কোনো ব্যক্তি চাইলে সাময়িকভাবে নিজের স্বপ্ন থামিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সামনে সেই সুযোগ থাকে না। রাষ্ট্রের স্বপ্ন কোনো আবেগনির্ভর কল্পনা নয়; তা গড়ে উঠতে হয় বাস্তব সক্ষমতা, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি স্থির অঙ্গীকারের ওপর। তাই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যতই তীব্র হোক, একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা থেমে যেতে পারে না।
কেনিয়ার সামনে এখন মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত—রাজনীতি কি উন্নয়নের চালিকাশক্তি হবে, নাকি উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে? রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সৃজনশীল, দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে নতুন ধারণা ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগকে রাজনৈতিক সন্দেহের চোখে দেখা হবে না।
উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি
কেনিয়ার উন্নয়নের ইতিহাস দেখলে স্পষ্ট হয়, দেশটি কখনোই পরিকল্পনাবিহীনভাবে এগোয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৬৫ সালের ‘কেনিয়ায় আফ্রিকান সমাজতন্ত্র ও তার প্রয়োগ’ভিত্তিক পরিকল্পনা থেকে শুরু করে গ্রামীণ উন্নয়নের জেলা-কেন্দ্রিক উদ্যোগ এবং পরবর্তীকালে কেনিয়া ভিশন ২০৩০—সবকিছুর মধ্যেই একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছে।
এই ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়ন কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক স্লোগান নয়। একটি দেশের অর্থনীতি, মানবসম্পদ, অবকাঠামো, শিল্প, কৃষি ও সামাজিক সেবাকে রূপান্তর করতে সময় লাগে। ফলে একটি নির্বাচন সামনে এলেই উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থগিত করে দেওয়া হলে তার ক্ষতি শুধু বর্তমান সরকারের নয়, গোটা দেশের।
কেনিয়ার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। দেশটির মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ, উদ্যোক্তা সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে এর সামনে বড় সম্ভাবনার দরজা খোলা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিভিন্ন খাত ও শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে গভীর ও অর্থবহ আলোচনা প্রয়োজন।
জাপানের অভিজ্ঞতা কী শেখায়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের পুনর্গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ভয়াবহ ধ্বংসের পর দেশটি উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সঞ্চয়, করপোরেট সুশাসন এবং কঠোর কর্মসংস্কৃতির ওপর জোর দিয়েছিল। এর ফল ছিল দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান। ১৯৬৮ সালের মধ্যে জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জাতীয় উন্নয়নকে শুধু নির্বাচনী হিসাবের মধ্যে আটকে রাখলে বড় রূপান্তর সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যার সুফল হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।
কেনিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মানসিকতা প্রয়োজন। নির্বাচনী জনপ্রিয়তার চেয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সেতু
কেনিয়া কোয়ানজা সরকারের বটম-আপ অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাস্তব সম্পদ ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। দেশজুড়ে অবকাঠামো প্রকল্প, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সংস্কার, কফি ও চিনি খাতের পরিবর্তন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং সম্পদের তুলনামূলক ন্যায্য বণ্টনের উদ্যোগ—এসবকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে কোনো কর্মসূচিকেই সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়। বরং জনসম্পৃক্ততা, তথ্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে এগুলোর মূল্যায়ন হওয়া দরকার। একটি জাতীয় উন্নয়ন সনদ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা এখানেই। উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায় কেমন হবে, ভিশন ২০৩০-এর পর কেনিয়া কোথায় যেতে চায়—এই প্রশ্নগুলো এখনই আলোচনায় আসা উচিত।
রাজনীতি থাকবে, কিন্তু উন্নয়নও চলবে
জাতীয় উন্নয়ন ও রাজনীতি পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উন্নয়নের দিকনির্দেশনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অপরিহার্য। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নির্বাচন সামনে রেখে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি, প্রকল্প ও পরিকল্পনাকে স্থবির করে দেওয়াকেই স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।
ইতিহাস কেনিয়াকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। রাজনৈতিক বিরোধ, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অভিজ্ঞতা দেশটির সামাজিক কাঠামোয় গভীর ছাপ ফেলেছে। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে না।
ভিন্নমত অবশ্যই থাকবে। সরকারি নীতির সমালোচনাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সমালোচনার পাশাপাশি বিকল্প নীতি ও কার্যকর সমাধান উপস্থাপন করাও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব। শুধু বিরোধিতা, সন্দেহ তৈরি কিংবা জনগণের বিভাজনকে উসকে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনো কার্যকর বিকল্প নয়।
জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ওপরে রাখতে হবে
কেনিয়ার ভবিষ্যৎকে সংকীর্ণ জাতিগত রাজনৈতিক সমীকরণের কাছে জিম্মি করে রাখা যাবে না। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা নির্বাচনী আনুগত্য যদি জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই।
কেনিয়ার সামনে তাই এখন প্রয়োজন আরও দীর্ঘ দৃষ্টিভঙ্গি। ভিশন ২০৩০ একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার উন্নয়ন কাঠামো হলেও দেশের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা তার সঙ্গে শেষ হয়ে যেতে পারে না। বরং এখন থেকেই পরবর্তী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের ভিত্তি নির্ধারণ করা দরকার।
এই কাজটি কোনো একক রাজনৈতিক দল বা সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সরকার, বিরোধী দল, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ জনগণ—সব পক্ষের অংশগ্রহণে একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে।
কেনিয়ার জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক উত্তেজনার ঊর্ধ্বে উঠে উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করা। নির্বাচন আসবে, সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক জোট পরিবর্তিত হবে। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা থেমে থাকার বিলাসিতা কোনো রাষ্ট্রেরই নেই। কেনিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত বিভাজনের রাজনীতিতে নয়, বরং ধারণা, সক্ষমতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
জাভাস বিগাম্বো 



















