মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ০২:৪৭ অপরাহ্ন

চিঠিযুগের অববাহিকায় 

  • Update Time : শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭.০১ পিএম

দিলরুবা আহমেদ

 

দিশাটা বেশ কিছুদিন থেকেই নেই, হাওয়া। চারদিকের আবহাওয়ায় কোনো অভাস নেই সে কোথায়, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সে বেমালুম গায়েব।

মেয়েটি এমন-ই।এই আছে এই নেই, বিজলি বাতির সাথে তাল মেলাতে ওস্তাদ।ডিপার্টমেন্টে মেয়ে মাত্র দশটি।ভার্সিটিতে একজন না এলেই ঘন্টা পরে, আর দিশা নেই, এ- তো পাগলা ঘন্টি বাজার সামিল।তার অনুপস্থিতি ঘটা করেই চোখে পরে।সোনা-র ভাষ্য অনুসারে ছেলেগুলোকে মনে হয় দিশেহারা।জুঁই প্রায়ই বলে, ওর যত ভাব সব ওই পঙ্গপালের সাথে। আর ভাবখানা হাউ স্মার্ট আই এম।জুঁই প্রায় প্রায়ই ওই পিছনে টিপ্পনি কাটে, এই রে ইস্মার্ট আসিতেছে ।ইস্মার্ট নামটা গড়াতে গড়াতে এসে ঠেকেছে ‘ইসস সব মাটিতে’।

এখন এই মেয়েই নেই।হাসা-হাসির সাবজেক্টে টান পড়া মাত্রই এই মেয়ের খোঁজ।জুঁই প্রস্তাব করলো,’ছাত্রী’-তেই একটা বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে। ভার্সিটির ছাত্রীদের পত্রিকা ‘ছাত্রী’ তাই ভার্সিটির ছাত্রী নিখোঁজ, এই বিজ্ঞাপনটা ওরাই পেতে পারে।’খোঁজ খোঁজ রব ‘ এই হবে শিরোনাম।ভেতরে লেখা থাকবে, অনতিবিলম্বে তার চাঁদপানা মুখটি করিডোরে প্রদর্শিত না হলে টপাটপ তিনতলা থেকে নয়জন  যুবতী বাংলার মাটিতে ঝাঁপিয়ে পরবে।

সোনা বাধা দিলো, বললো , কি জ্ঞান রে তোর জুঁই, নয়জন কি একশো জনকে ধরে এনে আগুনে, নদীতে, কিংবা চিনি খেয়ে সুইসাইড করতে বলা হলেও ওই চাদ পলাতক মুখখানার দেখা মিলবে না। তার চেয়ে ভালো হয় লিখলে, ডজনে ডজনে ছেলে তার অভাবে উন্মাদ প্রায়, তাহলে হয়তোবা এতে  কাজ হবে।

মিমি বিরক্ত হয়।বলে, ‘চাঁদ পলাতক’ আবার কি কথা? তুই ওর উপর রেগে আছিস বলে পুলিশি ভাব করবি নাকি।সোনা উত্তরে কেবল তার স্বভাবসিদ্ধ মুখটাই বাকালো। মিমি বললো, ভার্সিটির ফাস্ট ইয়ারের ছাত্রীর এরকম মুখ বাঁকানো কখনোই ঠিক না।উত্তরে সোনা আবারো মুখটাই বাকালো।

মিমি এবার হেসে ফেললো, বললো, আসছে শবে বরাতের রাতে এভাবেই রাত ভর মুখ বাকিয়ে বসে থাকিস, তাহলে বাকি জীবন তোর মুখটা বাংলার পাঁচের মতন হয়ে যাবে। মেঙ্গফেস ।

সোনা উত্তরে এবার কেবল উল্টা দিকে মুখ বাকালো।দিশার সাথে তার কোন একটা ক্লাসের কি একটা এসাইনমেন্ট ছিল, দিশা তা না করে হাওয়া, তাই সোনার মুখের গাল দু’টি একবার ডানে যাচ্ছে তো আরেকবার বায়ে। জুঁই বললো, সোনা মুখের ব্যায়াম করছে, ভি-সেইপ করতে চাচ্ছে, আজকাল তো সবাই চায় ইংরেজি ভি -এর আকৃতির মুখ।গোলগাল মুখের দিন শেষ। মুখের চামড়ার ভিতরে বাঁকা আংকটা ঢুকিয়ে টেনে তুলে ফেলছে ঝুলু ঝুলু মাংস, তারপর টোনাটুনি স্টাইলে সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে।সোনা এবার বিরক্ত হয়, বলে, দুনিয়াদারি এতো সহজ নয়, সবাই তোহ আর তোর মতন বড়োলোকের মেয়ে না।জুঁই-ও চুপ থাকে না, বলে, জানি অনেকেই ছোটলোকের মেয়ে।বামন লোকের মেয়ে।তবে আমরা সবাই লম্বা লোকের মেয়ে, ছোট লোকের না।খেয়াল করেছিস আমাদের  বাবারা কিন্তু সবাই লম্বা লম্বা।

