০৯:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ শেষ হবে না, বদলে যাবে যুদ্ধের ধরন রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি

এশিয়ার মনস্তত্ত্ব বদলে দিচ্ছে ইরান যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া সরে গেলে কার দিকে ঝুঁকবে অঞ্চল?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ সেই ধারণাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই প্রভাব ফেলেনি, বরং এশিয়ার দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। প্রশ্ন উঠছে—ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীলতা কি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে?

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে আস্থার সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সরাসরি সন্দেহ না থাকলেও, তার কৌশলগত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান ইস্যুতে যে ধরনের একতরফা পদক্ষেপ দেখা গেছে, তা অনেক দেশের কাছে অস্থিরতার বার্তা বহন করেছে। ফলে এশিয়ার অনেক নীতিনির্ধারক এখন ভাবছেন—কোন শক্তির ওপর নির্ভর করা নিরাপদ?

এখানেই চীনের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে ধীরে-সুস্থে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার যে কৌশল বেইজিং অনুসরণ করে আসছে, তা হঠাৎ করেই আরও কার্যকর হয়ে উঠেছে। চীন নিজেকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও হিসাবি অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে—যে শক্তি উত্তেজনা বাড়ানোর বদলে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগ্রহী।

জ্বালানি সংকট এই মনোভাব পরিবর্তনের একটি বড় চালিকাশক্তি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এশিয়ায়, কারণ অঞ্চলটি জ্বালানির জন্য ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, দাম বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়ের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এই সংকটের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান সহায়তার অভাব অনেক দেশকেই হতাশ করেছে।

অন্যদিকে, চীন সরাসরি বড় ধরনের সহায়তা না দিলেও একটি ভিন্ন ধরনের বার্তা দিয়েছে—ধৈর্য, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তাদের বিনিয়োগ এবং কম খরচে প্রযুক্তি সরবরাহের সক্ষমতা এশিয়ার দেশগুলোর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ফলে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে অনেকেই ভাবছে, ভবিষ্যতের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য কোন অংশীদার বেশি কার্যকর।

The Iran War: Understanding the Regional and Global Security Implications -  The Soufan Center

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই মনোভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। যেখানে একসময় চীনের আঞ্চলিক আগ্রাসনই ছিল প্রধান উদ্বেগ, এখন সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অনেক দেশের নীতিনির্ধারকরা প্রয়োজন হলে চীনের দিকেই ঝুঁকতে প্রস্তুত—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ইঙ্গিত।

ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোও নিজেদের অবস্থান নতুন করে বিবেচনা করছে। এরা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক চাহিদা—বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা—তাদের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলছে। ফলে সম্পর্কগুলো আর আগের মতো একমুখী নয়; বরং বহুমাত্রিক ও হিসাবি হয়ে উঠছে।

এই পুরো প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনকে নিয়ে বিভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশ তাকে এখন ‘ডিফল্ট বিকল্প’ হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমলে স্বাভাবিকভাবেই চীনের প্রভাব বাড়ছে—যদিও সেটি সবসময় সচেতন পছন্দ নয়।

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে: শক্তির ভারসাম্য শুধু সামরিক ক্ষমতায় নির্ধারিত হয় না, বরং আস্থা, ধারাবাহিকতা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার ওপরও নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই দিকগুলোতে নিজেকে পুনর্গঠন করতে না পারে, তাহলে এশিয়ায় তার প্রভাব ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়াই স্বাভাবিক।

এখন প্রশ্ন শুধু এটুকুই—এশিয়া কি নতুন এক কৌশলগত বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, যেখানে শক্তির কেন্দ্র বদলে যাচ্ছে নীরবে, কিন্তু স্থায়ীভাবে?

জনপ্রিয় সংবাদ

নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ শেষ হবে না, বদলে যাবে যুদ্ধের ধরন

এশিয়ার মনস্তত্ত্ব বদলে দিচ্ছে ইরান যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া সরে গেলে কার দিকে ঝুঁকবে অঞ্চল?

০৮:৩২:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ সেই ধারণাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই প্রভাব ফেলেনি, বরং এশিয়ার দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। প্রশ্ন উঠছে—ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীলতা কি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে?

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে আস্থার সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সরাসরি সন্দেহ না থাকলেও, তার কৌশলগত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান ইস্যুতে যে ধরনের একতরফা পদক্ষেপ দেখা গেছে, তা অনেক দেশের কাছে অস্থিরতার বার্তা বহন করেছে। ফলে এশিয়ার অনেক নীতিনির্ধারক এখন ভাবছেন—কোন শক্তির ওপর নির্ভর করা নিরাপদ?

এখানেই চীনের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে ধীরে-সুস্থে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার যে কৌশল বেইজিং অনুসরণ করে আসছে, তা হঠাৎ করেই আরও কার্যকর হয়ে উঠেছে। চীন নিজেকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও হিসাবি অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে—যে শক্তি উত্তেজনা বাড়ানোর বদলে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগ্রহী।

জ্বালানি সংকট এই মনোভাব পরিবর্তনের একটি বড় চালিকাশক্তি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এশিয়ায়, কারণ অঞ্চলটি জ্বালানির জন্য ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, দাম বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়ের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এই সংকটের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান সহায়তার অভাব অনেক দেশকেই হতাশ করেছে।

অন্যদিকে, চীন সরাসরি বড় ধরনের সহায়তা না দিলেও একটি ভিন্ন ধরনের বার্তা দিয়েছে—ধৈর্য, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তাদের বিনিয়োগ এবং কম খরচে প্রযুক্তি সরবরাহের সক্ষমতা এশিয়ার দেশগুলোর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ফলে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে অনেকেই ভাবছে, ভবিষ্যতের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য কোন অংশীদার বেশি কার্যকর।

The Iran War: Understanding the Regional and Global Security Implications -  The Soufan Center

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই মনোভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। যেখানে একসময় চীনের আঞ্চলিক আগ্রাসনই ছিল প্রধান উদ্বেগ, এখন সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অনেক দেশের নীতিনির্ধারকরা প্রয়োজন হলে চীনের দিকেই ঝুঁকতে প্রস্তুত—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ইঙ্গিত।

ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোও নিজেদের অবস্থান নতুন করে বিবেচনা করছে। এরা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক চাহিদা—বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা—তাদের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলছে। ফলে সম্পর্কগুলো আর আগের মতো একমুখী নয়; বরং বহুমাত্রিক ও হিসাবি হয়ে উঠছে।

এই পুরো প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনকে নিয়ে বিভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশ তাকে এখন ‘ডিফল্ট বিকল্প’ হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমলে স্বাভাবিকভাবেই চীনের প্রভাব বাড়ছে—যদিও সেটি সবসময় সচেতন পছন্দ নয়।

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে: শক্তির ভারসাম্য শুধু সামরিক ক্ষমতায় নির্ধারিত হয় না, বরং আস্থা, ধারাবাহিকতা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার ওপরও নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই দিকগুলোতে নিজেকে পুনর্গঠন করতে না পারে, তাহলে এশিয়ায় তার প্রভাব ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়াই স্বাভাবিক।

এখন প্রশ্ন শুধু এটুকুই—এশিয়া কি নতুন এক কৌশলগত বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, যেখানে শক্তির কেন্দ্র বদলে যাচ্ছে নীরবে, কিন্তু স্থায়ীভাবে?