মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ০২:৩৫ অপরাহ্ন

আমাদের নববর্ষ

  • Update Time : শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৪, ৭.০০ পিএম

মুনতাসীর মামুন

নববর্ষ প্রতিটি দেশেই কোন না কোনভাবে পালিত হয়। পাশ্চাত্যে, খৃষ্টান জগতে পহেলা জানুয়ারি পালিত হয় নববর্ষ। বর্তমানে পহেলা জানুয়ারি নববর্ষ পালন অনেকটা সর্বজনীন হয়ে উঠেছে, শুধু পাশ্চাত্যে নয়, প্রাচ্যেও। এমনকি আমাদের দেশের এলিট শ্রেণীও পহেলা জানুয়ারি পালন করে নববর্ষ। সম্প্রদায়গতভাবে, মুসলমানদের নববর্ষ মুহররমের আশুরা থেকে। ইহুদীদের নববর্ষের নাম ‘রাশ হাসানা’, ইরানীদের নববর্ষ ‘নওরোজ’ যা মুঘলরা চালু করেছিলেন ভারতবর্ষের । ‘তেত’ হচ্ছে ভিয়েতনামীদের।

নববর্ষ পালনের মূলে আছে কৃষি। আগে বছর গণনার ভিত্তি ছিল চন্দ্রকলা। পরে ফসল বোনা ও কাটার বা কৃষির কারণে চন্দ্র ও সূর্য বা ‘চান্দ্র সৌরবৎসর ভিত্তিক’ গণনা শুরু হয়। লিখেছেন এনামুল হক, নববর্ষ বিষয়ক তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধে, “গোড়ায় নববর্ষ ছিল মানুষের ‘আর্তব উৎসব’ বা ঋতুধর্মী উৎসব। ঋতুধর্মী বলে কৃষির সাথেও এর সম্বন্ধ ছিল অতি ঘনিষ্ঠ। কারণ, কৃষি কাজ একটি ঋতুনির্ভর মানব বিজ্ঞান।”১ প্রকৃতির কাছে নতি স্বীকার নয়, ঋতুর পরিবর্তন দেখেই পালিত হতে থাকে নববর্ষ।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ও জাতির নববর্ষের মূল বৈশিষ্ট্য স্বতস্ফূর্ত আনন্দ। হ্যাঁ, পাশ্চাত্যে খৃষ্টানরা নববর্ষের দিন গীর্জায় প্রার্থনা করেন বটে, কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর রাত বারোটার পর থেকে মেতে ওঠেন আনন্দে। প্রাচ্যে, চীনা, জাপানী, ভিয়েতনামীদের নববর্ষও আনন্দের। ইরানে নওরোজ পালিত হয় প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে। এনামুল হক লিখেছেনÑ “আগেকার ঋতু পরিবর্তন- কালীন স্বতস্ফূর্ত নাচ-গান, আমোদ-প্রমোদ ও পানাহার জোরেসোরেই চালু রইল বটে, তবে তার সাথে যে নতুন উদ্যোগ যুক্ত হ’ল তাকে বলা যায় বিশ্বাস-অনুশাসিত অনুষ্ঠান।”

এর উদাহরণ মুসলমানরা। তাদের নববর্ষের শুরু আশুরার বিষাদ নিয়ে। এক্ষেত্রেও মুসলমানরা ব্যতিক্রম। কারণ, পৃথিবীর কোন দেশের বা জাতির নববর্ষ শুরু বিষাদ দিয়ে নয়। হয়ত নিয়তিবাদের প্রভাব। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মক্কা, মদীনা যখন পারস্যের প্রদেশ হিসেবে গণ্য, তখন সেখানেও পালিত হ’ত নববর্ষ। হজরত (দঃ) মদিনায় হিজরতের দু’বছর পর নওরোজ বাদ দিয়ে প্রবর্তন করেন ঈদ উৎসব।

