শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ০১:৩১ অপরাহ্ন

অনুপমের ভিটে দর্শন

  • Update Time : শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৮.২২ পিএম

স্বদেশ রায়

গাড়িতে যতটা ধকল পোহাইতে হইবে মনে করিয়াছিলো তাহা মোটেই ঘটিল না। বরং ঘুমাইয়াই অনেকটা পথ আসিয়াছে। গাড়িতে রওয়ানা হইবার পূর্বে সে মনে করিয়াছিলো, চারিপাশে গ্রামের দৃশ্য দেখিতে দেখিতে যাইবে। যাহা তাহার জীবনের শেষ প্রান্তের একটি বড় ধন হইবে। ভাবিয়া গাড়িতে উঠিয়া অনুপম  চোখ  বেশ ভালো করিয়া মেলিয়া গ্লাসের ভেতর দিয়া বাহিরের দিকে তাকাইয়াছিলো, কিন্তু কিছুটা পরেই তাহার চোখে ক্লান্তি নামিয়া আসিল। বড় এক ঘেয়েমি মনে হইতে লাগিল। মাঠের ভেতর কিছু সবুজ ফসল আর এলোমেলো কিছু বাড়ি ঘর। গাছপালাও কিছু আছে। তবে ইইা মোটেই নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর সব প্রান্তেই তিনি একই দৃশ্য দেখেন। কখনো কখনো ভালো লাগে, আজ যে একেবারে ভালো লাগেনি তাহা নয়, তবে দ্রুতই তাহার চোখ ও মন ক্লান্ত হইয়া যায়। শুধু মন নয়, বয়স্ক শরীরটিও ক্লান্ত হইয়া পড়ে। তাই কখন যে ঘুমের কোলে ঢলিয়া পড়িয়াছিলো তাহা তাহার মনে নাই।

ঘুমটি ভাঙিল নিজের ভিটের সামনে আসিয়া। যদিও তিনি ভিটে দেখিতে আসিয়াছেন, তারপরেও তা মোটেই ভিটে নয়। এখানে বাড়ি ঘর সবই আছে। এমনকি তাহারও একটি বাড়ি আছে। প্রশ্ন উঠিতে পারে যে মানুষটির জন্ম আমেরিকায়, যাহার বাবা যৌবনের আগেই এই বাড়ি ঘর ছাড়িয়া প্রথমে কয়েক বছর দিল্লি কাটাইয়া পরে লন্ডনে পৌঁছান এবং সেখানে কিছু কাল কাটাইয়া আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনে গিয়া থিতু হন। যাহার ফলে যে মানুষটি পোটম্যাক নদীকে চিনিয়া বড় হইয়াছে -তাহার এই পান্ডব বর্জিত বঙ্গে কীভাবে একটি বাড়ি থাকিবে?

পাণ্ডব বর্জিত এই বঙ্গের অনুপমদের বাড়ির গল্প বলিতে গেলে সাত কাহন রামায়নের থেকে বড় হইয়া যাইতে পারে। এমন কি তাহাদের এই বাড়ি ঘিরিয়া যাহারা ছিলেন তাহাদের বর্ণনা দিতে চেষ্টা করিলে হয়তো ছাপান্ন কোটি’র যদু বংশকে ছাড়াইয়া যাইতে পারে।

তাই সে বাড়ির গল্প না বলিয়া শুধু এইটুক বলা যাইতে পারে নদী মাতৃক এই পূর্ববঙ্গে নদীর গা ঘেষিয়া বিশাল বাগ বাগিচা লইয়া একটি বাড়ি এখানে এক কালে দাঁড়াইয়া ছিলো। বাড়ির মূল অধিবাসীরা যে সব সময় এই বাড়িতে বাস করিতেন তাহা নহে। তবে কয়েকটি পর্ব ছিলো, যে সব পর্বের দিন পনের আগে ভেঁপু বাজাইয়া কোন একদিন যখনই বাড়ির অদূরে স্টীমার থামিত, তখনই যেন গ্রামে একটি রোল পড়িয়া যাইতো। গ্রামের বধুরা দুধের বাচ্চাকেও কোলে লইয়া স্টীমার ঘাটের দিকে দৌঁড়াইতেন। ওই দিন স্টীমারের সারেং  ও সুকানিরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিতেন এই ঘাটে। তাহাদের অনেকে স্টীমার হইতে নামিয়া আসিতেন। ততক্ষনে বাড়ির ভেতর হইতে পুকুরের  কয়েকটি বড় মাছ  ঝুড়িতে করিয়া মাথায় লইয়া অন্তত জনা তিনেক লোক অনেকটা দৌঁড়াইতে দৌঁড়াইতে স্টীমার ঘাটের দিকে আসিতেন। তাহাদের পশ্চাতে পশ্চাতে কয়েকটি অবাধ্য ছাগলকে গলায় দড়ি দিয়া টানিতে টানিতে  আরো কয়েকজন স্টীমার ঘাটে আসিতেন। মানুষের ও ছাগলের এ যুদ্ধ গ্রামে নিত্য দিনের -তাই তাহা গ্রামের কাহারো চোখে পড়িত না। কিন্তু অনেক সুকানি বেশ দাঁত বাহির করিয়া হাসিতেন। সে হাসি কি ছাগলের মাংস ও পুকুরের বড় মাছের স্বাদ মনে করিয়া, না মানুষ ও ছাগলের যুদ্ধ দেখিয়া তাহা অবশ্য কেহ ভাবিয়া দেখিত না।