বলে হাসে।

জুঁই এমনই, কোথায় সে কাকে কিভাবে ঘায়েল করবে কেও বলতে পারেনা।

কি সব কথা বার্তা, বলে মিমি এবার বিরক্ত হয়ে ওদের দিকে তাকায়।

সামনে পরীক্ষা, আর এদের কি সব বাক্য বিনিময়।সেমিনার লাইব্রেরিতে বসে বসে যত দুনিয়ার উদ্ভট ভাবনা।বলে, রাখ তো তোদের অযথা বকবকানি।ওয়ান টুর বাচ্চাদের মতন শুধু ফড়ফড় করা। জুঁই সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে বলে, মাই ডিয়ার মিমি, তোর ওই কিন্ডারগার্ডেনের বাচ্চাদের জ্ঞানের সীমানা কত দূর যে এই নিয়ে ওরা ফড়ফড় করবে? ওরা একটা মেয়ের জন্য ডজনে ডজনে ছেলের পাগল হওয়ার ব্যাপারটা কি বুঝবে? বল বল ?

জুঁইয়ের কথায় মিমি হেসে ফেলে, বাকিরাও।

‘তাইতো’ বলে এবার মিমি মাথা দোলায়।জুঁইয়ের দিকে চেয়ে বলে, থাঙ্কস, তুই মহান , আমাকে এতটা জ্ঞান দেওয়ার জন্য। মহান ব্যক্তি হয়ে জুঁই তার কলার টানার ভঙ্গি করতে গিয়ে দেখে কোথায় কলার , কিন্তু তাতে কি , ওড়না আছে , ওতেই চলবে , দুইবার ওড়নার এক প্রান্ত ধরে উঁচু নিচু করে। তারপরই বলে উঠে ওই যে, “চুপ করো, চুপ করো ” আসিতেছে, এবার চুপ করো।

আসছেন হিরু ভাই, সেমিনারের দায়িত্বে উনি কর্মময় থাকেন। সারাক্ষন বলতে থাকেন চুপ করেন, চুপ করেন।আপনারা চুপ থাকেন, বাকিদের পড়তে দেন। প্রতিটি বিভাগের সাথেই একটা করে সেমিনার লাইব্রেরি আছে।এবং একজন করে কাঁচা পাকা চুলের হিরু ভাই আছেন।বছরে বছরে নতুন নতুন ছাত্র আসে , পুরাতন চলে যায় , কিন্তু হিরু ভাই রয়ে যান অনেক অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে।মিমির ধারনা, উনি যতবার বলতে থাকেন “চুপ করো,চুপ করো “, তাতে উনারই চুপ থাকা হয়না।সোনা তো প্রায়ই বলে উনারই সবচেয়ে বেশি কথা বলা হয় ওই চুপ চুপ চুপ বলতে বলতে।গুনলে দেখা যাবে উনি যতবার করে ওই এক চুপ থাকেন বলতে থাকেন তার অর্ধেক সংখ্যক কথাও বলা হয় না তাদের।তবে যে কোনো বিষয়ে যে যত গুল মারে সব গুলি ছুটে হিরু ভাইয়ের দিকে।কে বলেছে জিজ্ঞেস করতেই  অনেকেই আড়ালে অল্প হেসে দেখিয়ে দেয় ওই হিরু ভাইকে। সেমিনারের এতো বই থেকে পড়ে পড়ে সব জ্ঞান নাকি উনি পেয়েছেন, উনি নিজে বলেন না একথা, অন্যরা বলে, অন্যরা যদিওবা কখনোই দেখেনি হিরু ভাইকে একটাও বই পড়তে, তারপরও উনিই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ’দি নন্দ ঘোষ’।

মিমি উঠে পড়লো।হিরু ভাইকে সেমিনার লাইব্রেরির বইটি ফেরত দিয়ে বেরিয়ে আসে।সাবসিডিয়ারি ক্লাস আছে।সমাজতত্ত্ব।সে ছাড়া আর কারও সমাজতত্ত্ব নেই।একলা চলরে।পেছনে ওরা কলকল শব্দে গল্প করছে।সাথে সাথে অবশ্যই ভেসে আসছে সেমিনার মেন হিরু ভাইয়ের, চুপ করেন , চুপ করেন।

মিমি সিডি বেয়ে চারতলা উঠে আসে।দিশা পাশে থাকলে পেসেঞ্জার ট্রেনের মতন মিমিকে একশো বার থামতে হতো।একটু পর পরই দিশা দাড়াতো। এবং কারও না কারও সাথে দুই তিন লাইন থেকে বিশ পঁচিশ লাইন পর্যন্ত কথা অনর্গল বলে যেত যতক্ষণ না মিমি হাত ধরে একটু নাড়া দিতো।আজ নন স্টপ ট্রেনের মতন মিমি চার তলাতে উঠে এলো।

ক্লাসের সামনে জটলা। সাবসিডিয়ারি ক্লাসে এই এক মজা। অনেক ডিপার্টমেন্টের অনেক পরিচিত মুখের দেখা মেলে।মিল বন্ধন চলে।জটলার মধ্যমনি জনৈক হস্তরেখা বিশারদ। ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন উনি।তাই দাবি করছেন।দিচ্ছেনও বলে ঝটপট।অতএব মহা উত্সাহে হাত দেখাচ্ছে এবং দেখছে।আর বক্তব্য শুনে উহ আহ, কতকি কথার আতশবাজি।দিহান বলেছিলো, সব ইয়ারেই এরকম হস্ত বিশারদ গজায় যখন তখন, কয়েকটা করে।তবে ফাস্ট ইয়ারে এদের উৎপাত বোকাবাজি বকাবাজি থাকে বেশি।পরে ক্রমে হয়ে যায় বোবাবাবা।

