ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। রোববার (১ নভেম্বর) বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে আয়োজিত এই বিক্ষোভে অংশ নেন বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের জেরে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) নির্বাচনী সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
দিল্লির রামলীলা ময়দানে আয়োজিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। কয়েক শ নিরাপত্তাকর্মী লাঠি ও ঢাল নিয়ে মাঠের চারপাশে অবস্থান নেন। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানবাহনও মোতায়েন করা হয়। সমাবেশে যাওয়ার পথে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
বিরোধী জোটের নেতারা খোলা ছাদযুক্ত একটি গাড়িতে করে মিছিলের নেতৃত্ব দেন। তাঁদের হাতে ছিল ভারতের জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পতাকা।
রাহুল গান্ধীর কঠোর বক্তব্য
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তাঁর পদ ছাড়তে হবে। দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হবে তাঁকে অপসারণ করা।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে ভারতের নাগরিকদের কণ্ঠস্বর ও মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এটি দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।
সমাবেশে অংশ নেওয়া কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠনের সদস্য রীনা মাহাতো অভিযোগ করেন, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর পরিবারের চার সদস্যের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মধ্য ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের জগদলপুরে তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে। অথচ হঠাৎ করেই তাঁদের অন্য জায়গায় চলে গেছেন বলে ভোটার তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন।
১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ
ভোটার তালিকা সংশোধনের এই কার্যক্রমে ১৩ কোটির বেশি মানুষের নাম বাদ পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যাটি জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
বিরোধী দলগুলোর দাবি, এই বাদ পড়া মানুষের মধ্যে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। তাঁদের অনেকেই বিজেপির সমর্থক নন বলে মনে করা হয়।
তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদের উদ্দেশ্য হলো একই ব্যক্তির একাধিক নাম এবং ভোট দেওয়ার অযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছে সংস্থাটি। কমিশনের বক্তব্য, ভুলবশত যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা আবার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারবেন।
অন্যদিকে বিজেপির অভিযোগ, বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দিনেশ সিং বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তিনি আন্দোলনে এসেছেন। তাঁর প্রত্যাশা, পরবর্তী প্রজন্ম মনে রাখবে যে তাদের ভবিষ্যতের জন্য মানুষ লড়াই করেছিল।
বিক্ষোভকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলল সরকার
ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডা এই বিক্ষোভকে পরিকল্পিত নাটক বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, রামলীলা ময়দানে যা ঘটছে, তা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নয়। বরং গণতন্ত্রের নামে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে নির্বাচন কমিশন প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ভারতে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ হচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি শিক্ষার্থী সংগঠন এবং তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টিও এসব কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দুই সহযোগী অভ্যন্তরীণভাবে একাধিক উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এটিকে তাঁর সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এখনো সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সংকট তৈরি হয়নি। ভারতে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।












