নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সম্ভাব্য নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়। দিনভর উত্তেজনা থাকলেও বড় ধরনের কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। তবে গত দুই দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৪৪ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সারাদেশে আটকের সংখ্যা শতাধিক বলে জানা গেছে।
রাজধানীতে কড়া নজরদারি
মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্থাপনাগুলোর সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, তেজগাঁওয়ের দলীয় কার্যালয় এবং গুলিস্তানের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে ব্যারিকেড বসানো হয়। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন করে যানবাহন ও ব্যক্তিদের তল্লাশি চালায় পুলিশ ও র্যাব।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ১৮ হাজারের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, নিষিদ্ধ একটি দল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে— এমন আশঙ্কার ভিত্তিতেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল।

তবে রাতের দিকে রাজধানীর দারুস সালাম এলাকার টেকনিক্যাল মোড়ে একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে কেউ হতাহত না হলেও ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে অভিযান চলছে।
বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির কর্মসূচি
আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য তৎপরতা প্রতিরোধে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনও রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, ফার্মগেট, ধানমন্ডি ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে দলটির নেতারা দাবি করেন, দেশে আবারও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির পুনরুত্থানের সুযোগ নেই এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
ধানমন্ডিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা
দিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায়। জামায়াতের একটি কর্মসূচি চলাকালে কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে অন্তত চার সাংবাদিক আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বক্তব্য প্রদানের বিষয় নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সাংবাদিকদের মারধর করা হয়।
ঘটনার পর জামায়াত দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, ছাত্রদল ও মানবাধিকার সংগঠন হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিচারের দাবি করেছে।
জেলায় জেলায় গ্রেপ্তার ও ঝটিকা মিছিল
রাজধানীর বাইরে গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, রাঙামাটিসহ বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল ও ছোট পরিসরের কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, আটক ও পুলিশের অভিযান চালানো হয়।
গোপালগঞ্জে সাতজন, নারায়ণগঞ্জে ১৭ জন এবং রাঙামাটিতে বিশেষ অভিযানে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও পিরোজপুরেও একাধিক নেতাকর্মীকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে শরীয়তপুরে বিএনপির একটি কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বিএনপি এ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের দায়ী করে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
দেশজুড়ে রাজনৈতিক সতর্কতা
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে বিভিন্ন জেলায় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলও বিক্ষোভ ও সতর্কতামূলক কর্মসূচি পালন করেছে। কয়েকটি এলাকায় নেতারা আওয়ামী লীগের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার যে কোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে থাকার কথাও জানান তারা।
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও দিনটি বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়া শেষ হলেও বিভিন্ন এলাকায় গ্রেপ্তার, হামলা, বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা তৎপরতা দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্রই সামনে এনেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