মিমি চেয়ে দেখলো চারদিকে, নেই কোথাও ,দিহানের আজ দেখা নেই। শাটল ট্রেনে আসে নি সে।পরে কি এসেছিলো বাসে? মুরাদপুর থেকে অনেক বাস আসে চট্ট্রগ্রাম ভার্সিটির দিকে।সময় বাঁচাতে বাসে ঝুলতে ঝুলতে সে কি পৌঁছে গেছে তার আড়ালেএই চত্বরে। ক্লাস করছে কি? ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র।ওই শাটল ট্রেনেই দেখা, ট্রেনেই আলাপ।আলাপ খুবই সামান্য।কিন্তু কি যেন রয়েছে কোথাও, কি যেন হয়েছে কোথাও, বাতাসে যেন কি এক রাগ সুর কথকের আলাপন।সে কিসের যেন আহব্বান আর হাতছানি পায়, পেয়েও হারায়, নজর দিতে চায় না, নেশাতুর কিছু যেন মোহময় ভাবনাতে মাদকতা ছড়িয়ে তাকে তাড়া করে।জড়াতে চায় কি যেন কি তার আঁচলে।ভাগ্গিশ সে শাড়ি পরে না।সে সংগোপনে সরে সরে যেতে যেতে কিন্তু আবার ফিরে ফিরেও চায়।এই বিশ বছর বয়সেই সে পরিচিত একজন বলিষ্ঠ নারী, সহিষ্ণু দরদীমনের, নির্ভেজাল বন্ধু

প্রিয় একজন মানুষ হিসেবে।সে দৃঢ়, এমনি থাকবে, কোনো দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেবে না।তারপরেই নিজেরই মনে হয়, তাহলে কি তার মনেও রঙিন ফানুস ফুটতে চাইছিলো। জুঁই শুনলে বলতো আলামত খারাপ, ভয়ঙ্কর।মিমির হাসি পেয়ে গেলো।বুঝতে পারছে সে চাখ বা না চাখ, যে কোনো আঙ্গিক থেকে যে কোনো ভাবেই হোক দিহান তার কাছে চলেই আসছে।এ কেমন হাঙ্গামা? এ কেমন আক্রান্ত হওয়া! নিজে নিজেই বলে, ডিলিট ডিলিট, ডিলিট হিম।কিছুই জানে না যার সম্পর্কে কেন ভাবছে তাকে নিয়ে, অযথাই।

এখন সামনের নস্টারদুমাস মিমির দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ালো, বললো, দেখিতো তোমার হাতটা।চেনা নেই জানা নেই, বলছে তুমি করে, একদম বেশি বেশি।মিমির-ও খুব মন চাইলো, জুঁইয়ের মতন করে ডানে বায়ে মুখ বাঁকাতে। সাথে সাথেই মিমিও বলে দিলো, কোনো দরকার নেই। মনে মনে বললো, আমার হাত ধরার ফন্দি, নাহ!! আগামীদর্শী কি আর চুপ করে থাকবে, বললো, অনেক বড়োলোক হবে তুমি।

মিমি বললো, তুমি তো দেখছি, হাত না ধরেই সব বলে দিতে পারো। অনেক জ্ঞান।বিজ্ঞান তোমাকে দেখলে ভয় পাবে।

ছেলেটিও হেসে বললো, যেদিন হবে বড়লোক, সেদিন আমাকে মনে পরবে তো!

মিমি নির্বিকার ভাবে বললো , ১ ১২ ৯ (এক বারো নয় )।নেভার।

কবি মার্কা আরেক ছেলে এসে জানালো আজ ক্লাস হবে না।ধুর, মিমি বিরক্ত হয়।ট্রেনে করে এতদূর এসে যদি শুনে ক্লাস হবে না, তাহলে কার ভালো লাগে? চট্রগাম ভার্সিটির শাটল ট্রেন যতই প্রিয় হোক, দূরত্ব দূরত্বই।

কবি মার্কা ছেলেটি খুব হাসি দিয়ে বললো, এবার চলো সবাই মিলে গান করে করে ভার্সিটির রেল স্টেশন পর্যন্ত চলে যাই। সবাই একসাথে যার যেটা মনে পরে তাই গাইবো, কেও কারো গান শুনবো না।শুধু গাইবো।

ওরে আল্লাহ কি আবদার, ক্লাস হবে না এই খুশিতে গলা ছেড়ে গাইবে তারা এখন।

এই সব কবি মার্ক ছেলে গুলোকে মিমি কেন যেন কখনোই পছন্দ করতে পারেনা।কাম নাই তো আর তার ! গান গেয়ে গেয়ে চলে যাবে স্টেশনে! আর কবি হলেই কে বলেছে এদেরকে লম্বা লম্বা চুল, উদাস ভঙ্গি, পাঞ্জাবিতে ময়লা, ধুর, একদম বাজে।একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বোধ হয় সবাই মনে মনে কবি, কবিতা লিখতে চায়, কিন্তু সবাই কবি হতে পারে না।কবি হতে অনেক প্রতিভা লাগে।অনেকে তা অবশ্য জানেও না।

দিশা আবার কাব্য প্রেমিক।সে যে এমন ভাবছে জানলেও কু কু মু মু গু গু  করে প্রতিবাদ জানাবে।

ছেলেটি হঠাৎ বললো, দিশা কোথায়, আসে না কেন আজকাল।

মিমি অবাক হয়ে যায়, এ কে ? দিশাকে চেনে কেমন করে ?

