দেশে গ্যাস সংকট আরও গভীর হচ্ছে। একদিকে কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকার বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে এর মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে বলে সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট
পেট্রোবাংলার শুক্রবারের হিসাব অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬২ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৭১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট এসেছে। বিপরীতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুটে।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক চাহিদা ২৫২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭০ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা ও জ্বালানি ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ফলে বাড়ছে লোডশেডিং।
শিল্প ও জনজীবনে বাড়ছে চাপ

গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহে কোথাও কারখানার উৎপাদন কমেছে, কোথাও বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারিও সংকটের দৃশ্যমান চিত্র। কম চাপের কারণে অনেক চালক নির্ধারিত পরিমাণ গ্যাস নিতে পারছেন না। ফলে একই গাড়িকে দিনে একাধিকবার স্টেশনে যেতে হচ্ছে। আবাসিক এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
দেশীয় উৎপাদন কমছে
গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ দেশীয় উৎপাদন হ্রাস। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছিল ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। বর্তমানে মোট সরবরাহ ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ এবং দেশীয় উৎসের সরবরাহ প্রায় ১৬২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।
সরকার উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপে সংস্কারকাজের উদ্যোগ নিয়েছে। ১৫০টি কূপের কর্মসূচির মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে, যাতে প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস বাড়তে পারে।
তিতাস, বাখরাবাদ, মোবারকপুর ও সুনেত্র এলাকায় গভীর কূপ খননের পাশাপাশি বড় পরিসরে ভূকম্পন জরিপের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে অনুসন্ধান থেকে উৎপাদনে যেতে সময় লাগে।
এলএনজিতেও ঝুঁকি

দেশীয় ঘাটতি পূরণে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে, বাড়ছে দাম এবং প্রয়োজনমতো কার্গো সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠছে।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৬৮টি এলএনজি কার্গো এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭১টি। জুলাই ও আগস্টে এসেছে ১৫টি, আগের বছর একই সময়ে এসেছিল ২১টি। একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১৬ দিন বন্ধ থাকায় সংকট আরও বেড়েছে।
নতুন টার্মিনালে কতটা স্বস্তি মিলবে
আমদানি সক্ষমতা বাড়াতে মহেশখালীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমইসিকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে এবং আমদানি সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট বাড়বে।
তবে সক্ষমতা বাড়ালেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত এলএনজি কিনতে বৈদেশিক মুদ্রা, নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে।
আপাতত তেল-কয়লার ওপর নির্ভরতা
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি এবং এ খাতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতাও প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট।

তবে তেল ও কয়লা দিয়ে সাময়িকভাবে ঘাটতি মোকাবিলা করা গেলেও আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়বে।
দুই বছর পরই কি মিলবে সমাধান?
দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখা, নতুন এলাকায় অনুসন্ধান ও কূপ খনন দ্রুত করা এবং এলএনজির জন্য নির্ভরযোগ্য আমদানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তেল, কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমের মতে, এলএনজি ব্যয়বহুল হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী তা আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি কোন খাতে কত গ্যাস দেওয়া হবে, সে বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়াতে হবে।
দুই বছর পর সংকট পুরোপুরি মোচন হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, সংকট কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি একই সময়ে বাড়তে থাকবে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















