শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন

ইস্কান্দার মির্জা: পাকিস্তানের রাজনীতির এক খলনায়ক

  • Update Time : রবিবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৪, ৭.১৪ পিএম

সৈয়দ জিয়াউল হক

 

ইস্কান্দার মির্জা

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। এর এক বছরের মধ্যেই ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। এর পর থেকে শুরু হয় প্রাসাদ রাজনীতির খেলা। সামরিক বেসামরিক আমলা চক্রের ষড়যন্ত্রের ফলে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে আপামর বাঙ্গালী মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের জন্ম হয়। পাকিস্তানের এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির অন্যতম নাটের গুরু ছিলেন ইস্কান্দার মির্জা।

মীর জাফরের বংশধর ইসকান্দার মির্জার জন্ম ও মৃত্যু একই তারিখে। ১৮৯৯ সালের ১৩ নভেম্বর মুর্শীদাবাদে তার জন্ম। তাঁর পুরো নাম সাহেবজাদা সাইয়ীদ ইস্কান্দার আলী মির্জা। তাঁর পিতার নাম ছিল ফতেহ আলী মির্জা। ইস্কান্দার মির্জাদের পরিবার ছিল অত্যন্ত ধনী এবং সামাজিকভাবে প্রতিপত্তিশালী। তৎকালীন বৃটিশ সরকারের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ইস্কান্দার মির্জা ছোটবেলায় বোম্বে শহরে বড় হন এবং সেখানে স্কুল ও কলেজ জীবন অতিবাহিত করেন। এরপর তিনি স্যান্ডহার্স্টে রয়েল মিলিটারী একাডেমীতে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন স্যান্ডহার্স্টের প্রথম ভারতীয় গ্রাজুয়েট। ১৯২০ সালের ১৬ জুলাই তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত হন। ১৯২৬ সালে তিনি Indian Political Service ঝবৎারপব -এ যোগদান করেন। এরপর তিনি ১৯২৭ সালের ১৭ অক্টোবর সেনাবহিনীতে ক্যাপ্টেন পদে যোগদান করেন। তিনি ১৯৩৮ সালে ১৬ জুলাই মেজর এবং ১৯৪৬ সালের ১৬ জুলাই লে: কর্ণেল পদে পদোন্নতি পান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় ইস্কান্দার মির্জা ছিলেন অবিভক্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত গুটিকয়েক আফিসারদের অন্যতম।

প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে বৃটিশ সরকার তাঁকে দেশরক্ষা বিভাগের যুগ্ম-সচিব নিযুক্ত করেন। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী এই দুই ভাগে বিভক্ত করার জন্য গঠিত কমিটিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এসময়ে তিনি লিয়াকত আলী খানের সান্নিধ্যে আসেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তাঁকে পাকিস্তানের প্রথম দেশরক্ষা সচিব নিয়োগ করেন। ১৯৪৭ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে ১৯৫৪ সালের ৬ মে পর্যন্ত তিনি ঐ পদে নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৫০ সালে তাকে লে: কর্ণেল থেকে সরাসরি মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয় যার নজির সেনাবাহিনীতে আর নেই। লিয়াকত আলী খানের বক্তিগত ইচ্ছায়ই এটি হয়েছিল। দেশরক্ষা সচিব হিসেবে তাঁর পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের স্থলবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌ বাহিনীতে কর্মরত বৃটিশ সেনাদের প্রেষণ বাতিল করেন এবং ঐসকল পদে পাকিস্তানীদের নিয়োগ দেন। এসময়ে ইফতেখার খান, আকবর খান, মোহাম্মদ ইসফাকুল মজিদ, এন এ এম রেজা এবং মোহাম্মদ আইয়ুব খান এই পাঁচজনকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এদের মধ্যে একমাত্র আসামে জন্মগ্রহণকারী ইসফাকুল মজিদ বাংলা জানতেন। তিনিই ছিলেন পাকিস্তান সেনাবহিনীতে প্রথম বাংলা জানা মেজর জেনারেল। তাঁর পিতা আবদুল মজিদ ছিলেন আসামের প্রথম আই সি এস অফিসার। মেজর জেনারেল ইফতিখার খান ছিলেন পাকিস্তানের সবচেয়ে সিনিয়র কর্মকর্তা। কিন্তু তিনি এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। ইস্কান্দার মির্জার ক্রমাগত সুপারিশে লিয়াকত আলী খান আকবর খান, মোহাম্মদ ইসফাকুল মজিদ, এন এ এম রেজা এই তিনজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে অন্যায়ভাবে ডিঙ্গিয়ে আইয়ুব খানকে ১৯৫১ সালের ১৭ জানুয়ারী সেনাবাহিনীর প্রধান পদে নিয়োগদান করেন। আইয়ুব ছিলেন পাকিস্তানের তৃতীয় সেনাপ্রধান এবং প্রথম পাকিস্তানী নাগরিক সেনাপ্রধান। তাঁর পূর্বে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান পদে যারা নিয়োজিত ছিলেন তারা হলেন স্যার ফ্রাংক ওয়ালটার মেসেরভি এবং জেনারেল স্যার ডগলাস ডেভিড গ্রেসি। পরবর্তীতে শুধুমাত্র ইস্কান্দার মির্জার ইচ্ছায়ই সেনাবাহিনী প্রধান পদে দুই দুইবার আইয়ুবের নিয়োগকাল বৃদ্ধি করা হয়। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস এই আইয়ুবই মাত্র ৭ বছর পর ইস্কান্দার মির্জাকে শুধু ক্ষমতা থেকে নয়, দেশ থেকে বিতাড়ণ করেছিলেন।