ছেলেটি মনে হয় তার মনের কথা বুঝেছে।জোতিষী সাজছে যখন তখন তো অনেক মনের কথাই  তার বুঝে উঠতে হবে।

হেসে বললো, আমাকে চেনো না তার কারণ আছে, আমি নতুন এসেছি এই চট্রগ্রাম উনিভার্সিটিতে। দিশা আমার পত্র প্রেমিকা।

মিমি অবাক হয়।বলেও উঠে, হোয়াট।এই যুগে কেও চিঠি লেখে কি।ইমেইল প্রেমিকা, স্যাটেলাইট প্রেমিকা, মুভি ওয়াচ টীম প্রেমিকা, এমন কি ফেইস বুক প্রেমিকা বললেও চলতো।এ তো দাবি করছে চিঠি প্রেমিকা।মা -গো, এ কোন আদ্দি কালের পদ্দি বুড়া ? মিমি ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলো।

নতুন আগুন্তুক নতুন কথা শুনালো, বললো, আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বেশ কিছুদিন আগে চিঠি ছোড়া শুরু করি।যেদিকে মন চায় সেদিকে।অচেনা অজানা অনেককে।তো তখন ঠিকানা একটা সমস্যা। তাই যা করলাম আমরা তা হলো অন্যান্য বিশ্ব বিদ্যালয়ের হলগুলোর নাম বার করে , আমার যে রুম  নাম্বার তা দিয়ে চিঠি দিতে শুরু করলাম। আমার রুম নম্বর ৩১৮,  তাই সব বিশ্ব বিদ্যালয়ের ৩১৮ আমার টার্গেট, অন্য বন্ধুরাও এই নিয়ম ফলো করলো।উত্তর তো আর আসে না ।শেষে দিশা দিলো ইশারা।দিশেহারা এক পত্র লেখক  এই আমি দিশা পেলো দিশাতে। আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম দিশা নামটা ভুয়া। পরে দেখি না ঠিক।পুরা এক বছর পত্র আলাপ। তারপর প্রেম হতেই বহু কষ্টে এই ভার্সিটিতে মাইগ্রেট করে চলে এলাম।এখন আজ এতো দিন ধরে তোমাদের ডিপার্মেন্ট এ যাচ্ছি আর আসছি দিশাকে তো কোথাও পেলাম না।

তোমাদের ওই হিরু ভাই তো আজকাল আমাকে দেখলে এমন মুখ ভঙ্গি করে যেন আমি এক ভিন গ্রহের এলিয়েন এসেছি তার রাজত্বের কোনো মেয়েকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যেতে।

মিমি  হাসলো এবার। উনি এমনই, খুবই  প্রটেকটিভ। ওনাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাদের বিভাগীয় লাইব্রেরি ও সেমিনার দেখে রাখতে কিন্তু উনি ছাত্র ছাত্রীদের অভিভাবক হয়ে উঠেছেন, এমনই ভাব করেন, সেরকমই ভাবসাব।আর তাছাড়াও, অচেনা কেও এসে ওনার ডিপার্টমেন্টের কোনো মেয়ের খোঁজখবর নেবেন, তাইবা উনি সোজা চোখে দেখবেন কেন ?

-এতো জটিল !

-এটাই সহজ কথা ও ভাবনা।আমিও যে দিশার ডিপার্টমেন্টে বুঝলে কিভাবে?

সেও ‘তুমি’ করেই বলছে। পাটকেল দিচ্ছে ইটের বদলে।

-নজর রাখছিনা আমি !

তারপর এক গাল হাসি দিয়ে বললো,

– দিশা-ই বলেছে তোমাদের কথা।তুমি জুঁই , সোনা , তোমরা বন্ধু , ছবিও দেখিয়েছে ।

-ও কিন্তু কখনও কিছু বলে নি তোমার কথা ।কিছুই না।আমরা কিছুই জানিনা।

– জানালে তোমরা কি খুশি হতে ?

-মজা পেতাম। ও কাকে পছন্দ করবে না করবে  সেটা ওর ব্যাপার।ও খুশি হলে আমরাও খুশি ।কিন্তু আমরা জানি ওর বাবা -মা খুব স্ট্রিক্ট।

– তাই বলেছিলো সে-ও।তোমার কাছে কি ওর ফোন নাম্বার আছে ?

