বাংলাদেশে শীতের আগমনী বার্তা দেখা যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে রাত ও ভোরে তাপমাত্রা কমছে, বাড়ছে কুয়াশার প্রবণতা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ২৬ অক্টোবর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ দিনের বেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে গরমের অনুভূতি এখনো পুরোপুরি কমেনি। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই সামনে এসেছে এবারের শীত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—শীত কি স্বাভাবিকের তুলনায় কম তীব্র হবে, নাকি মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে ঠান্ডা জেঁকে বসবে?
আবহাওয়াবিদদের প্রাথমিক পূর্বাভাসে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, এবার শীতের অনুভূতি অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এল নিনো সক্রিয় থাকলেই বাংলাদেশে শীত কম হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। শীতের প্রকৃত তীব্রতা নির্ভর করবে স্থানীয় আবহাওয়া, বাতাসের প্রবাহ, কুয়াশা এবং শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতির ওপরও।
এল নিনো কেন গুরুত্বপূর্ণ

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া। এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ বদলে যায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
২০২৬ সালের শেষ দিকে এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি পূর্বাভাসেও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অধিকাংশ অঞ্চলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির পূর্বাভাস আর নির্দিষ্ট কোনো জেলার শীতের পূর্বাভাস এক নয়। এল নিনো সামগ্রিক আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেললেও কোনো এলাকায় কখন শৈত্যপ্রবাহ হবে, কত দিন থাকবে কিংবা তাপমাত্রা কতটা নামবে, তা শুধু এই একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
নভেম্বরের শেষ থেকে শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে। উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এর আগেই ঠান্ডা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ ভাগ থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে এবং জানুয়ারিতে শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কাও রয়েছে। রাজধানীতে কোনো কোনো সময় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে।

অন্যদিকে, এবারের শীত স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। মৌসুমজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও কুয়াশা ও স্বল্প সময়ের জন্য তীব্র ঠান্ডা দেখা দিতে পারে।
দুটি পূর্বাভাসের মধ্যে মৌলিক বিরোধ নেই। মৌসুমের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে তাপমাত্রা অনেকটা নেমে যেতে পারে। হিমালয় অঞ্চল থেকে ঠান্ডা বাতাস দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হলে উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কুয়াশা ও ঠান্ডার প্রভাব থাকবে
শীতের তীব্রতা তুলনামূলক কম হলেও ঘন কুয়াশার ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে সড়ক, নৌ ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে। দিনের বেলায় তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকলেও রাত ও ভোরের ঠান্ডা শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে থাকা পরিবারের জন্য কষ্টকর হতে পারে।

কৃষিতেও তাপমাত্রার ওঠানামা ও কুয়াশার প্রভাব পড়তে পারে। তাই শীতের পূর্বাভাসকে শুধু তাপমাত্রার হিসাব হিসেবে দেখলে চলবে না; অঞ্চলভিত্তিক প্রস্তুতি ও নিয়মিত আবহাওয়ার সতর্কবার্তার গুরুত্বও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এবারের শীতে দীর্ঘস্থায়ী তীব্র ঠান্ডার বদলে তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে শীতের দাপট দেখা যেতে পারে। তবে নভেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পরিস্থিতি কীভাবে বদলাবে, তা নির্ভর করবে বাতাসের প্রবাহ, আকাশের অবস্থা এবং এল নিনোর সঙ্গে অন্যান্য জলবায়ুগত প্রক্রিয়ার পারস্পরিক প্রভাবের ওপর। মৌসুমি পূর্বাভাস সম্ভাব্য প্রবণতা জানায়, প্রতিদিনের আবহাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
সব পূর্বাভাস ও আবহাওয়াবিদদের মূল্যায়ন বিবেচনায় নিলে আপাতত সবচেয়ে সতর্ক সিদ্ধান্ত হলো—শীত আসবে, তবে তার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব সারা দেশে এক রকম নাও হতে পারে।