স্টীমার ঘাটের এই আয়োজন শেষ হইত কোন না কোন বাবুর পকেট হইতে আরো কিছু অর্থ বখশিস দেওয়ার পরে। আর ততক্ষনে ভদ্র মহিলাদের মধ্য দু একজন বলিতেন, ইহাদের আরো বখশিস দেওয়া উচিত। কলিকাতা হইতে এই অবধি যেন আমাদের বাড়ির আদর দিয়া লইয়া আসিয়াছে।

স্টীমার ঘাট হইতে সকলে যখন বাড়ির প্রাচীরের মধ্যে প্রবেশ করিতেন তখন যে শুধু সারা বাড়িটি গম গম করিয়া উঠিতে তাহা নহে- গল্প আছে, গোটা গ্রামখানা যেন জাগিয়া উঠিত। শিশুরা নাকি কান্না ভুলিয়া কেবলই হাসিত।

আজ অনুপম যখন গাড়ি হইতে নামিল তখন পড়ন্ত দূ‍পুর। তাহার বাড়ির অদূরে কয়েকটি চায়ের দোকান। সেখানে জিন্স প্যান্ট ও টি শার্ট পরা কয়েকটি তরুণ বসিয়া যতটা না চা পান করিতেছিলো তাহার চেয়ে কোন একটা বিষয় লইয়া তাহারা আলোচনায় অনেক বেশি মশগুল ছিলো। তাহা ছাড়া প্রতিদিন এখানে কেহ না কেহ, নানান কাজে গাড়ি লইয়া আসে। তাই অনুপমের আগমন একমাত্র ভিটের কোনায় একটু কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেঁজুতি গাছ ছাড়া আর কাহারো চোখে পড়েনি।

অনুপম মনে করিলে মনে করিতে পারিতো তাহার ঠাকুর্দা একবার কোন এক কারণে দিল্লিতে কয়েকটি সেঁজুতি গাছ দেখাইয়া বলিয়াছিলেন, আমাদের পূর্ববঙ্গে গ্রামে যে বাড়ি ছিলো, সে বাড়িতে এই সেঁজুতির বাগান ছিলো। এবং ইহার চাইতে আরো মজার কথা তিনি বলিয়াছিলেন, ওই সেঁজুতি বাগানের মধ্যে পদ্ম গোখরো সাপ থাকিতো, আবার সে বাগানের সামনে বসিয়া গ্রামের দরিদ্র মেয়েরা মনসাকে পূঁজো দিতো।

অনুপম বা তাহার ঠাকুর্দা কাহারো মনসামঙ্গল পড়া ছিলো বলিয়া মনে হয় না। কারণ তাহারা সকলে বেশি মনোযোগ দিয়া ওথেলো, হ্যামলেট থেকে শুরু করিয়া হ্যানি অবধি পড়িয়াছিলেন। তাই ওই কথা সেঁজুতি গাছেই শেষ হইয়া গিয়াছিলো। আজও এই সেঁজুতি গাছটিকে দেখিয়া অনুপমের একবারও মনে হইলো না, কেন তাহার ঠাকুর্দা’র মতো কম কথা বলা মানুষ সেদিন হঠ্যাৎ ওই মরু শহরে বসিয়া তাহাকে সেঁজুতির কথা বলিয়াছিলেন।

