শান্তি প্রতিষ্ঠার পর কী হবে—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আলোচনা বেশি ব্যস্ত। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে সামনে আসছে: এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী যুদ্ধটি কেমন হতে পারে?
ইউক্রেনের যুদ্ধ শুধু একটি দেশের ভূখণ্ড দখল কিংবা সামরিক সংঘাতের ঘটনা নয়। এটি ভবিষ্যৎ যুদ্ধের চরিত্র বদলে দেওয়ার মতো একটি পরীক্ষাগারও। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার সক্ষমতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিবর্তন দেখিয়ে দিচ্ছে—আগামী দিনের যুদ্ধ হয়তো আর প্রচলিত অর্থে যুদ্ধক্ষেত্রে শুরু হবে না।
যুদ্ধের প্রথম আঘাত আসতে পারে অদৃশ্য পথে
ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, একটি পারমাণবিক শক্তিধর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। অতীতের বহু সামরিক অভিযানের সঙ্গে এর তুলনা করা হলেও এর রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত উদ্দেশ্য একে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
তবে সামরিক দিক থেকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিদিন নতুন ধরনের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, নজরদারি ব্যবস্থা এবং সফটওয়্যারভিত্তিক যুদ্ধপ্রযুক্তি পরীক্ষা হচ্ছে। রাশিয়া তার অস্ত্রব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তন করছে, যাতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে পাশ কাটানো যায়। একই সঙ্গে এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন দেশের সামরিক কাঠামোতেও দ্রুত প্রবেশ করছে।
ফলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ সম্ভবত সীমান্তে ট্যাংকের দীর্ঘ সারি কিংবা বিশাল নৌবহরের উপস্থিতি দিয়ে শুরু হবে না। প্রথম আঘাত আসতে পারে সাইবার জগৎ থেকে।
সামরিক কমান্ড, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় একযোগে সাইবার হামলা চালানো হতে পারে। একটি দেশ যত বেশি ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হবে, এই ধরনের হামলার সম্ভাব্য ক্ষতিও তত বেশি হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দেবে হামলার গতি
পরবর্তী প্রজন্মের সাইবার অস্ত্রের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ এখন আর কল্পনার বিষয় নয়। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের সামরিক কাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দুর্বলতা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধনীতি এবং অতীতের সংঘাত থেকে সংগৃহীত বিপুল তথ্য ব্যবহার করে এ ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব।
মানুষের নিয়ন্ত্রণে কিংবা আংশিক স্বায়ত্তশাসিতভাবে পরিচালিত এআই-নির্ভর ব্যবস্থা একই সময়ে বিপুল সংখ্যক লক্ষ্য শনাক্ত ও আক্রমণ করতে পারবে। এতে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি মানুষের সক্ষমতার তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
সাইবার হামলার পর আসতে পারে দ্বিতীয় ধাক্কা—হাজার হাজার এআই-সক্ষম ড্রোনের সমন্বিত আক্রমণ। তাদের লক্ষ্য হতে পারে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং হাসপাতালসহ সংবেদনশীল নাগরিক স্থাপনায় হামলা চালানো।
একই সময়ে জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের মজুত, গুদাম, পরিবহনকেন্দ্র এবং সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত হানা হলে একটি রাষ্ট্রের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। প্রচলিত স্থলবাহিনীকে মাঠে নামানোর প্রয়োজন তখন অনেক কমে যেতে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রের ধারণাই বদলে যাবে
স্বয়ংক্রিয় ও দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধব্যবস্থা যত বেশি কার্যকর হবে, সৈন্যদের সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকিতে পাঠানোর প্রয়োজন তত কমবে। এর ফলে যুদ্ধের সবচেয়ে পুরোনো একটি ধারণা—ভূগোলই প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান শক্তি—ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে।
