মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে আরও এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো বাকি রয়েছে। এর জবাবে তেহরান সতর্ক করেছে, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে ইরান কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) নতুন সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক সমাধানের আশা করলেও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে।
১ নভেম্বরের পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উপসাগরে জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজে হামলা, ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি, ইরানের পাল্টা সতর্কতা
ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচির বড় অংশ ধ্বংস করেছে। তবে সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ আরও এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবস্থা নেওয়া বাকি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, চাইলে যুক্তরাষ্ট্র অল্প সময়ের মধ্যেই এসব স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। তবে তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন এখনই নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিতে তাড়াহুড়া করছে না এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতের চেয়ে দীর্ঘ হতে পারে। যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এককভাবে নির্ধারণ করতে পারবেন না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে নতুন হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। যেকোনো ধরনের হুমকির জবাবে দ্রুত ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
কূটনীতির সুযোগ খুঁজছে উপসাগর
ইউএইর প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতির আশা করছে তাঁর দেশ। তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।
বাহরাইনে এক সম্মেলনে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থে আরেক দফা সংঘাত কাম্য নয়। একই সঙ্গে পরিস্থিতি খারাপ হলে তা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার কথাও জানান তিনি।
ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই বলেছেন, তেহরানের ঘোষিত সাতটি শর্ত পূরণ হলে কূটনীতির পথ খোলা থাকবে। তবে ইরানের ওপর হামলা হলে নতুন অস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমণকারীদের বড় ধরনের ক্ষতি করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলে ওয়াশিংটন তাতে আগ্রহী। তবে সরাসরি আলোচনার বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এলএনজি জাহাজে হামলা, নৌপথে উদ্বেগ

উপসাগরে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’ অজ্ঞাত বস্তু দিয়ে হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। শুক্রবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। জাহাজের কোনো ক্রু আহত হননি এবং পরিবেশগত ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি। জাহাজটি নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
কাতার এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, জ্বালানিবাহী জাহাজে হামলা সামুদ্রিক চলাচল, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ঘটনার তদন্ত চলছে।
এদিকে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত সম্পদ লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে। জোটের দাবি, হুথিদের হামলা ও দক্ষিণ লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের হুমকি মোকাবিলায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, পশ্চিম ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হওয়ায় তিন লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের জরুরি আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা প্রয়োজন।
বিমান চলাচল ও খেলাধুলাতেও প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে জাপানের মোটরসাইকেল রেসিং দল ইয়ামাহা আগামী সপ্তাহের কাতার গ্রাঁ প্রি-তে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদে ফ্লাইট স্থগিত রাখার সময়সীমাও বাড়িয়েছে ভারতের আকাসা এয়ার।
সব মিলিয়ে, নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়লেও কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে সামরিক হুমকি, জ্বালানি পরিবহনে ঝুঁকি এবং ইয়েমেনের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এবং মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।