ইহার পরে অনুপমের লেবানিজ স্ত্রী’র ক্যাকটাস প্রীতি অনুপম অনেকটা নির্লিপ্তভাবে দেখিয়াছে। কপো‍র্রেট কাজের চাপে তাহার কোনদিন ক্যাকটাস প্রীতি জাগিবার কোন সুযোগ আসে নাই। আজো সেঁজুতি গাছটি তাহাকে দেখিলেও সে একবারও সেদিকে তাকাইলো না। বরং সে সামনের দিকে তাকাইয়া দেখিতে লাগিলো গাড়ি হইতে তাহার ব্যাগ লইবার জন্যে কেহ আগাইয়া আসে কিনা। তাহাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় যিনি এখনো এই ভিটের কিছুটা আগলাইয়া আছেন, তিন শহরে থাকিলেও লোকের ব্যবস্থা ঠিকই করিয়া রাখিয়াছিলেন। একজন মধ্য বয়সী লোক আগাইয়া আসিয়া তাহাকে নমস্কার করিলো, আরেকজন আদাব দিলো।

একজন জানাইলো, তাহার নাম প্রফুল্ল। সে সম্পর্কে অনুপমের মামা হয়, তবে সম্পর্কটি অনেক দুরের। তাহার বাবার দিক হইতে নহে। তাহার মায়ের দিক হইতে। তাহারা নাকি পুরুষানুক্রমে এই বাড়িতে বাস করিতেছে। যে আদাব দিলো, তাহার নাম আনিস। সে জানাইলো, বাবু যখন আসিয়াছেন তখন একবার তাহাদের বাড়িতে গেলে দেখিতে পাইবেন, তাহাদের কাছ হইতে বহু পুরুষ আগে তাহারা যে জঙ্গল পাইয়াছিলো সেখানে এখন কত বড় বাড়ি হইয়াছে। এবং তাহার সামনে দিয়া এখন পাঁকা রাস্তা।

রাস্তার বদলে কেন পাঁকা রাস্তা বলা হইলো তাহা অনুপমের খুব একটা মাথায় ঢুকিল না। আনিসের শুধু একটি কথা অনুপমের মাথায় ঢুকিলো, তাহার যে আত্মীয় বাড়ির এই অংশটুকু ধরিয়া রাখিয়াছেন তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই শহর হইতে পৌঁছাইবেন। একটু আগেই তাহাদেরকে মোবাইল ফোন করিয়া জানাইয়াছে। কিন্তু তাহার কথা শেষ হইবার আগে আবারও সেল ফোন বাজিয়া ওঠায় আনিস একটু ব্যস্ত হইয়া অনুপমের থেকে খানিকটা দূরে গিয়া দাঁড়াইলো।

অনুপম প্রফুল্লকে লক্ষ্য করিয়া ধীরে ধীরে একটি পুরানো বিল্ডিং এর বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলো। বারন্দাতে কয়েকটি কাঠের সোফা তবে তাহাতে কোনরূপ গদি নেই আর দুইটি বড় চেয়ার যেন অনেক দিন ধরিয়া কাহারো জন্যে অপেক্ষা করিতেছিলো। তবে সেটা অনুপমনের জন্যে এমন কথা বলিয়া শুধু শুধু একটি আবেগ এখানে সৃষ্টি করিবার কোন প্রয়োজন নাই। বরং সত্য হইলো, এই বাড়িতে আসিবার মতো লোকও এখন আর তেমন নাই।

প্রফল্ল তাহার কাধের গামছা দিয়া দ্রুত চেয়ার দুইটি এবং একটি সোফা’র ধুলা মুছিয়া দিলো।

গাড়িতে বসিয়া ও ঘুমাইয়া থাকিলেও অনুপমের কেমন যেন ক্লান্তি লাগিতেছিলো। তাহা ছাড়া কিছুটা অবসন্নও মনে হইতেছিলো নিজেকে। কারণ, কোথাও যেন কোন উৎসাহ বা আনন্দ সে খুঁজিয়া পাইতেছিলো না। তাই অনেকটা আলতো করিয়া নিজেকে চেয়ারেই সমর্পন করিলো।

প্রফুল্ল বেশ হাসিমুখে তাহাকে বলিল, মামা’র জন্যে কি দুধ চিনি দিয়া চা করিয়া আনিবে না লাল চা দিবে?

অনুপমের শরীরের রক্তে কোন বাড়তি চিনি নাই। তাই তাহার দুধ চা খাইতে কোন আপত্তি নাই, তবে কেন যেন সে বলিয়া বসিল, দরকার নেই অত কষ্ট করিবার। শুধু লাল চা হইলেই চলিবে।

প্রফুল্ল’র যে চায়ের জল গরম ছিলো তাহা বোঝা গেলো, দ্রুত চা আনিবার ফলে। চায়ের সঙ্গে  প্রফুল্ল তাহার নিজের হাতের করা কয়েকটি দুধের সরপিঠা একটি প্লেটে করিয়া তাহার সম্মুখে রাখিলো।

