কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার কাজ এখন কয়েক মিনিটেই শেষ করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু কাজ দ্রুত শেষ হওয়ায় কর্মীদের হাতে অবসর আসছে না; বরং একই সময়ে আরও বেশি কাজ করার প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তরুণ কর্মীদের অভিজ্ঞতায় এমনই এক নতুন কর্মসংস্কৃতির চিত্র উঠে এসেছে।
কাজ দ্রুত শেষ, প্রত্যাশা আরও বেশি
ভারতের গুরুগ্রামের ডিজিটাল বিপণনকর্মী আয়ুশি রঘুবংশীর অভিজ্ঞতা এর বড় উদাহরণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় প্রচারণার তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপনের উপকরণ তৈরি ও উপস্থাপনার স্লাইড তৈরির কাজ আগের তুলনায় অনেক দ্রুত শেষ করতে পারছেন তিনি। কিন্তু এতে তাঁর কাজের সময় কমেনি।
আগে যেখানে দিনে তিন থেকে পাঁচটি কাজ সামলাতেন, এখন একই সময়ে আটটি পর্যন্ত কাজ নিতে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর ভাষায়, কোনো কাজ যখন ঘণ্টার বদলে কয়েক মিনিটে শেষ হয়, তখন কর্মীর কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবেই আরও কিছু করার প্রত্যাশা তৈরি হয়।
কর্মী ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মীদের কাজের চাপ কমানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে কাজের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে। কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন বাড়ে, আর উৎপাদন বাড়লে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশাও বাড়তে থাকে।

এশিয়ার তরুণদের মধ্যে একই অভিজ্ঞতা
চীনের সাংহাইয়ের এক নিয়োগ পরামর্শক জানিয়েছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নিয়োগব্যবস্থায় যাচ্ছে। আগে যেখানে প্রার্থী বাছাইয়ের তালিকা তৈরি করতে এক সপ্তাহ লাগত, এখন তা ২২ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মদক্ষতার সূচক না বদলালেও দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ বেড়েছে।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ডিজিটাল ব্যাংকিং পণ্যের ব্যবস্থাপক পিচায়া লিউচানপাতানার ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন এসেছে। আগে তিনি দুটি পণ্য দেখভাল করতেন, এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তিনটি পণ্য সামলাচ্ছেন। একই সঙ্গে একাধিক বৈঠক সামলাতেও তাঁকে প্রযুক্তির সহায়তা নিতে হচ্ছে।
জরিপে মিলেছে চাপ বাড়ার প্রমাণ
সাতটি এশীয় বাজারে ২১ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৩ হাজার ৬২৮ জন নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দার ওপর করা জরিপে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রভাব উঠে এসেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, চীন ও ভারতের কর্মজীবী এবং চাকরিপ্রত্যাশীরা এতে অংশ নেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারী কর্মীদের মধ্যে একই সময়ে বেশি কাজ করার প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে চীনে। সেখানে ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। ভারতে এ হার ৮২ শতাংশ। সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায় তা ৬৯ শতাংশ।

তবে এর বিপরীতে তরুণদের বড় একটি অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজেদের পেশাজীবনের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করেন। চীন ও ভারতে ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, কর্মজীবনে এ প্রযুক্তি তাঁদের জন্য উপকারী।
উৎপাদন বাড়লেও বাড়ছে একঘেয়েমি ও মানসিক চাপ
ভারতের কনটেন্ট লেখক রিধি আনন্দ আগে দিনে ৫০০ থেকে ২ হাজার শব্দ লিখতেন। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তাঁকে প্রায় ৬ হাজার শব্দের কাজ করতে হচ্ছে। প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি খসড়াকে আবার মানুষের মতো স্বাভাবিক করে তুলতে সম্পাদনা করতে হয় তাঁকে। ফলে কাজ দ্রুত হলেও একঘেয়েমি ও চাপ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তনটি সব সময় কাজের পরিমাণ বাড়ার অর্থে আসে না। বরং আগে যে মানকে ভালো কাজ হিসেবে ধরা হতো, এখন সেটিই স্বাভাবিক মানদণ্ড হয়ে যাচ্ছে। ফলে কর্মীদের কাছ থেকে দ্রুততর প্রতিক্রিয়া, আরও পরিশীলিত কাজ এবং জটিল দায়িত্ব সামলানোর প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে।
বেশি উৎপাদনের সঙ্গে কি বাড়ছে বেতন?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও অধিকাংশ তরুণ কর্মীর মূল বেতন সরাসরি বাড়েনি। কেউ কেউ মনে করছেন, ভালো কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন, বেশি প্রণোদনা বা পদোন্নতির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এর পরোক্ষ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
জরিপে দেখা যায়, চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারী কর্মীদের ৪২ শতাংশ বলেছেন, এর কারণে তাঁদের আয় বেড়েছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় এ হার ৩৪ শতাংশ করে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে মাত্র ১২ শতাংশ কর্মী বেতন বাড়ার কথা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষতাকে বিশেষ সুবিধা নয়, বরং সাধারণ কর্মদক্ষতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা থাকলেই বাড়তি বেতন নিশ্চিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