১৯৫৪ সালের ১ জুন ইস্কান্দার মির্জা পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হন। তখন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নূরুল আমীন। গভর্নর হয়েই তিনি পূর্ব বাংলায় শান্তি স্থাপনের জন্য যে কোন প্রকার বল প্রয়োগের ঘোষণা দেন। ঢাকা বিমান বন্দরে নেমেই ইস্কান্দার মির্জা মওলানা ভাসানীকে গুলী করে মারার হুমকি দেন এবং নাম উল্লেখ করে শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া)-কে এক ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার করার হুকুম দেন। সেই সঙ্গে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ৩২০ জন লোককে গ্রেফতার করার জন্য বিমান বন্দরে উপস্থিত পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেন। রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী ছাড়াও রাস্তা থেকে নিরীহ লোকজনকে, আরোহীসহ রিক্সা চালক-কে এমনকি কয়েকজন বর যাত্রীকেও গ্রেফতার করে ৩২০ জনের কোটা পূরণ করা হয়।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার জাফরুল্লা খান, অর্থমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলী এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান সরকারী সফরে আমেরিকা যান। ইস্কান্দার মির্জা তখন চিকিৎসার জন্য লন্ডন অবস্থান করছিলেন। ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের গণপরিষদ গভর্নর জেনারেল অনেক ক্ষমতা খর্ব করে এক বিল পাশ করে। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ এতে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে পাঠান। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী তাঁর সফরসঙ্গীদের সহ পাকিস্তানের পথে লন্ডনে ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন। সেখানে শলা পরামর্শের পর সকলে একটি বিশেষ বিমানে করাচী ফিরে আসেন এবং বিমান বন্দর থেকে সরাসরি গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের সঙ্গে দেখা করেন। গভর্নর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন মন্ত্রীসভা গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়। ইস্কান্দার মির্জাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে অর্থমন্ত্রী করা ছাড়াও জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানকে সেনাবাহিনী প্রধানের পাশাপাশি দেশরক্ষা মন্ত্রী করা হয়। এটি ছিল সরাসরি রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতার প্রথম উদাহরণ। নতুন মন্ত্রীসভায় কয়েকজন আমলা ও প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তাও অন্তর্ভুক্ত হন। ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৪ সালের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে এবং ১৯৫৪ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ১৯৫৫ সালের ৭ আগষ্ট পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োজিত ছিলেন। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের অন্যতম প্রিয়পাত্র ছিলেন মির্জা। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট প্রবর্তনের অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন। ১৯৫৫ সালের ৭ আগষ্ট গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর সাময়িক অনুপস্থিতিতে ইস্কান্দার মির্জাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। সে সময় গোলাম মোহাম্মদ গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট গভর্নর জেনারেল কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ অনুমোদন করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেয়। সে অনুযায়ী ১৯৫৫ সালের জুন মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইস্কান্দার মির্জা নির্বাচনে নতুন সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু আইয়ুব খান মন্ত্রীসভা ত্যাগ করে সামরিক বাহিনীতে ফেরৎ যান। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের শারিরীক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হতে থাকে। আগষ্ট মাসের ৪ তারিখ মন্ত্রীসভার বৈঠকে ইস্কান্দার মির্জাকে ভারপ্রাপ্ত গভর্নর জেনারেল পদে নিয়োগ করা হয়। মির্জা বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে পদত্যাগে বাধ্য করেন এবং তিনি পনুরায় আমেরিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত পদে যোগদান করেন। চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়।

