পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি নির্মাণ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম। সংস্থাটি জানিয়েছে, চুল্লিটি এখন ন্যূনতম নিয়ন্ত্রিত শক্তিস্তরে পৌঁছেছে। এর মানে, চুল্লির ভেতরে প্রথমবার এমন একটি বিক্রিয়া চলছে, যা নিজে থেকেই টিকে থাকে এবং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য এটি বড় একটি ধাপ। রুশ বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরা পুরো প্রক্রিয়া তদারক করেছেন। ন্যূনতম শক্তিস্তরে চুল্লি খুব অল্প শক্তিতে চলে। এই পর্যায়ে মূলত দেখা হয়, চুল্লির ভেতরের বিক্রিয়া হিসাবমতো আচরণ করছে কি না।
রোসাটম জানিয়েছে, পরের ধাপে চুল্লিটিকে বিভিন্ন শক্তিস্তরে চালিয়ে পরীক্ষা করা হবে। এরপর ইউনিটটিকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার কাজ শুরু হবে। রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ বলেছেন, তাঁরা আশা করছেন নভেম্বরের শেষের আগেই গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কাজটি হবে। সব ঠিক থাকলে বছর শেষের আগেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রথম বিদ্যুৎ গ্রিডে আসতে পারে। তবে প্রতিটি ধাপে কারিগরি ও নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ করেই এগোতে হবে। কোনো ধাপে ত্রুটি ধরা পড়লে তা ঠিক না করে পরের ধাপে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সময়সূচি কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
চেইন রিঅ্যাকশনে ইউরেনিয়ামের পরমাণু ভেঙে প্রচুর তাপ তৈরি হয়। সেই তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হয়। বাষ্পের চাপে টারবাইন ঘোরে, আর টারবাইন থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। তাই চুল্লি চালু হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছানো নয়। চুল্লির শক্তি ধীরে ধীরে বাড়াতে হয়। প্রতিটি স্তরে যন্ত্রপাতি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা আর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা দেখে নিতে হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট দুটি ইউনিট তৈরি হচ্ছে। দুটিতেই রাশিয়ার নকশার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের চাপযুক্ত পানির চুল্লি বসানো হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের পরিকল্পিত সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পুরোদমে চালু হলে কেন্দ্রটি থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। চলতি বছর প্রথম ইউনিট চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার পর চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি ভরা হয়। এবার সেই জ্বালানিতে বিক্রিয়া শুরু হলো। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও পাশাপাশি চলছে। প্রথম ইউনিটের অভিজ্ঞতা দ্বিতীয়টি চালুর সময় কাজে লাগবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এই অগ্রগতির গুরুত্ব অনেক বড়। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল। এসব জ্বালানির বড় অংশ আবার বিদেশ থেকে কিনে আনতে হয়। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বা সরবরাহে টান পড়লে সরাসরি চাপ পড়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে একটি স্থিতিশীল উৎস যোগ হবে। তবে প্রথম দিন থেকেই পুরো ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে না। উৎপাদন ধাপে ধাপে বাড়বে, তাই লোডশেডিংয়ে বড় পরিবর্তন দেখতে কিছুটা সময় লাগবে। এখন সবার নজর থাকবে পরীক্ষার ধাপগুলো কত নিরাপদে শেষ হয়, আর নভেম্বরের লক্ষ্য পূরণ হয় কি না।