আগেই উল্লেখ করেছি, মুঘলরা পারস্যের নওরোজ প্রবর্তন করেছিলেন যার প্রধান অঙ্গ ছিল মীনাবাজার। এ মীনা বাজারেই নুরজাহানকে দেখে প্রেমে পড়েছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। পাকিস্তানী আমলেও এ অঞ্চলে চালু করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিলো মীনা বাজারের, কিন্তু তেমনভাবে তা সফল হয়নি। বাংলাদেশে ষাট দশকে সবকিছু ছাপিয়ে উঠে এসেছে বাংলা নববর্ষ ও তার অনুষঙ্গ হিসেবে মেলা।

আমরা জানি যে, বাংলা সনের প্রথম দিন বাংলাদেশে পালিত হয় নববর্ষ হিসেবে। ‘নতুন বছরের আগমন উপলক্ষে অনুষ্ঠিতব্য উৎসবের প্রথম দিন; যেমন লিখেছেন এনামুল হক, ‘প্রকৃতপক্ষে তা একটা নির্দিষ্ট উৎসবের দিন।’

বাংলা নববর্ষ এমন একটি দিন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে এটি হিন্দু বা মুসলমান বা বৌদ্ধের একক কোন উৎসবের দিন নয়। এটির চরিত্র সর্বজনীন। আসলে ধর্মভিত্তিক নয় কিন্তু সর্বজনীন এমন উৎসব পৃথিবীতে বিরল। এই সর্বজনীনতার রূপ এনামূল হক প্রত্যক্ষ করেছেন মেঘের জন্য সমবেত প্রার্থনাতে। বৈশাখের তপ্ত দিনে পুরুষ মহিলারা যখন মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে বা “মেঘের কাছ থেকে জল ভিক্ষা করাও বাংলা নববর্ষের আর একটা সর্বজনীন অনুষ্ঠান।”৪
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। কিন্তু, তাদের নববর্ষ আশুরা থেকে শুরু নয় এবং তা বিষাদময়ও নয়। এ কারণেও বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ পালন বিশেষ স্বাতন্ত্র্যময়।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস খুব পুরনো নয়। খুব সম্ভব বাংলা সনের সঙ্গে যোগ আছে বাংলা নববর্ষ পালনের। সম্রাট আকবর বাংলায় বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন ১০ মার্চ, ১৫৮৫ সালে, কিন্তু তা কার্যকর হয় ১৬ মার্চ ১৫৫৬ সালে, তাঁর সিংহাসনারোহনের সময় থেকে। বাংলা সনের ভিত্তি হিজরী চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন। বাংলার তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণ করা হয়েছিলো বাংলা সন। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, বাংলা সনের ভিত্তি কৃষি এবং বাংলা সনের শুরুর সময়টা কৃষকের খাজনা আদায়ের। যেমন, চৈত্রে বৃষ্টি হলেও কিন্তু কৃষক লাঙ্গল দেয় না খেতে, লাঙ্গল দেয়া হয় সাধারণত বৈশাখে, বৃষ্টির কামনাও সেজন্য। অবশ্য, চৈত্রে বৃষ্টি হলেও লাঙ্গল দেয়া হয়।
তবে, যাই হোক, এখনও সাধারণ মানুষ তাঁর নিত্যকর্ম সম্পাদন করেন বাংলা সনের নিরিখে। আর শহরবাসীরা জুলিয়াস ক্যালেন্ডারের নিরিখে।

 