ইস্কান্দার মির্জা ৬ অক্টোবর (১৯৫৫) গোলাম মোহাম্মদকে অপসারণ করে গভর্নর জেনারেলের পদ দখল করেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে প্রথম শাসনতন্ত্র জারী হয়। এর আওতায় ইস্কান্দার মির্জা ২৩ মার্চ (১৯৫৬) পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শখথ গ্রহণ করেন। পাকিস্তানের গণপরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে এই পদে অধিষ্ঠিত করে। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী পাকিস্তানে পার্লামেন্টারী পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। দেশের নির্বাহী সকল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত হয়। ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ইস্কান্দার মির্জা মুসলীম লীগের একাংশকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন রিপাবলিকান পার্টি। পশ্চিম পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ডা. খান সাহেব নবগঠিত দলের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন সংসদ নেতা নির্বাচিত হন। নবাব মোজাফফর আলী খান কিজিলবাস, ফজল এলাহী চৌধুরী (পরবর্তিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট), সৈয়দ আমজাদ আলী, সরদার আবদুল হামিদ খান, সরদার আমীর আজম খান, চৌধুরী আবদুল গনি, সরদার আবদুর রশীদ খান, নওয়াব আকবর খান বুগতি প্রমুখ প্রভাবশালী রাজনীতিবিদগণ নবগঠিত রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন। রিপাবলিকান পার্টির পিছনে ছিল পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের একটি শক্তিশালী গ্রুপ। শুরু থেকেই মুসলীম লীগের সাথে রিপাবলিকান পার্টির দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। এরই জের ধরে কেন্দ্রে মুসলীম লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর চৌধুরী মোহাম্মদ আলী পদত্যাগ করেন। কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে রিপাবলিকান পার্টি ও আওয়ামী লীগের কোয়ালিশন সরকার। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার সাথে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দেয়। কারণ ইস্কান্দার মির্জার রক্তে গণতান্ত্রিক চেতনা এবং রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এমনকি সৌজন্যবোধও ছিল না। এক পর্যায়ে ইস্কান্দার মির্জা সোহরাওয়ার্দীকে পদত্যাগ করতে বলেন। জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোট আহ্বানের জন্য সোহরাওয়ার্দীর অনুরোধও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এমতাবস্থায় সোহরাওয়ার্দী ১৭ অক্টোবর (১৯৫৭) সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং আই আই চুন্দ্রীগড় প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ছিলেন গুজরাটের অধিবাসী। তাঁর পুরো নাম ছিল ইব্রাহীম ইসমাইল চুন্দ্রীগড়। তাঁর সরকার ছিল মুসলীম লীগ, রিপাবলিকান পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলামী এই চারটি দলের কোয়ালিশন সরকার। চুন্দ্রীগড় শাসনতন্ত্র সংশোধন করে প্রথম নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। রিপাবলিকান পার্টি এবং পূর্ব পাকিস্তানের সদস্যগণ এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে। ফলশ্রুতিতে মাত্র দুই মাসের মাথায় চুন্দ্রীগড়কে পদত্যাগ করতে হয়। ১৬ ডিসেম্বর (১৯৫৭) ফিরোজ খান নুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বচিত হন এবং ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারী পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

