স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ৬৯ জনের মৃত্যুর পর বড় প্রশ্ন উঠেছে—একজনের ভুলেই কীভাবে এত মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে? আধুনিক রেলব্যবস্থায় এমন বিপর্যয় ঠেকাতে একাধিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার কথা। তাই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শুধু কোনো চালক বা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মীর ভুল নয়, পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাও খতিয়ে দেখা জরুরি।
রেল ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তাব্যবস্থা অতীতের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে গড়ে উঠেছে। এখন একটি ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটি যাতে বড় বিপর্যয় ডেকে না আনে, সে জন্য একাধিক স্তরের সুরক্ষা রাখা হয়। স্পেনের দুর্ঘটনা সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

স্পেনের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগে ট্রেনচালক ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কথোপকথন শোনা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কথোপকথন থেকে ধারণা পাওয়া যায়, একটি ট্রেনকে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও একই রেলপথে অন্য একটি ট্রেন থেমে ছিল।
যদি এই তথ্য নিশ্চিত হয়, তাহলে অন্তত দুটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, রেলপথে অন্য ট্রেন থাকা অবস্থায় আরেকটি ট্রেনকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো কেন? দ্বিতীয়ত, সংঘর্ষের আগে ট্রেনটির গতি কমানোর ব্যবস্থা কেন কার্যকর হয়নি?
দুর্ঘটনাটির ক্ষেত্রে ট্রেনের গতি বড় ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রেনটি ঘণ্টায় ১২৪ মাইল গতিতে চলছিল। এমন পরিস্থিতিতে সংঘর্ষের গতি কম থাকলে প্রাণহানি ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অনেক কম হতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কোনো কর্মী বা চালকের ভুলকেই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
এক ভুল ঠেকাতে একাধিক নিরাপত্তাব্যবস্থা
আধুনিক রেলব্যবস্থায় লাল সংকেত অতিক্রম করলে ট্রেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে থামানোর প্রযুক্তি রয়েছে। চালক সাড়া না দিলে বা নির্ধারিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সক্রিয় না থাকলে জরুরি ব্রেক কার্যকর করার ব্যবস্থাও থাকে। এসব প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হলো, একজন মানুষের ভুল যেন সরাসরি বড় দুর্ঘটনায় রূপ না নেয়।

কিন্তু আধুনিক রেল পরিচালনায় অনেক কাজ দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে করা হয়। এতে এক জায়গা থেকে বৃহৎ নেটওয়ার্ক পরিচালনা সহজ হলেও রেলপথের নির্দিষ্ট অংশে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। স্পেনের দুর্ঘটনায় এই ব্যবস্থার তদারকি কতটা কার্যকর ছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
স্পেনের আগের দুর্ঘটনাও আলোচনায়
স্পেনে উচ্চগতির ট্রেন দুর্ঘটনা নতুন নয়। ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলায় একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। প্রচলিত রেলপথে প্রবেশের পর গতি কমানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চালক সচেতন ছিলেন না বলে ওই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে জানা যায়।
এ বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণ স্পেনের আদামুজে রেলপথের ত্রুটির কারণে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। ওই দুর্ঘটনায় ৪৬ জন মারা যান।
তিনটি দুর্ঘটনার কারণ এক নয়। তাই এগুলো থেকে উচ্চগতির রেলব্যবস্থার সব ক্ষেত্রেই একই ধরনের সমস্যা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে ধারাবাহিক দুর্ঘটনা স্পেনের রেল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিনিয়োগের বিষয়গুলো নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে
জাপানের শিনকানসেন উচ্চগতির রেলসেবা ১৯৬৪ সালে চালু হয়। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল শুরু থেকেই। পরে বিশ্বের বহু দেশ উচ্চগতির রেল চালু করেছে। পৃথক রেলপথ ও উন্নত অবকাঠামো এসব ব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
চীনের ওয়েনঝৌতে ২০১১ সালে একটি উচ্চগতির ট্রেন থেমে থাকা আরেকটি ট্রেনকে ধাক্কা দিলে ৪০ জনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর দেশটির রেলব্যবস্থার কাঠামো ও নিরাপত্তা নিয়ে পরিবর্তন আনা হয় বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্পেনের ক্ষেত্রেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি পুরো রেল নেটওয়ার্কের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির ভুল সরাসরি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকলেও সেই ভুল ঘটার সুযোগ কেন তৈরি হয়েছিল, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।