শামসুজ্জামান খান যথার্থই মন্তব্য করেছেন এ পরিপ্রেক্ষিতে যে, আকবর একসময় সর্বভারতীয় ইসলামী সন ও বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন। “কিন্তু একটি সময়ে প্রবর্তিত বাংলা সন শুধু টিকেই থাকেনি বরং বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত যৌথ প্রধান বাঙালী সমাজকে দিয়েছে জাতীয় চেতনা এবং গৌরববোধের এক বিশেষ শক্তি।”৫ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একেক ঋতুতে নববর্ষ শুরু হয়। বাংলা নববর্ষ গ্রীষ্মে। গ্রীষ্ম তো খুব মনোরম মাস নয় বাংলাদেশে, উৎসব ও আনন্দও তেমন হতে পারে না তখন, যেমন হতে পারে শীত বা বসন্তের শুরুতে। অনেকের মতে, বাংলা নববর্ষ তো আসলেই অগ্রহায়ণেই হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল, কৃষির দিক বিবেচনা করলেও। যেমন, অগ্রহায়ণ ফসল কাটার মাস। কিন্তু হচ্ছে বৈশাখে। পল্লব সেনগুপ্ত লিখেছেন, “হয় হেমন্তে, নয় বসন্তে অর্থাৎ শস্য এবং ফুল-ফল যখন নতুন করে জন্মাতে শুরু করে, তখন থেকেই নতুন বছরের হিসাব ধরা। এটিই ছিল প্রাথমিক রেওয়াজ। পরে নানান ব্যবহারিক প্রয়োজনে সেটি অন্যান্য ঋতুতে সরে গেছে কালের বিবর্তনে। পয়লা জানুয়ারি বা পয়লা বৈশাখ থেকে বছর আরম্ভ করা রেওয়াজ তাই অনেক অর্বাচীন।”

কিন্তু সেই রহস্য উদ্ঘাটিত হয় নি। আমাদের দেশতো গ্রীষ্মম-লীর অন্তর্ভুক্ত তাই গ্রীষ্মেরই প্রাধান্য থাকা স্বাভাবিক। তা’ছাড়া, এমনকি হতে পারে ঐ সময় খালবিল নদীনালা সব শুকিয়ে যায়, চারদিকে শুধু পানির তৃষ্ণার, সবকিছু মিলিয়ে ঋতুর এক প্রচ- পরিবর্তন সহজেই স্পষ্ট হয়। তারপর কালবোশেখী। আচমকা বুনো মোষের মতো এসে সব করে দেয় ল-ভ-। সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি। কমে দাবদাহ, হাল পড়ে খেতে। সব মিলিয়ে প্রকৃতি প্রভাবিত করেছে বৈশাখে নববর্ষ নির্ণয়ে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন লিখেছেন- এসো হে বৈশাখ এসো এসো তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে এনামুল হকও তাই মনে করেন। “যেখানে যে ঋতু প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানে সে ঋতুকেই কেন্দ্র করে প্রধান উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। তদুপরি ছোটখাট, আর্তব উৎসব তো নিয়মিতভাবে চলতই। এ বিষয়ে বাংলার স্থান নিয়ে স্বতন্ত্র ছিল। তার প্রধান ‘আর্তব উৎসব’ যে গ্রীষ্মকালে ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। পৃথিবীর সর্বত্র যেমন প্রধান ‘আর্তব উৎসব নববর্ষের উৎসব রূপে পরিগণিত হয়েছে, আমাদের দেশের গ্রীষ্মকালীন প্রধান উৎসবও নববর্ষের উৎসব রূপে পরিগণিত হয়ে থাকবে, আমার মনে হয়, কাল-বৈশাখীর তা-ব লীলা ও তার পরে পরেই প্রকৃতির নতুন সৃষ্টির যে রূপটি বাংলাদেশে দেখা দিয়ে থাকে, তাই আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতিতে গ্রীষ্মকালের এবং গ্রীষ্মকালীন উৎসব অনুষ্ঠানের প্রাধান্য স্বীকার করে নিতে বাধ্য করেছিল। নইলে, এখানকার নববর্ষের অনুষ্ঠান ও উৎসবাদি ধর্মের প্রভাবে বিপুলভাবে প্রভাবিত হ’ত। কেননা, আমাদের দেশ আদিম অধিবাসী, হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান ও খৃষ্টান অধ্যুষিত দেশ। অথচ এ সমস্ত ধর্মের কোন বিশিষ্ট প্রভাব আমাদের ‘নববর্ষের অনুষ্ঠানের ও উৎসবে দেখা যায় না।”