আইয়ুব খান

প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা এবং সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খানের মধ্যে একটি বিষয়ে দারুণ মিল ছিল। তাঁরা দু’জনেই ছিলেন পার্লামেন্টারী পদ্ধতির ঘোর বিরোধী। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র বাতিল করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করে দেশে সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করা ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। তবে আইয়ুব ছিলেন সুচতুর লোক। তিনি শাসনতন্ত্র বাতিল এবং সামরিক শাসন জারীর মত গণবিরোধী কাজের দায়-দায়িত্ব সরাসরি নিতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ইস্কান্দার মির্জাকে দিয়ে এ ধরনের অপ্রিয় কাজগুলো করাতে। ইস্কান্দার মির্জাও আইয়ুবের ফাঁদে পা দেন। তিনি ৭ অক্টোবর (১৯৫৮) শাসনতন্ত্র বাতিল করে সারাদেশে সামরিক শাসন জারী করেন। ফিরোজ খান নুনের মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করা হয়। জেনারেল আইয়ুবকে প্রধান সামরিক প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। এবার শুরু হয় আইয়ুবের খেলা। সামরিক শাসনে প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাহীন পুতুল মাত্র। সকল ক্ষমতার উৎস প্রধান সামরিক আইন প্রসাশক। আইয়ুব বুঝতে পারেন যে ক্ষমতা এখন তাঁর হাতের নাগালে। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে লিপ্ত হন। মির্জা আইয়ুবের অনুগত তিনজন কর্মকর্তা জেনারেল ইয়াহিয়া, জেনারেল শের বাহাদুর ও জেনারেল হামিদকে বরখাস্ত ও গ্রেফতার করে পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার এই ইচ্ছা গোপন থাকেনি। সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান আইয়ুবকে ইস্কান্দার মির্জার এই চক্রান্তের কথা জানিয়ে দেন। কারণ গোয়েন্দা বিভাগের আনুগত্য তখন আর ইস্কান্দার মির্জার প্রতি নয়, আইয়ুব খানের প্রতি। যে আইয়ুব উঠতে বসতে ইস্কান্দার মির্জাকে তোয়াজ করে চলতেন তিনি এবার তাঁকে আগুন নিয়ে না খেলতে হুঁশিয়ার করে দেন।

পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লে: জেনারেল বার্কী, লে: জেনারেল আজম খান এবং লে: জেনারেল কে এম শেখ এই তিনজন উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা রাত ১০ টার সময়ে আইয়ুব খানের বাসা থেকে সশস্ত্র অবস্থায় ইস্কান্দার মির্জার বাসভবনে যান এবং তাঁকে ঘুম থেকে তুলে বন্দুকের নলের মুখে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। পূর্বেই প্রস্তুত করা পদত্যাগপত্রটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হল: ১

President Iskander Mirza’s Declaration

Three weeks ago, I imposed Martial Law in Pakistan and appointed General Mohd Ayub Khan as Supreme Commander of the Armed Forces and as Chief Martial Law Administrator. By the grace of God this measure which I had adopted in the interest of our beloved country has been extremely well received by our people and by our friends and well wishers abroad.

Since the imposition of Martial Law I have done my best to assist General Ayub Khan and his administration in the difficult task of arresting further deterioration and bringing order out of chaos.

In our efforts to evolve an effective structure for future administration of this country and based on our experience of the last three weeks, I have come to the conclusion that:

ফাতেমা জিন্নাহ

(a) Any semblance of dual control is likely to hamper the effective performance of this immense task which is of an emergent nature.

An unfortunate impression exists in the minds of a great many people both at home and abroad that General Ayub and I may not always act in unison. Such an impression, I cannot help feeling, if allowed to continue, would be most damaging to our cause. I have, therefore, decided to step aside and hand over all powers to General Ayub Khan.

I wish General Ayub Khan and his colleagues the best of luck.

PAKISTAN PAINDABAD

President of Pakistan

KARACHI

27th October 1958

বেগম ইস্কান্দার মির্জাকে দ্রুত লাগেজ গুছিয়ে নিতে বলা হয়। ছয়টি লাগেজসহ প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে পিআই-এর একটি বিশেষ বিমানে করাচী থেকে কোয়েটা পাঠিয়ে দেয়া হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদুত ল্যাংলি এবং অষ্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনার ক্যাথর্ন এই দু’জনকে শুধু করাচী বিমান বন্দরে মির্জাকে বিদায় জানাতে অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু ক্যাথর্ন সময়মত বিমান বন্দরে উপস্থিত হতে পারেননি। নভেম্বরের ২ তারিখ রাতে ইস্কান্দার মির্জা ও তাঁর স্ত্রী-কে পুনরায় করাচী এনে কে এল এম-এর একটি বিমানে লন্ডন পাঠিয়ে দেয়া হয়। এবারে মির্জাকে বিদায় জানাতে ক্যাথর্র্ন বিমান বন্দরে উপস্থিত ছিলেন। ক্যাথর্ন ছিলেন ইস্কান্দার মির্জার পূর্ব পরিচিত। কোয়েটায় অবস্থানকালে মির্জার সাথে যাতে সম্মানজনক আচরণ করা হয় সেজন্য ক্যাথর্ন আইয়ুবকে অনুরোধ করেছিলেন। তা তত্ত্বেও জেনারেল শের বাহাদুর ইস্কান্দার মির্জা ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। কোয়েটায় চার দিন অবস্থানকালে তাঁদেরকে কড়া সামরিক প্রহরায় রাখা হয়। সৈনিকদের ব্যবহারও শোভনীয় ছিল না। তবে জেনারেল আজম খান, জেনারেল বার্কী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ইরান সরকারের চাপের কারণে সরকার ইস্কান্দার মির্জাকে নিরাপদে বিদেশে প্রেরণ করে। ইস্কান্দার মির্জা ও নাহিদ মির্জাকে বহনকারী লন্ডনগামী বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চার ঘন্টা দেরীতে রওয়ানা হয়। এই চার ঘন্টা জেনারেল শের বাহাদুর ও ইস্কান্দার মির্জার প্রাক্তন সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার নওয়াজেশ মির্জা ও তাঁর স্ত্রী-র সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। ৩ নভেম্বর (১৯৫৮) এক মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়ঃ Iskander Mirza, recently deposed Pakistan President and Begum Mirza departed from Karachi for London 10 p.m. November 2 via KLM flight 864…. Mirzas had access to nothing after notification [of his ouster]. They were denied privilege of telephoning even their relatives, could write no messages and were not allowed to lock their own bags. In Quetta they were kept prisoners in government house. They were not allowed to see anyone…. Baggage they took with them to London had been packed by the Ispahanis. The Mirzas paid for their own transportation. They were made to pay ten rupees each for their passports. They were harassed by being told frequently during their stay at Quetta to pack their spare belongings to be ready to leave, only to be told subsequently there had been a mistake.

