ঢাকা, ৩ নভেম্বর—মজুরি বাড়ানোর দাবিতে মঙ্গলবার টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকেরা। এ সময় রাজধানী ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। অস্থিরতার কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতের কারখানার উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
শনিবার শুরু হওয়া এই আন্দোলন সরকারের পক্ষ থেকে পোশাক খাতের মজুরি পর্যালোচনায় ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠনের পরও থামেনি। বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশে এই শিল্পের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের রপ্তানি আদেশের জন্য কারখানাগুলো যখন উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশের পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এইচঅ্যান্ডএম, জারা ও গ্যাপের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এই খাত থেকে পণ্য সংগ্রহ করে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে।
ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে নতুন করে সংঘর্ষ ও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে আশুলিয়া, গাজীপুর এবং রাজধানীর মিরপুর এলাকা। শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, বিক্ষোভকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। মিরপুরেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আগের দিন প্রায় ৭০০ কারখানা বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবারও গাজীপুর ও আশুলিয়ার কয়েকটি কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখে অথবা ছুটি ঘোষণা করে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মজুরি বাড়ানোর দাবি
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকেরা তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্দোলনের মধ্যে কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, কারখানা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য পণ্য সংগ্রহের কেন্দ্র হিসেবে সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পণ্যমূল্য বাড়তে থাকায় শ্রমিকদের ওপর চাপও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ১ নভেম্বর পোশাক খাতের মজুরি পর্যালোচনায় মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। তবে বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত এখনো শ্রমিকদের বিক্ষোভ প্রশমিত করতে পারেনি।
কারখানার মালিকেরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এবং প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়ার চাপও তাঁদের সামলাতে হচ্ছে।
তাঁদের আশঙ্কা, শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন সূচি ব্যাহত হবে এবং রপ্তানি আদেশ ঝুঁকিতে পড়বে। অন্যদিকে শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধি ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
রুমা পলের প্রতিবেদন; সম্পাদনা: জান হার্ভি।












