চলতি বছর ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে চিকিৎসকের ওপর হামলা, সহিংসতা ও হাসপাতাল ভাঙচুরের ৮০টির বেশি ঘটনা ঘটেছে। এই হিসাব দিয়েছে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। সর্বশেষ ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনেরা চিকিৎসকদের কক্ষ, জানালার কাচ ও হাসপাতালের একমাত্র ইসিজি যন্ত্র ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ। চিকিৎসকদের দাবি, তারা চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের গালাগাল ও মারধরও করেন।
একই রাতে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। জরুরি বিভাগে সে রাতে একাই দায়িত্বে ছিলেন সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. সাকিয়া হক। তিনি ফেসবুক লাইভে জানান, পেটব্যথা নিয়ে আসা এক রোগীকে ক্যানুলা পরাতে ওয়ার্ড বয় দুবার ব্যর্থ হন। জরুরি বিভাগে নার্স ছিলেন না, তাই শিশু বিভাগ থেকে অভিজ্ঞ নার্স ডাকতে লোক পাঠানো হয়। এর মধ্যেই আট থেকে ১০ জন তার কক্ষে ঢুকে চড়াও হন। তিনি জানান, ২৫০ শয্যার ওই হাসপাতালে সেদিন প্রায় ৪৫০ রোগী ভর্তি ছিলেন।
চিকিৎসকের ওপর হামলা এখন রোগীর চিকিৎসাতেই প্রভাব ফেলছে। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা নিয়ে গবেষণা করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজির কনসালট্যান্ট ডা. নাজিরুম মুবিন। তিনি বলেন, ভয়ের কারণে চিকিৎসকেরা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগী নিতে চাইছেন না। ফলে জেলা ও উপজেলা থেকে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে রোগী পাঠানো বাড়ছে, বড় হাসপাতালে চাপ বাড়ছে। ২০২৪ সালে চিকিৎসা সাময়িকী বিএমজে ওপেনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, একটি সরকারি হাসপাতালের ৪৪১ চিকিৎসকের ৬৭.৩ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার ৬৬ শতাংশের জন্য দায়ী ছিলেন রোগীর স্বজনেরা।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেছেন, চিকিৎসক আর রোগীকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর পরিবেশ তৈরির দায় নীতিনির্ধারকদেরও আছে। তার মতে, অনেক রোগী সামলাতে গিয়ে ভুল হতে পারে, তবে অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে জবাবদিহির নিয়মে। হাসপাতালে ভিডিও করে যাচাই ছাড়া প্রচার করলে মানুষ বিভ্রান্ত হয় বলেও সতর্ক করেন তিনি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, চিকিৎসক নিজে নিরাপদ না থাকলে রোগীর স্বাস্থ্যের কথা ভাববেন কীভাবে। প্রতিমন্ত্রী জানান, চিকিৎসক ও রোগী দুই পক্ষের সুরক্ষায় একটি আইন তৈরির কাজ চলছে। ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রোগীর পক্ষের কথাও সামনে এসেছে। সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের সচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, অবহেলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনে রোগীর অধিকার ও অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি নিয়ে আলাদা অধ্যায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি। বিএমডিসিকেও অভিযোগ নিষ্পত্তিতে আরও সক্রিয় হতে বলেন। চিকিৎসকের ওপর হামলা বন্ধ করতে হলে রোগীর অভিযোগ জানানোর ভরসার জায়গাও তৈরি করতে হবে।