অনুপম চায়ে চুমুক দিতেই প্রফুল্ল তাহার আরো কাছে ঘনিষ্টভাবে আসিয়া বলিলো, বস্তুত এ বাড়িতে এই মাটি ছাড়া তাহার বাপ দাদাদের স্মৃতি বলিতে পশ্চিম পাশের পুকুরের কোনায় একটা বটগাছ আছে। তবে তাহার মালিক এখন ভিন্ন। ভদ্রলোকের নাম শিহাবউদ্দিন, তিনি সরকারের বড় একটি ব্যাংক হইতে ম্যানেজার  হিসাবে অবসর নিয়াছে। তাহার স্ত্রী শিরিন বানু কিছু দিন হইলো এডিশনাল সেক্রেটারি হিসাবে অবসর নিয়াছে। আর অবসর লইবার পরে তাহাদের বাড়ির ওই অংশ সংস্কার করাইয়াছে। এর আগে তাহারাও তেমন এখানে আসিতো না।

বাড়ি সংস্কারের সময় শিরিন বানু কী মনে করিয়া প্রফুল্লকে ডাকিয়া বলিয়াছিলো, এই বটগাছটির বয়স কতো হইবে?

প্রফুল্ল হাসিয়া উত্তর দিয়াছিলো, তাহা বলিবার যোগ্যতা তাহার নাই। তবে সে এইটুকু জানে বাবুদের বাড়ির স্মৃতি বলিতে এখন এই বটগাছটিই কেবল মাত্র আছে।

তাহার পরে বট গাছ ঘিরিয়া কিছু ভূত প্রেতের গল্প বলিবার জন্যে প্রফুল্ল একটু উদগ্রীব হইয়াছিলো। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা, হাজার হাজার মানুষ চালানো শিরিন বানু জানে, গ্রামের লোক একবার যদি ভূত, প্রেত, জিন এগুলো’র গল্প বলিবার সুযোগ পায় তাহা হইলে তাহাদের থামানো কষ্ট। তাই সে কৌশলে প্রফুল্লকে আর সেদিকে এগুতে দেয়নি। তাহার পরে তিনি তাহার স্বামীকে রাজি করাইয়া আর বট গাছটি কাটেনি।

প্রফুল্ল’র দেয়া চা খাওয়া শেষ করিয়া অনুপম তাহার দৃষ্টিটি শূন্যের দিকে মেলিয়া দিয়া কী যেন একটা নীরবতা খুঁজিতেছিলো, সেই সময়ে প্রফুল্ল আসিয়া তাহাকে বলিল, দিনের আলো উজ্জল থাকিতে থাকিতে সে কি বট গাছটি দেখিতে চায়?  সেখানে যাইতে হইলে বেশ কিছু ঘাস জঙ্গলের পথ পার হইতে হইবে। তবে বেশি নয়। শুধু পুকুর পাড় পার হইলেই যা ঘাস জঙ্গল।

অনুপম শুধু মাথা দুই দিকে নাড়িয়া না সূচক ঈংগিত করিয়া চেয়ার হইতে উঠিয়া আবার বাড়ির প্রাঙ্গনে নামিলো। গত কয়েকদিনের ঢাকা শহরের ভারি বাতাস হইতে এই প্রাঙ্গনের বাতাস তাহার কাছে বেশ হালকা মনে হইতেছিলো। পোটম্যাকের কুলের বাতাস যে ইহার থেকে আরো হালকা তাহা তাহার ওই সময়ে একবারও মনে আসিতেছিলো না। বরং অনুমপ কোথায় যেন একটা নিজের মধ্যে নিজেকে ডুবাইয়া লইয়া যাইতেছিলো। তাহা কি তাহার এই জীবনের শেষ প্রান্তের ক্ষণিক অবসরের কোন আনন্দ না অন্য কিছু তাহা বুঝিবার কোন চিহ্ন তাহার মুখের ওপর ছায়া ফেলেনি।

অনুপমের এই নীরবতা ছেদ কাটিয়া দিলো প্রফুল্ল ও আনিস। তাহারা বেশ হাসি মুখে ও খানিকট উঁচু স্বরে তাহাদের মেনু জানাইলো। আনিস মুরগির গোটা তিনেক পদ, কয়েকটি মাছের কথা বলিলো, প্রফুল্ল নিরামিষ  থেকে শুরু করিয়া রাজহাসের মাংস অবধি যখন বলিতে লাগিলো সে সময়ে অনুপম অনেকটা বিস্ময়ের সঙ্গে তাহাদের মুখের দিকে তাকাইলো।