আবুল মনসুর

Cawthorn personally escorted the Mirzas aboard their plane. No high placed army personnel or officer of the new regime saw them during their stop over in Karachi. A Brigadier was in charge of their army custodians while they were in Karachi. করাচী থেকে মির্জা দম্পত্তির কোয়েটা যাত্রাকালে বিমান বন্দরে অন্যান্য উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর ÔGenerals in Politics: 1958-62’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন- He [Ayub] then called a meeting of the ambassadors of foreign countries and members of his cabinet. It was about 11.30 pm. when everyone had assembled and Ayub Khan told them of the action that he had taken and explained briefly the reasons that necessitated his doing so. There was no reaction from any of them except the United States Ambassador and the High Commissioner for Australia, Major General Cawthorn. The US Ambassador reacted sharply to the news and asked Ayub Khan some pointed questions about the action that he had taken and the safety of Iskander Mirza. He enquired about the plans he had for the former President and wanted to know how he would be treated. Ayub Khan appeared upset at the manner in which the United States Ambassador had spoken and said that Iskander Mirza would be treated well and was being sent to Quetta early next morning where he would stay for a few days. Cawthorn, who had served in the British Indian Army and later the Pakistan Army was a personal friend of Iskander Mirza and he too expressed anxiety about his safety.3

সম্পূর্ণ কপর্দকহীন অবস্থায় মির্জা দম্পত্তিকে পাকিস্তান থেকে বিতাড়ণ করা হয়। বিমান বন্দরে পোর্টারদের বখশীশ দেবার মত অর্থও তাঁদের কাছে ছিল না। লন্ডনে প্রথমে তাঁরা হাইড পার্ক হোটেলে উঠেন। ইস্পাহানীর সাহায্যে লন্ডনে তাঁদের হোটেল বিল পরিশোধ করতে হয়। পরে তাঁরা পশ্চিম দক্ষিণ লন্ডনের কেনসিংটনে একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন।

ইস্কান্দার মির্জা এবং আইয়ূব খান সকল গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী কাজে ছিলেন একাট্টা। সুতরাং তাঁর পরিণতির জন্য নিজেকে দোষারোপ করা ছাড়া মির্জার কোন গত্যন্তর ছিল না। ক্ষমতা থেকে বিতাড়নের দুই সপ্তাহ পরে ৯ নভেম্বর (১৯৫৮) পুত্র হুমায়ুন মির্জার কাছে লেখা পত্রে মির্জা উল্লেখ করেনঃ I trusted the Army and the military honour of General Ayub. This was an error of judgement, and people who get on top and misjudge as I did have no right to complain and deserve what they get. This is the end of an episode as far as I am concerned. Individuals don’t count: it is the country which matters. Pakistan, as you know is in serious economic difficulties. I had long talks with that esteemable gentleman and financial expert, Mr. Black when he was in Pakistan. If you have any influence please request him from me to help Pakistan as he intended to do.

