আমেরিকার রাজনৈতিক অভিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ এমন একটি শব্দ, যার ব্যবহার প্রায়ই এর প্রকৃত অর্থের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি করে। বিশেষ করে ডানপন্থী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এই শব্দটি বামঘেঁষা নীতি ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে আক্রমণের জন্য কার্যকর একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একসময় যেসব নীতিকে সমাজতন্ত্র বলে ভয় দেখানো হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই আজ আমেরিকান রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ।
১৯৪৮ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান এই রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সাধারণ মানুষের জীবনকে উন্নত করার জন্য নেওয়া নানা পদক্ষেপকে বিরোধীরা ‘সমাজতন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎব্যবস্থা থেকে সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষকদের মূল্য সহায়তা থেকে শ্রমিক ইউনিয়নের শক্তিশালী অবস্থান, এমনকি ব্যাংকে আমানতের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও সেই রাজনৈতিক আক্রমণের আওতায় পড়েছিল।
ট্রুম্যানের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল একটি রাজনৈতিক কৌশলকে চিহ্নিত করা। ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি তখন এমন এক বিস্তৃত রাজনৈতিক লেবেলে পরিণত হয়েছিল, যার মাধ্যমে জনগণের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাড়ানোর প্রায় যেকোনো উদ্যোগকে সন্দেহজনক করে তোলা সম্ভব ছিল। তাঁর মতে, রিপাবলিকানদের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল নিউ ডিলের নীতিগুলোর বিরোধিতা করা; ‘সমাজতন্ত্র’ ছিল সেই বিরোধিতাকে রাজনৈতিকভাবে আরও তীব্র করার ভাষা।
আজকের আমেরিকায় একই প্রশ্ন অন্য রূপে ফিরে এসেছে। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার প্রভাব ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিগুলোতে দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে। এর অর্থ এই নয় যে আমেরিকান ভোটাররা হঠাৎ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানা কিংবা প্রচলিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বরং এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, দেশের একটি বড় রাজনৈতিক অংশ অর্থনীতি ও সমাজে রাষ্ট্রের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে চাইছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে কয়েকটি মৌলিক উদ্বেগ। নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কতটা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে? স্বাস্থ্যসেবা কতটা বাজারনির্ভর থাকবে? শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা কতটা বাড়ানো উচিত? সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য কমাতে সরকারের ভূমিকা কতটা হওয়া দরকার? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেক আমেরিকান আগের তুলনায় বেশি রাষ্ট্রীয় সহায়তার পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন।![]()
কিন্তু এখানেই ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটির রাজনৈতিক ব্যবহার সমস্যাজনক হয়ে ওঠে। কোনো নাগরিক সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে চাইলে, শ্রমিকদের অধিকার বাড়ানোর পক্ষে থাকলে কিংবা সরকারের মাধ্যমে কিছু মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে চাইলে তাকে সরাসরি সমাজতান্ত্রিক হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তব রাজনৈতিক বিতর্ককে সরল করে ফেলে।
আমেরিকান রাজনীতির ইতিহাস বরং দেখায়, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রশ্নটি কখনোই এত সরল ছিল না। সময়ের সঙ্গে এমন অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলো একসময় অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণ হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। পরে সেগুলোই অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার স্থায়ী অংশে পরিণত হয়েছে।
তাই বর্তমান ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট উত্থানকে শুধু ‘আমেরিকা সমাজতান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে’—এমন একটি সরল গল্পে বন্দী করা ভুল হবে। প্রকৃত পরিবর্তনটি সম্ভবত মানুষের প্রত্যাশায়। বাজার সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে কি না, এবং যেখানে বাজার ব্যর্থ হয় সেখানে রাষ্ট্রের কতটা দায়িত্ব নেওয়া উচিত—এই প্রশ্নগুলো এখন আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে।
অবশ্যই এর একটি সীমা আছে। রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ানোর প্রতিটি প্রস্তাব যে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকারি ব্যয়, করের বোঝা, অর্থনৈতিক দক্ষতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজতন্ত্রের নামে কিংবা তার বিরোধিতার নামে এসব বাস্তব প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
শেষ পর্যন্ত আমেরিকার বিতর্কটি কোনো একটি রাজনৈতিক শব্দের জয়-পরাজয় নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কী চান এবং তার বিনিময়ে কতটা সরকারি ক্ষমতা ও ব্যয় মেনে নিতে প্রস্তুত। ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি সেই বিতর্ককে উত্তপ্ত করতে পারে, কিন্তু উত্তর দিতে পারে না।
আমেরিকার রাজনীতিতে এখন যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা হয়তো সমাজতন্ত্রের দিকে সরাসরি যাত্রা নয়। বরং এটি এমন একটি সমাজের লক্ষণ, যেখানে বহু মানুষ আবার প্রশ্ন তুলছে—অর্থনীতি মানুষের জন্য কতটা কাজ করছে, এবং যখন তা যথেষ্ট কাজ করে না, তখন রাষ্ট্রের কী করা উচিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