অনুপমের বিস্মিত মুখ দেখিয়া, তাহারা কিছুটা থামিয়া গেলো। এবং কেমন যেন একটা গোলমেলে চিন্তার মধ্যে পড়িয়া গেলো।

এ সময়ে অনেকটা অপ্রাসাঙ্গিকভাবে প্রফুল্ল জানাইলো, এই সব্ আয়োজন কিছুই অনুপমের আত্মীয় করেনি, সবই আনিস তাহাদের বাড়ি হইতে লইয়া আসিয়াছে।

অনুপম কোন উত্তর না দিয়া মনে মনে ভাবিতে লাগিলো সে যে এখানে আসিবে, তাহা কাউকে না জানানোই মনে হয় উচিত ছিলো। নীরবে আসিয়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া চলিয়া যাইতে পারিত। নীরবতার বেশি এখানে তাহার আর কিছু বড় বলিয়া মনে হইতেছে না। তাহা ছাড়া তাহার আত্মীয় স্বজনরা ওয়াশিংটন, দিল্লি, প্যারিস, লন্ডন এমনকি কোলকাতা থেকেও- সে জীবনে প্রথমে বাংলাদেশে যাইতেছে শুনিয়া তাহাকে যেমন করিয়া এখানে আসিবার জন্য, দেখিবার জন্যে -তাহার মনের মধ্যে একটা উচ্ছাস কোন একটা চাপ যন্ত্রের সাহায্য প্রবেশ করাইবার চেষ্টা করিয়াছিলো- সেটা যে একেবারে একটা নিরর্থক তাহাও তাহার মনে হইতেছে।

অনুপমের যখন এমন্ মনে হইতেছিলো সেই সময়ে হঠ্যাৎ সে কিছুটা হাফ ছাড়িয়া বাঁচিবার সুযোগ পাইলো। তখনই আনিসের কাছে আবার একটি ফোন কল আসিল, যাহা শেষ হইবার পরে আনিস জানাইলো, অনুপমের আত্মীয় বিশেষ কাজে আজ শহরে আটকাইয়া গিয়াছেন। কাল খুব ভোরেই তিনি চলিয়া আসিবেন।

রাতের নীরবতা ও একাকিত্ব’র একটি কল্পনা যেন অনুপমকে মুহূর্তে কোন একটা স্বর্গ সুখ আনিয়া দিলো। তাহার মনে হইলো উচ্চাকাশে প্লেনের দীর্ঘ যাত্রায় সকলে ঘুমাইয়া পড়িলে অনুপম যেমন উইনডো দিয়া উর্ধ আকাশের অন্ধকার দেখিতে দেখিতে এক অসীম একাকিত্ব অনুভব করে- আজ রাতে হয়তো এ বাড়িতে সে তাহারও অধিক একাকিত্ব অনুভব করিতে পারিবে।

একাকিত্ব ছাড়া অনুপমের এই ভিটে দাঁড়িয়ে আর কিছু মনে হইলো না। এমন কি একবারের জন্যে তাহার কোন পূর্ব পুরুষের কথা তাহার মনে হইলো না। বরং একটা অদ্ভুত ছবি ধীরে ধীরে তাহার চোখের সামনে হইতে চলিয়া যাইতে লাগিল। সে ডাইনোসর থেকে শুরু করে মরু হরিণদের বিলুপ্তির একটির পর একটি দৃশ্য দেখিতে লাগিল।

নিজ কাজের জন্যে অনুপমকে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি মরু অঞ্চলেও যেমন যাইতে হইয়াছে তেমনি তাকে মধ্যপ্রাচ্যের মরু অঞ্চলে যাইতে হইয়াছে। আবার প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি দ্বীপে মাসের পর মাস কাটাইয়াছে। শুনিয়াছে এগুলো নাকি আগে দ্বীপ ছিলো না । ইহা সবই মূল ভূখন্ড’র সঙ্গে যুক্ত ছিলো। এখানে অনেক সবুজ অরণ্য ছিলো, যা ডাইনোসরদের খাদ্য হিসাবে শেষ হইয়া গিয়াছে।

অনুপম যখন ডাইনোসরের দৃশ্য দেখিতে ছিলো সেই সময়ে প্রফুল্ল আসিয়া তাহাকে বলিল, সেকি একবার এখন তাহার আত্মীয়র দখলে যে পুকুরটি আছে তাহার পাড়ে যাইবে না?