– তোমার কাছেই তো থাকবার কথা ।

– না নেই।আমরা হয়েছিলাম চিঠি যুগের প্রেমিক প্রেমিকা।তাই ফোন নম্বর নেই নি পস্পরের থেকে। এমন কি কোনো সোস্যাল মিডিয়াতেও আমরা যোগাযোগ রাখিনি।ব্যাপারটা রেখেছিলাম খুবই কাব্যিক, সনাতন, এডভেঞ্চারাস জাতীয়।একজন ডাকহরকরা নির্ভর।এখন পথে খুঁজে ফিরছি ওকে।পাচ্ছি না ওকে কোথাও।চিঠি দিচ্ছি উত্তর পাচ্ছি না।

-আমিও তো অচেনা একজনকে তার ফোন নম্বর দিতে পারিনা।

-তোমার যুক্তি আমি বুঝতে পারছি , কিন্তু আমার যে ওর সাথে যোগাযোগ করা খুব জরুরি।

-দিশা এলে বা ফোনে আমি ওকে পেলে তারপর জানাবো তোমাকে ফোন নম্বর,  যদি দিশা দিতে চায় তাহলে।

মিমি দেখলো দিশার জন্য পাগলা এই কবি কবি ভাবের ছেলেটি  কবিতা হারিয়ে ফেলছে এরকম চোখ নিয়ে তার দিকে চেয়ে রয়েছে।তার অসহায় ভাব দেখে খারাপ লাগলেও মিমি মমতা দেখাতে গেলো না।তারপর হঠাৎ জানতে চাইলো, নাম কি তোমার ?

বললো, কবি ।

-নামই কবি !

-হ্যা

– এ টা কি পেন নেইম ?

-এটাই আমার ডাকনাম।তাই দিশাকে আমি ডাকতাম কবিতা।

মিমি আনমনে চোখ নাচালো।এতো দূর ! জুঁই থাকলে বলতো তলে তলে এতদূর ! সিঙ্কিং সিঙ্কিং ড্রিঙ্কিং ওয়াটার। এখন বুঝো , একজন হাওয়া , আরেকজন  ধাওয়া , ধাওয়া করছে কোথায় সে জানতে এলোপাথাড়ি বাতাসে।

– তোমার নম্বরটি পেতে পারি?

-নেভার ।কি গ্যারান্টি আছে যে তুমি যা বলছো সব সত্যি। হয়তোবা আমার ফোন নাম্বারের জন্যই এতো গল্প কাহিনী বানিয়েছো ?

– নিঃসন্দেহে তুমি দিশার চেয়ে বেশি সুন্দর কিন্তু দিশা আমার প্রাণের মানুষ।

-ওকে, দেখি আগে দিশা কি বলে, তারপর।

আর দাড়ালো না মিমি, চললো ফিরে নিজের ফেকাল্টিতে।

গিয়েই জুঁই আর সোনাকে এই নতুন আমদানির কথা বলতে হবে।দিশা পারেও বটে । না জানি আরো কতজন প্রেমিক আছে তার!

তিনতলাটা নেমে আসতেই অবাক হওয়ার পালা।বাপস দিশা।বাঁচবে দেখি অনেককাল।ওর কথা বলতে না বলতেই সে হাজির।আড্ডার আসর জমজমাট।সেমিনার থেকে বোধ হয় হিরু ভাই ভাগিয়ে দিয়েছেন।এতো বক বক করলে তো দেবেই। লম্বা করিডোরের শেষ মাথায় কেও টুলে, কেও রেলিংয়ে, কেও ফ্লোরে হাত পা ছিটিয়ে ছড়িয়ে বসে আছে।পিছনে হেলান দিয়ে আছে পাহাড়। সবুজাভ প্রকৃতি। ঠিক পাহাড়ের নিচে বসে পড়ছে কিছু ছেলেমেয়ে,কি অপরূপ এই দৃশ্য।মিমিকে দেখে ডাকাডাকি।স্যারেরা নিজেদের রুমের থেকে বেরিয়ে এবার ধমকালেই বুঝবে মজা।হঠাৎই মিমির  মনে হলো সে কি বেশি ভাবে সবকিছু নিয়ে!! সবটুকু ভাবে সবার সব কিছু নিয়ে।কোনো গাফিলতি না করে পুঙ্খনা পুঙ্খ চর্চায় রাখে জীবনের দায় ও দায়িত্ব গুলোর!!বাপ মায়ের একমাত্র সন্তান সে, তার তো অনেক বেহিসাবি উচ্ছল হবার কথা। মা হয়তো ঠিকই বলেন, যার হয় তার নয়-তেই হয়।নয়-ছয় করে আগায় না দিশার মতন করে।

দিশা এখন টিপটপ ভঙ্গিতে  সামনে দাড়িয়ে। হাসছে মিট মিট করে। শাড়ি পরা ।সোনা রূপায় নাকে কানে হাতে পায়ে ছোঁয়াছুয়ি। অর্থাৎ শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন।বিয়ের পর মেয়েদের দেখতে অন্যরকম লাগে।কেমন যেন একটা মৌ মৌ সৌরভ ওদের ঘিরে থাকে।ওদের আশেপাশের বাতাসেও যেন থাকে হলুদ মেথির গন্ধ ছড়ানো।