গত চারশো বছরে অর্থাৎ আকবরের বাংলা সন প্রবর্তনের পর হয়ত কৃষি ও ঋতুর সঙ্গে যুক্ত অনেক অনুষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে এবং এভাবে আবর্তিত হয়ে পহেলা বৈশাখ রূপান্তরিত হয় নববর্ষে। এখানে এনামুল হক বাংলা নববর্ষের যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন তার সঙ্গে যোগ করতে পারি যে, বর্তমান শতকে ষাটের দশক থেকে বাংলা নববর্ষ এক নতুন রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করেছে। আর কোন দেশে কোন ঋতু এরকম রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করেছে বলে জানা নেই।

বাংলাদেশে নববর্ষের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলো এবং হয়েছে নানা আনুষঙ্গিক বিষয়। এর কিছু লুপ্ত হয়ে গেছে এবং কিছু কিছু আবার বিশেষ কিছু অঞ্চলেই প্রচলিত।

 

 

প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে এ রকম একটি অনুষ্ঠান পুণ্যাহ। এর উদ্ভব কবে সে সম্পর্কে জানা যায় না, তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির পূর্বপর্যন্ত তা ছিল। পুণ্যাহ যুক্ত ছিল নববর্ষের সঙ্গে। ঐ দিন প্রজারা ভালো পোশাক আশাক পরে জমিদারীর কাছারীতে যেতেন খাজনা নজরানা দিতে, যেন পুণ্য কাজ করতে যাছেন। পুণ্য থেকেই পুণ্যাহ।

হালখাতা অবশ্য এখনও অটুট। প্রধানত ব্যবসায়ী মহল এটি পালন করে। নববর্ষের দিন, ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসেব-নিকেশ সারে। এ জন্য অনেক ক্ষেত্রে লাল কাপড়ের মলাটের এক বিশেষ খাতা ব্যবহার করে, যাকে খেরো খাতা বলা হয়। সেদিন দোকানে কেউ গেলেই মিষ্টি খাওয়ানো হয়। শুধু তাই নয়, ঢাকা শহরের অনেক মধ্যবিত্ত আজকাল নববর্ষ উপলক্ষে মিষ্টি কেনেন, ভালো খাবারের আয়োজন করেন।

আঞ্চলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখ্য, চাঁটগা শহরের জব্বারের ‘বলী খেলা’ বা কুস্তি। এটি এখনও প্রবল উৎসাহ ও উত্তেজনার সৃষ্টি করে চাঁটগা শহরে। রাজশাহীর গম্ভীরাও এমনি একটি অনুষ্ঠান। ঢাকার মুন্সীগঞ্জে প্রচলিত ছিল গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা।

তবে বৈশাখ এবং পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান মেলা। আমাদের দেশের ‘নববর্ষের’ মেলাগুলোও এদেশের প্রাচীনতম ‘আর্তব উৎসব’ ও ‘কৃষ্যৎসব’ প্রভৃতির বিবর্তিত রূপ ব্যতীত আর কিছুই নয়। কেননা, এগুলোতে এখন পর্যন্ত স্থানীয় কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যাদির বেচা কেনা হয়।৯
বৈশাখী মেলার আরো একটি বৈশিষ্ট্যের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তাহলো অন্যান্য মেলায় ধর্মের উপাদান প্রবেশ করলেও বাংলাদেশের মেলায় তা করেনি। এখনও তা কুটিরজাত পণ্যাদির বেচাকেনার মেলা। এক হিসেবে জানা গেছে, সারা বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখে এবং বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে প্রায় দু’শো মেলা অনুষ্ঠিত হয়।”১০ ঢাকা শহরের বা শহরাঞ্চলে আয়োজিত মেলায় মাটির ও কুটিরজাত পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থ মেলারও আয়োজন করা হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নববর্ষের শুভেচ্ছা হিসেবে মক্কেলদের উপহার হিসেবে প্রেরণ করছে বই।