অনুপম মাথা নাড়িয়া, না সূচক উত্তর জানাইয়া দিলো। বরং নিজের মধ্যে এমন একটা ভাব করিল যে সে পথশ্রান্ত। দ্রুত খাইয়া শুইয়া পড়িবে। যাহা করিতে হয়, তাহার জন্য সামনে সময় আছে।

আগে হইলে অনুপমের আগমন হয়তো পাড়ায় রটিয়া যাইতো। এতক্ষণে বহু লোক তাহার সঙ্গে আলাপ করিতে আসিত। কিন্তু এখন এটা নামে গ্রাম হইলেও শহরতলী। সকলে স্কুটারে, বা অন্য কোন যান্ত্রিকযানে কাজের জন্যে নানান দিকে যায় আর কাজ শেষে নিজের ডেরায় ফিরিয়া আসে। তাহাদের অন্য কোন কিছুর খোঁজ লইবার সময় খুবই কম।

অনুপমের মনের মধ্যে অবশ্য একবারের জন্যেও জাগেনি, কেহ তাহাকে দেখিতে আসিবে। কারণ, তাহার কর্ম জীবনে কখনও সে দেখে নাই কেহ তাহাকে দেখিতে আসিয়াছে। সে কাজের জন্যে কাহারো কাছে গিয়াছে বা কেউ কাজের জন্যে তাহার কাছে আসিয়াছে। ইহার বাহিরে তাহার জীবনে অন্য কোন ঘটনা ঘটেনি।

ইহার ভেতর আবার প্রফুল্ল ও আনিস আসিয়া তাড়া দিল যে গ্রামের গাছপালার মধ্যে এখনই সন্ধ্যা নামিয়া আসিবে। তাই বাহিরে কোথাও যাইবার হইলে সে এখন যাইতে পারে।

অনুপম কোন তাড়া দেখাইলো না। বরং সে কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে আনিসের হাতের কয়েকটি মোমবাতি ও একটি হ্যারিকেন দেখিলো। হ্যারিকেনের সঙ্গে তার ছোট বেলায় দিল্লিতে বেশ পরিচিতি হইয়াছিলো। তাহাদের হাতে এ সামগ্রী দেখিয়া অনুপমের বুঝিতে কষ্ট হইলো না রাত্রে বিদ্যুৎ না থাকিবার সম্ভাবনাও আছে।

আর সত্য সত্য বারন্দায় একটা টেবিল লাগাইয়া যে সময়ে প্রফুল্ল ও আনিস অনুপমের খাবারের সাজাইতে যাইবে সে সময়ে বিদ্যুৎ চলিয়া গেল। আনিস করিত্কর্মা। তাই সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে মোমবাতি ও হ্যারিকেন জ্বলিয়া উঠিলো।

এতক্ষণে এ পাশে কিছু একটা ঘটিতেছে তাহা শিরিন ও তাহার স্বামীর নোটিসে আসিলো। তাহারা অনেকটা আশ্চর্য হইয়া দ্রুত মোবাইলের লাইট জ্বালাইয়া এপাশের দিকে আগাইয়া আসিলো।

উঠানে একটি জীপ। বারন্দায় টেবিল লাগাইয়া বেশ কয়েক পদের খাবার সাজোনা হইয়াছে -ইহা তাহাদের চোখে আগে পড়িলেও অনুপমের প্রতি তখনও তাহাদের  চোখ পড়ে নাই। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড যাইতেই তাহারা দেখিতে পায়, পাশের কাঠের সোফায় একজন ভদ্রলোক নীরবে তাহাদের লক্ষ্য করিতেছে।

শিরিন ও তাহার স্বামী আগাইয়া গিয়া নিজেদের পরিচয় দিয়া তাহার দিকে হাত মিলাইবার জন্যে হাত বাড়াইয়া দিলো। অনুপম দ্রুত হাত বাড়াইয়া দিয়া বলিল, সে অনুপম সেন। তাহাদের কয়েক পুরুষ এই পূর্ববঙ্গে থাকিলেও তাহার এই প্রথম আসা।

পদবী সেন শুনিয়া শিরিনের কেন যেন মনে হইলো, তা হইলে এটা যে সেন বাড়ি বলা হয় অনুপম কি তাহাদের কেউ। কিন্তু অনুপমের হাবভাবের মধ্যে তাহার কোন ঈংগিত মিলিল না।

তবে এই গ্রামে যদিও আজ ইহাকে শহরতলী বলা যায় সেখানে এমন একজন অতিথি এমন একটি পোড়ো বাড়িতে একাকি ডিনার করিবে ইহা শিরিনের কেন যেন ভালো লাগিলো না। সে অনেকটা ধমকের স্বরে প্রফুল্ল ও আনিসকে বলিলো, উনি আসিয়াছেন সেই বিকেলে অথচ কেন তাহারা তাহাকে জানায়নি।