চারিদিকে অভিযোগের ঝড়ঝাপটা।

মিমিকেই বিচারক মানা হলো।জুঁই বললো, দেখ মিমি এই মেয়েটা, এই অসভ্য মেয়েটাকে দেখ, আমাদের না জানিয়েই বিয়ে সেরে ফেলেছে।ইশ সব মাটি।

এই কথায় সবাই হেসে উঠলো।’ইশ সব মাটির’ আসলটুকু না বুঝলেও, দিশাও হাসলো।

সোনালী জানতে চাইলো, আমরা কি ভেটো দিতাম, আমরা কি জাতি সংঘ।ইউনাইটেড নেশন্স ? ইউনাইটেড ফ্রেন্ড হতে চেয়েছিলাম কেবল।তাও হতে দিলি নাহ।সব মাটি করে দিলি, মাঠে মারা গেলাম আমরা।

দিশা হেসে বললো, সময় দিলো না তো, খুব দ্রুত বিয়ে হয়ে গেলো।

জুঁই তার লম্বা বেণী চাকতির মতন করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জানতে চাইলো, কেন তোকে সময় দেওয়া হলো না, জাতি আজ তা জানতে চায়।

সব সময়ই জুঁই ভাব করে সে একজন গোয়েন্দা, ডাকসাইটে গোয়েন্দা হবে একদিন, মিস কিরীটি রয়, গোয়েন্দা গিরিতে তার খুব উৎসাহ।সে আরো এক গুচ্ছ প্রশ্ন করে উঠবার আগেই মিমি তাকে থামিয়ে দিয়ে দিশাকে জিজ্ঞেস করলো, বর কেমন ? হাসি মুখেই দিশা বললো, ভালো।দেখতে, কে যেন একজন জানতে চাইলো, আবারো  উত্তর, ভালো।কে যেন আবারো প্রশ্ন করলো, শুনতে ? দিশা হাসতে হাসতে দিলো একই উত্তর, ভালো ভালো।আশেপাশের ডিপার্টমেন্ট থেকে আরো অনেকে এসে জড়ো হয়েছে।কে একজন বললো, আইইই এতো হাসছিস কেন, একটু লজ্জা পেয়ে পেয়ে জবাব দেয়।অনেকেই একসাথে এই কথায় আবারো হেসে উঠলো।

মেয়েদের জটলা থেকেই গুনগুনিয়ে উৎসাহ নিয়ে কেও জানতে চাইলো,আইই, তোরা বাসর ঘরে কি কি কথা বললি রে ? দিশার এবার যেন হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে।সে কেবলি হাসছে।কমন প্রশ্ন।যে কেও বিয়ে করে আসলেই ওই এক প্রশ্ন উঠে। কি কি কথা বললি রে তোরা।তারপর বলবে আজ তোকে খাওয়াতে হবে।জানে মিমি এই সবই উঠে আসবে একে একে।

মিমি জানতে চাইলো, ফোন কি ছিল না তোর সাথে এতো দিন, কেও তো আমরা যোগাযোগই করতে পারছিলাম না তোর সাথে ।প্রায় এক মাস তো হবেই । ফাস্ট ইয়ার থেকে তোকে আর সেকেন্ড ইয়ারে যেতে হবে না।

দিশা হেসে বললো, যাওয়া হবেও না।

সবাই চেচিয়ে  উঠে বললো, কেন, হোয়াই ? তুই কি বিদেশী হয়ে যাচ্ছিস নাকি গৃহ বন্ধিনি ?

দিশা বললো, ঠিক তাই, জাপানে চলে যাচ্ছি।

এবার প্রশ্ন চলতে লাগলো জাপান ঘিরে। গুগুল দেখে দেখে সবাই কত কিছু জানাতে লাগলো। জাপান হচ্ছে এই মুহূর্তের এদের সবার কাছে সবচেয়ে আলোচিত দেশ, ওই দেশের সূর্য নিভানো যাবে না এখন, একগুচ্ছ ভার্সিটির মেয়ে নিবিড় ভাবে প্রচুর উৎসাহ নিয়ে  উঁকি মেরে মেরে দেখছে তাদের বান্ধবীর হবু আবাসস্থল।

এক সময় দিশা উঠে পড়লো, বললো আরো কিছু কাজ আছে , টিচারদের সাথে দেখা করা, মেইন লাইব্রেরিতে কিছু বই ফেরত দেওয়া, আরো কি কি যেন।কিন্তু জুঁই শুনেই বলে দিলো, যাচ্ছে ওই পঙ্গপালের সাথে দেখা করতে।আরো বললো, দেখলি আমাদের একবার-ও বললো না ওর বাসায় যেতে, বরের সাথে দেখা করতে,দেখবি ছেলেগুলোকে এখন গণহারে দাওয়াত যদি না করে তো…,তাকে শেষ করতে না দিয়েই মিমি বললো, তাহলে তোর নাম জুঁই থেকে জয়েন্ট করে দেওয়া হবে।মিমি-র কথায় সবাই হেসে ফেললো, কেবল জুঁই গাল  ফুলিয়ে বললো, বেশি বেশি ঢং হয়েছে তোদের।