My plans are not 100% certain. I think I will settle down in London. I must try and get a job to supplement my pension in order to have modest comfort. I am trying but it is not easy.4

ইস্কান্দার মির্জার পুত্র হুমায়ুন মির্জা তাঁর `From Palassy to Pakistan. The Family History of Iskander Mirza – The First President of Pakistan’ MÖ‡š’ D‡jøL K‡ib, ÒDuring the early days of Pakistan, Major General Sir Walter Cawthorn was Iskander Mirza’s Deputy Chief of Staff at the Defence Ministry. His wisdom and good judgement were invaluable in building Pakistan’s armed forces. During the Second World War, he had been head of military intelligence in the Middle East before coming to Pakistan. After he left Pakistan’s service, he joined the Australian Diplomatic Service returning as Australia’s High Commissioner. Both he and US Ambassador Langley made repeated calls on Ayub and maintained pressure on him to ensure that no physical harm came to Iskander Mirza. Without their efforts, it is quite possible that the Generals would have arranged a convenient accident to kill the unfortunate President.”৫

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

সামরিক বাহিনীর মধ্যে যারা ইস্কান্দার মির্জার অনুগত ছিলেন, যাদেরকে নিয়ে তিনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করেছেন বছরের পর বছর তারা কেউই তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেননি। রাজনীতিবিদদের মধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন মির্জার অত্যন্ত কাছের মানুষ। ভুট্টের পিতা স্যার শাহনেওয়াজ ভুট্টো ছিলেন ইস্কান্দার মির্জার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মির্জা মাঝে মাঝেই পাখী শিকার করার জন্য শাহনেওয়াজ ভুট্টোর লারকানার বাসভবনে বেড়াতে যেতেন। ভুট্টোর চালচলন ও বুদ্ধিমত্তা দেখে মির্জা মুগ্ধ হন। ১৯৫৭ সালে একটি প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে মির্জা ভুট্টোকে জাতিসংঘ পাঠান। সেখানে ভুট্টো জাতিসংঘ সাধারন পরিষদে বক্তৃতা করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯ বছর। প্রতিনিধিদলে ভুট্টোর অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের মহাসচিব চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর আপত্তিও মির্জা উপেক্ষা করেন। জেনেভা থেকে ইস্কান্দার মির্জার কাছে প্রেরিত এক পত্রে ভুট্টো উল্লেখ করেছিলেন যে যখন পাকিস্তানের ইতিহাস লেখা হবে তখন মির্জার নাম জিন্নাহরও আগে লেখা থাকবে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক আইন জারীর পর মির্জা তাঁকে পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রী নিয়োগ করেন। এহেন ভুট্টো ইস্কান্দার মির্জার ক্ষমতাচ্যুতির পর আইয়ুব খানের মন্ত্রী সভায়ও নিজের স্থান করে নেন এবং শীঘ্রই আইয়ুবের বিশ্বস্ত সহচরে পরিণত হন। এজন্যই বলা হয়, There is no permanent friend or enemy in politics, only there is permanent interest.

ইস্কান্দার মির্জা ১৯২২ সালের ২৪ নভেম্বর প্রথমবার বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল রিফাত বেগম। তাঁদের দুই ছেলে এবং চার কন্যা ছিল। ইস্কান্দার মির্জার বড় ছেলের নাম হুমায়ুন মির্জা। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র আনওয়ার মির্জা ১৯৫৩ সালের ৪ জুন এক বিমান দূর্ঘটনায় মারা যান। ১৯৫৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইস্কান্দার মির্জা নাহিদ আমীর তৈমুর-কে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করেন। মির্জার এই দ্বিতীয় বিবাহের সময়ে তাঁর প্রথম স্ত্রী রিফাত বেগম একটি প্রতিনিধিদলেন সদস্য হিসেবে চীন সফরে ছিলেন। নাহিদ ছিলেন একজন ইরানী এবং তাঁর প্রথম স্বামী লে: কর্ণেল আফগামী ছিলেন পাকিস্তানে ইরান দূতাবাসের মিলিটারী এটাচি। ইস্কান্দার মীর্জা সে সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। আফগামী ১৯৫২ সালে ইরান ফিরে গেলে নাহিদের সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে এবং ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাহিদ ইস্কান্দার মীর্জার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নাহিদ মির্জা অত্যন্ত বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ ছিলেন। পাকিস্তানী রাজনীতির গতিধারা তিনি বুঝতে পারতেন। তিনি ইস্কান্দার মির্জা কর্তৃক ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারী করার বিপক্ষে ছিলেন। নাহিদ মির্জা আইয়ুব খানকে বিশ্বাস করতেন না এবং সন্দেহের চোখে দেখতেন। আইয়ুবের সঙ্গে ইস্কান্দার মির্জার সখ্যতা ও দহরম মহরম তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। এমনকি তিনি আইয়ুব খানকে বরখাস্ত করার জন্যও ইস্কান্দার মির্জাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। মির্জা এতে কর্ণপাত করেননি। কারণ আইয়ুব ছিলেন মির্জার সকল গণবিরোধী কাজের প্রধান সহযোগী।