সরকারের একজন প্রাক্তন এডিশনাল সেক্রেটারির গম্ভীর ধমকের উত্তর দিতে না পারিয়া আনিস ও প্রফুল্ল মাথা নীচু করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলো।

শিহাবউদ্দিন শুধু ব্যাংক কর্মকর্তা বলিয়া নন, এমনিতে তাহার মাথা একটু বেশি ঠান্ডা। সমাজে ভালো মানুষের মাঝেও যেমন কেউ কেউ বেশি ভালো মানুষ হইয়া থাকেন, শিহাবউদ্দিন তাহাদের দলে। তাহা ছাড়া সব সময়ই যে কোন কাজে অভিনব একটি আপোসের ফর্মুলা, যাহা অবশ্য শেষ অবধি আপোস না থাকিয়া সকলের জন্যে আনন্দময় হইয়া ওঠে- তেমনি ফর্মুলা কোথা হইতে যে শিহাবউদ্দিনের মাথায় আসে তাহা কেহই ভাবিয়া পায় না। আজো তাহার ব্যত্যয় ঘটিলো না।

তিনি প্রফুল্ল ও আনিসের ভয়ার্ত নীরবতা ও শিরিনের ক্ষুব্দ মনের মধ্যে হঠ্যাৎ করিয়া একটি পুস্প বৃষ্টি আনিয়া দিলেন। যেন ইহার আগে শিরিনের মনে কোন ক্রোধ জমিয়াছিলো তাহার বিন্দু বিসর্গ ধর্তব্যে’র মধ্যে না নিয়া শিহাবউদ্দিন বলিলেন, আমার মনে হয় ভালোই হইলো।

শিহাবউদ্দিন ভালোই হইলো বলিলে সকলে তাহার দিকেই চোখ ফিরাইল এবং দূরে জ্বলা মোমের বাতি ও হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় শিহাবউদ্দিনের মুখ ভালোভাবে দেখা না গেলেও তাহাতে যে কিছুটা হাসি মাখা ছিলো তাহা বুঝিতে কাহারো কষ্ট হইলো না। সেই হাসি মাখা মুখে তিনি বলিলেন, আচ্ছা শিরিন ভাবিয়া দেখো তো, এই বারান্দাটাতে কতকাল কোন টেবিল পড়েনি যেখানে আনন্দের সঙ্গে কোন লাঞ্চ বা ডিনার হইতে পারে। তাই টেবিল যখন এখানে পড়িয়াছে তখন আমরা কেন সেটাকে আরো আনন্দের বিষয় করিয়া তুলি না?

শিরিন একটু চমকাইয়া বলিল, তাহার মানে তুমি কী বলিতে চাহিতেছো?

শিহাব বলিলো তেমন কিছু নয়। এরা তো অনেক পদ রান্না করিয়াছে, তাহার সঙ্গে আমাদের রাতের জন্যে যে সাধারণ খাবার তৈরি হইয়াছে তাহা কেন আমরা এই টেবিলে নিয়া আসি না?

শিরিন যেন আরো একটু অবাক হইলো। এবং কিছুটা বিস্ময়ের সুরে বলিল, তাহার মানে?

শিহাবউদ্দিন হাসিয়া বলিলো, অনুপম সেনের সঙ্গে পরিচয় হইলো। উনি কে তাহাও আমরা বুঝিতে পারিয়াছি ইহার পরে তিনি কি একা এখানে ডিনার করিবেন? আর আজ তাহার ডিনারটি কি এখানেই করা উচিত নয়?

শিরিনের মাথা নীচু করিলো। তাহার পরে তাহার সব সময়ের মিষ্ট স্বরটি কন্ঠ হইতে বাহির হইলো- অতি মৃদু উচ্চারণে, প্রফুল্ল, আনিস  তোমারা শাহিদা ও জলিলকে বলো, আমাদের ঘরে যাহা রান্না হইয়াছে তাহাও এখানে আনিয়া এই টেবিলে গুছিয়ে ফেলুক।

অনুপম, শিহাবউদ্দিন ও শিরিন মোমের ও হ্যরিকেনের মৃদু আলোয় তাহাদের ডিনার শুরু করিলো। অনুপম মৃদু ভাষী, শিহাবউদ্দিনকেও এ বিষয়ে তাহার পিছে ফেলা যাইবে না। তাই ডিনারে বেশি কথা শিরিনই বলিলো।