বাংলাদেশে, আগেই উল্লেখ করেছি, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি উপাদান হিসেবে পহেলা বৈশাখ পালন শুরু হয় এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে তা নতুন মাত্রা যোগ করে। আইয়ুব আমলে, রবীন্দ্র সঙ্গীত ও বাঙালী সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ শুরু হলে, ছায়ানট ১লা বৈশাখে নববর্ষ পালন উপলক্ষে রমনার বটমূলে আয়োজন করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। গোড়া ধর্মবাদের বিরুদ্ধে ছিল তা প্রতিবাদ। ছায়ানটের এই প্রচেষ্টা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং স্বাধিকার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শাসকগোষ্ঠীর আদর্শের প্রতিবাদে ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বাংলা নববর্ষ ঘোষিত হয় সরকারি ছুটির দিন হিসেবে। এভাবে তৃণমূল পর্যায়ের নববর্ষ পালনের সঙ্গে যুক্ত হয় শাহরিক প্রচেষ্টা। যে কারণে, ধর্মীয় উৎসব ছাড়া, বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের উৎসব একমাত্র অনুষ্ঠান যার বিরুদ্ধে মৌলবাদীরা কোন কটাক্ষ করার সাহস করেনি, যা তারা করে একুশে ফেব্রুয়ারি বা বিজয় দিবস উপলক্ষেও।

সবশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে, একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠান বাংলা নববর্ষ। তৃণমূল থেকে শাহরিকÑ সব পর্যায়েই বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে তা পালিত হয় একমাত্র খাঁটি বাঙালী উৎসব হিসেবে। এর বৈশিষ্ট্য এই যে, মুসলিম অধ্যুষিত একটি ভূখ-ের উৎসব সত্ত্বেও তা বিষাদময় নয় ; রাষ্ট্র অন্যান্য ক্ষেত্রে সফল হলেও এক্ষেত্রে পারেনি ধর্মজ উপাদান যোগ করতে। শুধু তাই নয়, এখনও এ নববর্ষ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও যোগ করে নতুন মাত্রা। আপনাদের কি মনে পড়ে, সামরিক শাসনামলের প্রতিটি নববর্ষের অনুষ্ঠানে কি বিপুল পরিমাণ মানুষ সমবেত হতো। নববর্ষে যারা শুধু ঘরে বসে ছুটি ভোগ করতে চান, তারাও কি প্রেরণায় সে সময় যোগ দিতেন এ উৎসবে? এ সমস্ত বৈশিষ্ট্য মিলে বাংলা নববর্ষকে আখ্যায়িত করতে পারি, পৃথিবীর এক বিরল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উৎসব হিসেবে।

তথ্যনির্দেশ

১. মুহম্মদ এনামুল হক, ‘বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ’ মনীষা মঞ্জুষা, তৃতীয় খ-, ঢাকা, ১৯৮৪, পৃ. ১৬।
২. ঐ, পৃ. ১৭ ।
৩. ঐ, পৃ. ১।
৪. ঐ, পৃ. ৩।
৫. শামসুজ্জামান খান, ‘বাংলা সন ও তার ঐতিহ্যানুসন্ধান’ এমদাদুল ইসলাম সম্পাদিত, বৈশাখী’, ঢাকা, ১৩৯৯, পৃ. ১৮ ।
৬. পল্লব সেনগুপ্ত, ‘নববর্ষ, হালখাতা এবং গণেশ পূজা’ উৎস ও উৎসব, পূজা পার্বনের উৎসব, কলকাতা, ১৯৯০, পৃ. ৬৮-৬৯।
৭. এনামুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯-২০।
৮. আঞ্চলিক উৎসব বিষয়ক বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন, প্রাগুক্ত গ্রন্থ।
৯. ঐ, পৃ. ২০-২১।
১০. বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশের মেলা, ঢাকা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024