কিন্তু দিশা ফিরে এসে ওদের পাশে বসে পড়লো।জানালো ওদের কাছেই থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে,আরো বললো , কি যে ঝড় গেলো গত কিছু দিন।বললো, এখন চুপচাপ তোদের কাছেই বাসে থাকি কিছুটা সময়।এখান থেকেই একসাথে শাটল ট্রেনের দিকে চলে যাবো।

দিশাকে অনেক নরম আর মায়াবতী লাগছে মিমি-র চোখে।অনেক শান্ত।

দেড়টা বাজতেই সবাই ছুটবে শাটল ট্রেনের দিকে, মিমির কেন যেন মনে হলো ওই কৰির সাথে আজ দিশার দেখা না হওয়ায়ই ভালো।দিশাকে জানাতে হবে কে এসেছে এই চত্বরে।রেল স্টেশনের দিকেই তো যাওয়ার কথা বলছিলো ওই ছেক্কা খাওয়া কবি। মিমি বললো ,

-তুই তো চলেই যাবি, জাপান, তো চল আমরা গিয়ে ফ্যাকাল্টির পিছনে ঝর্ণাটাতে গিয়ে বসি।

জুঁই সাথে সাথে বললো ,

-না বাবা, এই ভোর দুপুরে ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। তার চেয়ে চল মাউর দোকানে যাই, চা খেয়ে ট্রেনে। অথবা ক্যাফেটেরিয়াতে যাওয়া যায়।

কিন্তু দেখা গেলো সব কিছু ওই দেড়টার সময়ের ভিতরে শেষ করে শাটলে চড়ার শখ সবার, শহরে ফিরবে, বাসায় যাবে। এমনকি দিশা-ও। বললোও, তার বর  নাকি রেল স্টেশনে অপেক্ষা করবে তার জন্য।

কি বিপদ।মিমি এবার এক রকম জোর করেই তাকে পাশে সেমিনারে নিয়ে গিয়ে ঢুকালো। ভালো ভাগ্য, হিরু ভাই নেই , গেছে হয়তো কোনো দিকে।ফিসফিসিয়ে বললো,

– শুন, খুব জরুরি কথা আছে।একটা ছেলে এসেছে, কবি নাম তার, তোর ফোন নম্বর চাইছে। বলছে তোর নাকি প্রেম আছে ওর সাথে।

– পত্র মিতা সে।পত্র প্রেমিক হয়ে উঠেছিল বলতে পারিস।সেটাই  তো কাল হয়েছে আমার জন্য ।তার চিঠি হাতে পড়েছে বাপ্ ভাইদের, ব্যাস ধরে বিয়ে।এবার পড়া বন্ধ করে তোদের ছেড়ে বিদেশ চলে যাও ।আমি ওই পত্র লেখকের নাম-ও আর শুনতে চাইনা।জানিও না যে তার কথা বলতে ভাবতে আমি অধিকারও আদো প্রাপ্ত কিনা এখন।

-কেঁদে বলছিস কেন কথাটা ?

– কান্নাও থেমে যাবে একসময়।ওকে বলে দিস, মেয়েরা দিনের শেষে স্বামীকেই ভালোবাসে।স্বামীরাই হিরো, ওরাই দামি,ওরাই বহমান,স্থায়ী, স্থিতিশীল।ওকে ফোন নাম্বার দিবি না।কোনো যোগাযোগেরও দরকার নেই।

-এতো কথা বলার কি দরকার ?

– দরকার আছে, তাহলে সে চলে যাবে।

-শাটল ট্রেনে যদি তোকে দেখে ফেলে ?

-সেও চিনবে না,দেখেছে তো শুধু ছবি।ছবি দেখে কতটাই বা আর চেনা যায়! দেখি-ই নি তো কখনো সামনে সামনি।দেখতে কেমন সামনাসামনি ?

– বিরক্তিকর

-আমার জিজ্ঞেস করাই অনুচিত হয়েছে, তাই না! যেমনি হোক, তুই বলবি পচা সে, এ আমি আগেই জানি ।জুঁই হলে বলতো, এত্ত সুন্দর রাজপুত্তর তুই হারালি কিভাবে।

দুজনাই এবার হেসে দিলো।দিশা বেশ দৃঢ়তার সাথে বললো,

-চিনবো না তাকে।চিঠির যুগ পেরিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে কত আগে, ওখানে আর কে ঢুকবে, এ যুগে  কিভাবেইবা ঢুকবে।ভাবছি ওর ব্যাপারে সবার সাথেই চুপ করে থাকবো, একেবারেই চুপ।

হঠাৎ চুপ চুপ শুনে, দুজনেই চেয়ে দেখলো হিরু ভাই পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন।অবাক হয়ে চেয়ে দেখছে দিশাকে।দিশা বললো, আবার হয়তো আসা হবে এখানে এমন আশা নেই। আজকেও বলবেন চুপ চুপ।

হিরু ভাই হেসে বললেন, জীবন ভর চুপই থাকবার চেষ্টা করবেন। যত বলবেন ততই সমস্যায় জড়াবেন।শামুক মুখ বন্ধ রাখে বলেই মুক্তার জন্ম হয় ।

দুজনেই চেয়ে রয়েছে অবাক হয়ে তাই দেখে হিরু ভাই বললেন, প্রায়ই এসে একটি ছেলে খোঁজ করে আপনার, নিখোঁজ হয়ে যান তার জন্য, কিছু কিছুকে হারিয়ে যেতে দিতে হয়, পিছু নিতে দিতে নেই।মিছে তাতে পিছুটান বাড়ে।এক জীবনে পিছু ফিরে তাকানোর সময় কই, কারো ?