ইস্কান্দার মির্জা ছিলেন আপাদমস্তক রাজনীতি বিরোধী মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন দেশের সকল দুর্দশার মূলে রাজনীতিবিদগণ যারা নিজেদের স্বার্থে দেশকে বিক্রি করতে পারেন। রাজনীতিবিদদের অনৈক্য ও স্বার্থপরতার সুযোগে তিনি তাদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। তিনি চার বছর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই সময়ে চারজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়। রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর নাক গলানো শুরু হয় ইস্কান্দার মির্জার হাত ধরেই। তিনি মনে করতেন পাকিস্তানের মত স্বল্প সাক্ষরতার দেশের জনগণ গণতন্ত্রের উপযুক্ত নয়। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল `Democracy without education is autocracy without limitation’|

তবে ইস্কান্দার মির্জা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি। তিনি ধর্মকে রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে দূরে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। ধর্মীয় মৌলবাদীদের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী ছিল কঠোর। স্বরাষ্ট্র সচিব থাকাকালে মির্জা ধর্মীয় মৌলবাদীদের সম্পর্কে তাঁর মত ব্যক্ত করে ১৯৫৩ সালের ২৬ ফ্রেব্রুয়ারী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের কাছে একটি পত্র লেখেন। পত্রে তিনি আহমদিয়া মতবাদের অনুসারী হওয়ার কারণে পাকিস্তানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার জাফরুল্লাহ খানের প্রতি আচরণের বিষয়ও উল্লেখ করেন। পত্রে তিনি উল্লেখ করেন- The problems created by your personal enemies including the Mullahs, if not dealt with firmly and now, will destroy the administration and the country. Lately I have been sending my own intelligence men to meetings, etc. in Karachi-the abuses hurled on you and the government are of such a violent and offensive nature that the prestige of the Government in Karachi to-day is at its lowest ebb. What the feeling is in the capital to-day will be the feeling in the whole country tomorrow. Such a thing as loyalty and teamwork does not exist in your Government, both in the Centre and in the Provinces. By want of action and Government directive, encouragement is being given to all disloyal elements and selfish and dishonest careerists.

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

Though I am not a very religious man, I have the greatest respect for your religious beliefs and realize your hesitation and dislike for vigorous action against those persons who are working against you in the garb of religion. But is it religion to destroy the very foundation of the administration of the premier Muslim state? In Cairo, Sir Zafrullah Khan is being received with the utmost honour and respect. He is also meeting the heads of all the Arab countries where he has a very high reputation. Whereas in Karachi he is being abused in public meetings and his photographs are being spat upon. Last night he has been cartooned with a Donkey’s body. Can anybody say all this is not being reported to all foreign Capitals? What then is the position of Pakistan today internationally? – and you can imagine the disgust created by all this.6 এ প্রসঙ্গে হুমায়ুন মির্জা উল্লেখ করেছেন, Iskander mirza was a bitter foe of Islamic fundamentalism. During Nazimuddin’s premiership, when fundamentalism was at its peak, he took decisive action against the mullahs. He firmly believed that if the mullahs were given a free hand, Pakistan would slide into anarchy. In fact, he made his entry into the political arena on this platform. Even in East Pakistan where Islamic fundamentalism overshadowed communism imported from Calcutta, Iskander Mirza was cautious about using religion to counter the communist threat. Though this was a tempting option, he refrained from using it lest he enhanced the mullahs credibility. Strictly speaking, there are no mullahs in Islam; thus, there is no religious basis for their claim that, under an Islamic constitution, they must be given a hand in running the affairs of state.7

ইস্কান্দার মির্জার শেষ জীবন অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে কাটে। ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর লন্ডনে তিনি একটি ছোটখাট হোটেল ব্যবসা শুরু করেন যা দিয়ে তেমন আয় হত না। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি বছরে ৩০০০ পাউন্ড পেনশন পেতেন। বলা যায় এটিই ছিল তাঁর একমাত্র নিয়মিত আয়। এই সামান্য পেনশন দিয়ে লন্ডনে জীবন নির্বাহ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। ইস্পাহানী, ইরানের শাহ রেজা পাহলবী, লর্ড ইঞ্চকেপ, লর্ড হিউম এবং ইউরোপের কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানের বদান্যতায় তাঁকে লন্ডনে প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে হয়। শেষ জীবনে ইস্কান্দার মির্জা কতটা করুণ অবস্থায় পতিত হয়েছিলেন তার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় হুমায়ুন মির্জার লেখায়।