শিরিনের কথার ভেতর দিয়া অনুপম জানিতে পারিলো, তাহারাও বছর খানেক হইলো এই বাড়িতে আসিয়াছে। তাহার বাবা এই জমি কিনিয়াছিলো কীভাবে সে সম্পর্কে শিরিনের কোন ধারণা নেই। তবে পড়াশুনা হইতে চাকুরি অবধি এখানে আসার খুব একটা সুযোগ শিরিন বা শিহাবের ঘটে নাই। তবে শিহাবউদ্দিন শিরিনের দুই বছর আগে রিটায়ার্ড করিয়া, ঢাকাতে শিরিনের সরকারি বাড়িতে থাকিত। গত বছর শিরিনের এল পি আর শেষ হইলে তাহারা একটু নিরিবিলি কাটাইবার জন্যে এখানে বাড়ি সংস্কার করিয়া, নতুন কিছু কাজ করাইয়া তবেই আসিয়াছে। এসবের পরে এখন মনে হইতেছে সবই ব্যর্থ হইতে যাইতেছে।

অনুপম খানিকটা বিষ্ময় মাখানো চোখে শিরিনের দিকে তাকাইলো। তবে খুব যে তাতে বিষ্ময় ছিলো এমন বলিলে ভুল হইবে। অনুপমের চোখ দেখিয়া শিরিন বুঝিলো, অনুপম আরেকটু সোজা ভাবে তাহার কথাগুলোর অর্থ  জানিতে চায়।

শিরিন হাসিয়া বলিলো, এখানে মানুষ সঙ্গী নেই। প্রাকৃতিক সঙ্গী আছে। তবে তাহার সহিত যেহেতু একস্টম নই তাই সেটা যে খুব ভালো লাগে তাহা নয়। তারপরেও নিরিবিলি কাটাইবো মনে করিয়াছিলাম।

বাদ সাধিয়াছে দুই মেয়ে। দুই মেয়েই অস্ট্রেলিয়াতে বাড়ি করিয়াছে। সেখানে সেটেলেড। দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নেই থাকে। ফাঁকা কোন শহরে নয়। এখন তাহারা বলিতেছে, বাবা ও মায়ের বয়স হইয়াছে। তাই তাহারা তাহাদেরকে কাছে রাখিতে চায়। প্রতিদিনই চাপ আসিতেছে। আর সে চাপ মানিয়া লওয়াও হইয়াছে। এখন পাট গুছাইতে যে বছর খানেক সময় সেটাই আর কি। তাহার পরে অস্ট্রেলিয়াই তাহাদের গন্তব্য।

শিহাব মৃদু গলায় বলিলো, মাঝে মাঝে যে আসিবো না তাহা তো আর নয়।

শিরিন মৃদৃ হাসিল। সে হাসি মলিন।

অনুপমের মুখের কোন পরিবর্তন হইলো না। মুখ হইতে কোন শব্দও বাহির হইলো না।

ইহার পরে তাহাদের গল্প গুজব আর খুব বেশি দূর এগোয়নি।

রাত গভীর হইবার আগেই শিরিন ও শিহাব চলিয়া যায়। যাইবার সময় শিরিন বার বার বলিয়া যায়, সকালের বেড টি লইয়া যেন অনুপম কোন চিন্তা না করে। শিরিন নিজ হাতে বানাইয়া লইয়া আসিবে।

শিরিন ও শিহাব চলিয়া যাইবার পরে অনুপম ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বুঝিতে পারিলো, বিছানায় অনেক কিছু নতুন যোগ করা হইয়াছে। হয়তো সে আসিবে বলিয়া এমনটিই ঘটিয়াছে। বিছানায় শরীর নামিয়ে দিতে দিতে অনুপম মনে করিয়াছিলো আজ রাতে তাহার ঘুম না আসিতেও পারে। বাস্তবে ঘটিলো তাহার উল্টো। কয়েক মিনিটের মধ্যে অনুপম ঘুমাইয়া পড়িল।

একটানা কয়েক ঘন্টা গভীর ঘুমের পরে অনুপমের যখন ঘুম ভাঙিলো তখন সে জানালা দিয়া তাকাইয়া দেখিলো পুব আকাশে বড় একটা তারা।

ওই তারার দিকে এক বার তাকাইয়া অনুপম মুখ নামাইয়া লইয়া  ধীরে ধীরে অন্য রুমে গিয়া নিচু স্বরে ড্রাইভাব হাসানকে ডাকিলো।

হাসান অনুপমের পিছু পিছু বাহির হইয়া আসিয়া ঘর হইতে তাহার ছোট লাগেজটি লইলো। তাহার পরে আকাশের তারাগুলো দ্রুত আকাশের গভীরে মিলাইয়া যাইতে লাগিলো- আর অনুপমের গাড়ি সামনের দিকে ছুটিয়া চলিলো।

 

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024