকে অর্থ সরিয়ে দ্রুত লাভের আশায় আবাসন, স্বর্ণ ও অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। এরপর পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের স্পিকার খিন ই জানান, সম্পত্তির দাম নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি কমানো এবং রাজস্ব বাড়াতে জাতীয় সম্পত্তি কর আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইয়াঙ্গুন অঞ্চলেও সম্পত্তি বিক্রি ও নির্মাণের করমূল্য বাজারদরের তুলনায় পিছিয়ে থাকায় তা সংশোধনের আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে জমি হস্তান্তর কর কঠোরভাবে আদায় করা হচ্ছে। সাধারণত মূল্যায়িত সম্পত্তির মূল্যের ৪ শতাংশ হারে এই কর নেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপের প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আগস্টের শুরু থেকে বাজার কিছুটা ধীর হয়েছে। এক ইয়াঙ্গুন এজেন্টের মতে, বিক্রেতারা যে দাম চাইছেন, তা বাস্তব বাজারের সক্ষমতার তুলনায় বেশি হয়ে গেছে। কর আদায় ও নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থার কারণে ক্রেতারা এখন ছাড় চাইছেন। ইয়াঙ্গুনের প্রধান সড়কগুলোর জমির চাহিদা থাকলেও পাশের সড়ক ও অনুন্নত জমি বিক্রি হতে বেশি সময় লাগছে।

অন্যদিকে গৃহযুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রবাহ মান্দালেতেও আবাসনের চাহিদা বাড়িয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে আগস্ট পর্যন্ত মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার মানুষ মান্দালে অঞ্চলে রয়েছে। অনেক পরিবার প্রথমে ভাড়া বাড়িতে উঠলেও নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে গেলে পরবর্তী সময়ে বাড়ি বা জমি কেনার কথা ভাবছে।
সীমান্ত শহর মিয়াওয়াদিতেও ২০২১ সালের তুলনায় জমি ও ভাড়ার দাম প্রায় চারগুণ বেড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। সেখানে বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসা ও মানুষের উপস্থিতিও সম্পত্তির চাহিদা বাড়ানোর অন্যতম কারণ বলে স্থানীয় পর্যায়ে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই ঊর্ধ্বমুখী বাজার কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকারের কর ও মূল্যায়নসংক্রান্ত পদক্ষেপে বাজার কিছুটা ঠান্ডা হলেও মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে জমিকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখার প্রবণতা পুরোপুরি কমবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হচ্ছে, মিয়ানমারের আবাসন বাজার এখন সাধারণ মানুষের বাসস্থানের প্রয়োজনের চেয়ে সম্পদ রক্ষার একটি মাধ্যম হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে জমি ও বাড়ির দাম যত বাড়ছে, সাধারণ মানুষের জন্য নিজস্ব বাড়ি কেনার সুযোগ ততই সংকুচিত হচ্ছে।