একসময় তিনতলা থেকে নেমে এলো নিচে। চলছে সদলবলে ট্রেন স্টেশনের দিকে।

ফেকাল্টির নিচে পাহাড়ের পাশে সেই অনেক দিনের পুরাতন একটা লাল রঙের ডাক চিঠির বাক্স আই বুড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

দিশা হেসে বললো, এটার পাশে আমার একটা ছবি তুলে দেয় তো, জাপান নিয়ে যাবো। ওই দেশের মানুষদের দেখাবো, দেখাবো কোথায় আমরা এক সময়ে এক বয়সে অযথাই অনেক স্বপ্ন বুনি কিছু না বুঝেই, তারপর কিছু না ভেবেই এতে জমা করি, পাতায় পাতায় কোথাও উড়ে যেতে।

দূরে দেখা গেলো ওর বর গাড়ি নিয়ে ভার্সিটিতে চলে এসেছে ওকে নিয়ে যেতে, সাথে ভাই-ও আছে , বুঝা যাচ্ছে এখনো পাহারায় রেখেছে, কখন কার মতিগতি কোনদিকে ছুটে কেও তো তা জানে না, সবাই সাবধানে আছে।

দিশা হাত বাড়িয়ে বললো,

-চিঠি গুলো দিয়ে দিস। আছেই এই দুই তিনটা।বাকিগুলো বাবা আর ভাইয়েরা জানিনা কি করেছে।মিমি বললো,

– রেখে দে না তোর কাছে।

– এবার তাহলে জামাইয়ের হাতে পরে আমার আরেকবার বাজুক বারোটা।বলে হাসতে লাগলো।বললো,

-ভেবেছিলাম ডাক যোগে পাঠিয়ে দেব।দেখা যখন তোর সাথে হয়েই গেছে দিয়ে দিস হাতে হাতে।এগুলো এখন অপ্রয়োজনীয়।আরো বললো, ও সব জানে। সবই ওকে বলে দিয়েছি।চিঠি চিঠি প্রেম শুনে সে খুব মজা পেয়েছে। আমার ভাই জানে না তো তাই খোলা তরবারি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলে দিশা আবারো হাসলো।

দিশা সবার থেকে বিদায় নিয়ে ছুটলো বরের গাড়ির দিকে, তার নতুন গন্তব্যে।

মিমির হঠাৎ মনে হলো, বাহ্ বেশ ভালো বুদ্ধি তো, কেমন হয় যদি বেনামে সে দিহানকে চিঠি লেখা শুরু করে।সেই পুরাতন আমলের মতন হলুদ খামে একটা করে চিঠি পাঠাতে শুরু করে সপ্তাহে ?

জানতে খুব ইচ্ছে হলো তার, চিঠিতে হয় কেমন করে প্রেম! হয় কি আদৌ?

আনমনে অযাচিত ভাবেই চলন্ত শাটল ট্রেনের পাদানিতে বসে মিমি খুললো একটা চিঠি। ছোট্ট চিঠি ।প্রথম চিঠি ।

৩১৮ নম্বরের অনামিকা ,

তোমাকে সরলিকাও ডাকতে পারি,

কিংবা বেহুলা বা মালবিকা।

সবটাতেই তুমি অনন্যা । সবটাতেই তুমি অচেনা ।

নোনা জল খেয়ে লেগেছি তোমাকে জানতে। নিত্য নতুন চিঠি পাবে, প্রতিদিন, একটা করে।

উত্তর দিও আমাকে জানতে। জানাতে।

প্রতীক্ষায়,

আর প্রতীক্ষার ইতি-তে ,

একজন মানবিক মানব,

সে আমি, যার নাম কবি ।

তারপর দিন তারিখ আর প্রেরকের শহরের নাম।

শহরের নাম দিয়েছে বনফুল। আছে নাকি ওই নামে কোনো শহর ? ভূগোল ঘেটে দেখতে হবে।গুগুল করলেও জানা যাবে অবশ্য।

মিমি আপন মনেই ভাবে, চিঠি যুগের ভাষা কি এমনই ছিল, এতটাই কাব্যিক ? এখন হলে তো আজকের তারুণ্য কয়েকটা ইমোজি দিয়েই কাজ সেরে ফেলতো, বেশির ভাগ-ই তাই করতো।এতেই ভেগে যেত বা ভাগিয়ে নিতো অন্যজনকে মন পছন্দের দরকষাকষিতে।

বদলে যাওয়া সময়ে দাঁড়িয়ে ডাকছে তাকে আদিময় কিছু। হ্যা, সে একজন লণ্ঠন হাতে ডাকহরকরা। মিমি বুঝতে পারছে সহসাই সে একটা চিঠি লিখতে যাচ্ছে, হয়তোবা দিহানকেই ।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024