একটি দেশের ভৌগোলিক গভীরতা একসময় শত্রুর অগ্রযাত্রা ঠেকানোর গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছিল। কিন্তু দূরপাল্লার ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাইবার অস্ত্র সেই সুবিধার বড় অংশকে অকার্যকর করে দিতে পারে। আক্রমণকারীকে সীমান্ত পেরিয়ে শত্রুর ভূখণ্ডে প্রবেশ না করেও তার গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতায় আঘাত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এতে যুদ্ধের ‘ফ্রন্টলাইন’ কোথায়, সেটিও নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। একটি ড্রোন যদি তৃতীয় কোনো দেশের আকাশসীমা অতিক্রম করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যায়, কিংবা একটি সাইবার হামলার উৎস নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা না যায়, তাহলে আগ্রাসনের প্রচলিত সংজ্ঞাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আর এআই যদি একসময় মানুষের সমপর্যায়ের যুক্তি প্রয়োগ করে নিজেই কৌশলগত লক্ষ্য নির্বাচন করতে সক্ষম হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তখন শুধু কে জিতল সেটিই নয়, ‘জয়’ বলতে আসলে কী বোঝায়—সেই প্রশ্নও নতুন করে উঠবে।
ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব হবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি
এই পরিবর্তনের একটি সরাসরি রাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের উত্থান। একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এতদিন মূলত তার ভূখণ্ড, সীমান্ত ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ভবিষ্যতে তথ্য, ডেটা সেন্টার এবং কম্পিউটিং সক্ষমতাও একই ধরনের কৌশলগত সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
শত্রুর লক্ষ্য শুধু ডেটা চুরি করা হবে না। তথ্য পরিবর্তন করা, ভুল তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়া কিংবা এআই যে ডেটার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয় সেই তথ্যকে বিকৃত করাও যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি, সাইবার নাশকতা এবং তথ্য-দূষণ ভবিষ্যৎ সংঘাতের নিয়মিত উপাদানে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ ও আগাম হামলার নতুন হাতিয়ারও হতে পারে।
এ কারণেই রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক ব্যবস্থাকেও নতুনভাবে সাজাতে হবে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিষয়ক সামরিক অভিযান থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তার একটি হলো—বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কভিত্তিক কমান্ড কাঠামো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার তুলনায় সংকটের মধ্যে বেশি স্থিতিস্থাপক হতে পারে।
কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক বা সামরিক কর্মকর্তা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকলেও যদি নিচের স্তরগুলোকে স্পষ্ট দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কার্যক্রম থেমে যায় না। তাই শুধু যুদ্ধের জন্য নয়, বেসামরিক প্রশাসনের ক্ষেত্রেও বিকেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেগুলো বাস্তব পরিস্থিতির মতো মহড়ার মাধ্যমে নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি।
প্রস্তুতির সময় এখনই
এসব প্রস্তুতি অনেকের কাছে হয়তো অকালপক্ব মনে হতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির পরিবর্তনের গতি সেই ধারণার বিপরীত কথা বলছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থেকে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া যাবে না।
রাশিয়া বা তার বিভিন্ন অংশ অদূর ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দিকে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা কৌশলগত বাস্তবতার চেয়ে আশাবাদী কল্পনার কাছাকাছি। একইভাবে চীনের ক্ষেত্রেও দ্রুত কোনো মৌলিক পরিবর্তনের আশা করা কঠিন।
আধুনিক ইতিহাসে প্রায় আট দশক ধরে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি বৃহৎ যুদ্ধ এড়িয়ে চলার যে সময় আমরা পার করেছি, সেটি মানবসভ্যতার জন্য এক বিরল অধ্যায়। কিন্তু সেই অধ্যায়ের ভেতরেই এমন কিছু রাজনৈতিক ধারণা ফিরে এসেছে, যেগুলো একসময় ইতিহাসের পরিত্যক্ত অধ্যায় বলে মনে করা হয়েছিল—ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য, গণহত্যা এবং ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব।
প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি কিংবা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দীর্ঘ প্রচেষ্টা এসব প্রবণতাকে পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি। তাই আজকের দায়িত্ব শুধু বর্তমান যুদ্ধের পর একটি শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করা নয়। আরও বড় দায়িত্ব হলো, সেই শান্তির পর যে যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, তার চরিত্র সম্পর্কে এখনই প্রস্তুত হওয়া।
কারণ আগামী যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হয়তো তার বিস্ফোরণের শব্দ নয়—বরং যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পরও আমরা বুঝতে নাও পারি, ঠিক কখন এবং কোথা থেকে তার প্রথম আঘাতটি এসেছিল।
সার্জিই করসুনস্কি 


