গাফফার খান

তিনি লিখেছেন- During a cabinet meeting chaired by Ayub, an aide brought the news that the former President had been admitted to a London hospital after a heart attack. Ayub turned to his Finance Minister, Shoaib, and ordered him to send £500 to help Iskander Mirza with his expenses. When Shoaib, with his characteristic clerical mentality, responded that he would send the money as soon as the family came up with an equivalent amount in rupees, Ayub, flushed with anger barked, “You send the money forthwith and do not trouble the family.” While in the hospital in London, the Iranian Ambassador Ardeshir Zahedi visited Iskander Mirza frequently. On one such occasion, as he approached his room, he overheard the former President tell Nahid, “We cannot afford medical treatment, so just let me die.” The Ambassador was so overcome with emotion, that he turned away without visiting his friend. On another occasion, when Lord Hume, then Foreign Secretary, saw Iskander Mirza walking down Brompton Road with a laundry bag in his hand, he stopped his car and offered him a lift, because the former President of Pakistan could not afford the taxi fare.8

ইস্কান্দার মির্জা ১৯৬৯ সালের ১৩ নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া মির্জাকে পাকিস্তানের মাটিতে দাফন করার অনুমতি দিতেও অস্বীকার করেন। অবশেষে ইরানের শাহের ব্যক্তিগত বিমানে তাঁর লাশ লন্ডন থেকে ইরানে নিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে ইস্কান্দার মির্জার মরদেহের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা হয়। তেহরানের রাজপথ দিয়ে তাঁর কফিন সমাধিস্থলে নেয়ার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরদেশির জাহেদীর নেতৃত্বে মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ এবং বিদেশী কূটনীতিকগণ শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। শোভাযাত্রায় মির্জার স্ত্রী নাহিদ মির্জা এবং পুত্র হুমায়ূন মির্জাও ছিলেন। মির্জার প্রথম স্ত্রী রিফাত বেগম এর দুই বছর পূর্বেই ওয়াশিংটনে ইন্তেকাল করেন। ইরানে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত শাহনেওয়াজ খান নিজের চাকুরীর ঝুঁকি নিয়েও শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ইস্কান্দার মির্জার ব্যক্তিগত বন্ধু। এর আগে মির্জার আত্মীয় স্বজনকে বহন করার জন্য ইরানের শাহের পক্ষ থেকে একটি বিমান করাচী পাঠানো হয়। মির্জার বেশ কয়েকজন আত্মীয় করাচী বিমান বন্দরে পৌঁছালেও ইয়াহিয়া সরকারের অনুমতি না পাওয়ার কারণে বিমানটি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তেহরানে ফেরৎ আসেশুধু তাই নয় তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য পাকিস্তানে অবস্থানরত ইস্কান্দার মির্জার আত্মীয়-স্বজনদের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়। ইস্কান্দার মির্জার মৃত্যুর সাথে অবসান হয় মীর জাফরের এক উক্তরসূরীর ঘটনাবহুল জীবনের। একদিকে তিনি ছিলেন ভাগ্যের বরপুত্র যিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শিখরে আরোহনের সুযোগ পান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরাশায়ী হন তাঁরই শিষ্য আইয়ুব খানের কাছে। যে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ পদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন, মৃত্যুর পর সেখানকার মাটিও তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। বিশ্বাসঘাতকের জন্য নির্ধারিত পরিণতিই তাঁকে বরণ করতে হয়েছে।

 

 

তথ্যসূত্র:

১.            Humayun Mirza, From Plassey To Pakistan: The Family History of Iskander Mirza, First President of Pakistan, Timespinner Press, USA, ২০১৫, পৃষ্ঠা: ৪০৭

২.           ঐ, পৃষ্ঠা: ২২৮

৩.          ঐ, পৃষ্ঠা: ২২৬-২২৭

৪.           ঐ, পৃষ্ঠা:২২৯

৫.           ঐ, পৃষ্ঠা: ২৪৯

৬.          ঐ, পৃষ্ঠা: ৩৭৭-৩৭৮

৭.           ঐ, পৃষ্ঠা: ২৩৭-২৩৮

৮.          ঐ, পৃষ্ঠা: ২৩২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024