চাকরি হারানোর ভয়ও বাড়ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধার পাশাপাশি চাকরি হারানো এবং নিজেদের দক্ষতা অচল হয়ে যাওয়ার ভয়ও রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া সাতটি বাজারের সবগুলোতেই ১০ জনের মধ্যে আটজনের বেশি কর্মী কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কোনো না কোনো উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
ফিলিপাইনের বহুমাধ্যম নকশাবিদ কলিন বার্সেলোনার অভিজ্ঞতা এই উদ্বেগকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। একটি প্রতিষ্ঠানে চিত্রাঙ্কনের কাজ করার সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে অতিরিক্ত চিত্র তৈরির প্রয়োজন না থাকায় তিনি চাকরি হারান। এরপর নিজেকে টিকিয়ে রাখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিপণন, তথ্য বিশ্লেষণ ও ওয়েব নকশার মতো নতুন দক্ষতা অর্জনের দিকে ঝুঁকেছেন।
শুধু প্রযুক্তি নয়, মানবিক দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ
ভবিষ্যতের চাকরির জন্য শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দক্ষতাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিঙ্গাপুরে ৪৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৪৯ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা ভবিষ্যৎ চাকরির জন্য সমালোচনামূলক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। ভারতে ৬৪ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৪১ শতাংশ উত্তরদাতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয়তার দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু নির্দেশ দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছ থেকে উত্তর বের করে আনতে পারলেই হবে না। সেই উত্তর যাচাই করা, সঠিক প্রশ্ন তৈরি করা, সমস্যাকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা এবং জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই বড় পার্থক্য গড়ে দেবে।
নতুন আয়ের পথও খুলছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু চাকরির সহায়ক হিসেবে নয়, বাড়তি আয়ের মাধ্যম হিসেবেও দেখছেন অনেকে। ইন্দোনেশিয়ায় ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁরা বাড়তি কাজ বা নতুন আয়ের উৎস তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছেন অথবা করার কথা ভাবছেন। থাইল্যান্ডে এ হার ৩৫ শতাংশ, ভারতে ৩১ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ২৪ শতাংশ।
জাকার্তার সৃজনশীল ও বিষয়বস্তু কৌশলবিদ ভেলিসিয়া সেরেনাদা ছোট একটি উৎসবকালীন উপহারের ব্যবসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়েছিলেন। ব্যবসার মূল ধারণা ছিল তাঁর নিজের, তবে মূল্য নির্ধারণ, পণ্যের তালিকার লেখা, প্রচারণার ধারণা ও বাজার বিশ্লেষণে প্রযুক্তিটি তাঁকে সহায়তা করেছে।

ভবিষ্যৎ কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষের যৌথ পথ?
ভবিষ্যতের চাকরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিষয়ে দেশভেদে মনোভাবও আলাদা। ভারতে ৭৫ শতাংশ, চীনে ৬৯ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা এমন চাকরি চান, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা থাকবে। সিঙ্গাপুরে এ হার মাত্র ৫৪ শতাংশ।
সিঙ্গাপুরের কর্মীদের মধ্যে মানবিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বেশি। সেখানে ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা ভবিষ্যতের জন্য এমন পেশাকে উপযুক্ত মনে করেছেন, যেখানে সহমর্মিতা, জটিল কৌশলগত চিন্তা ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর অর্থ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরোধিতা নয়। বরং কর্মীরা এমন দক্ষতা অর্জন করতে চাইছেন, যা প্রযুক্তির পক্ষে সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, দায়িত্বশীলতা ও সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় মানুষের ভূমিকা এখনও অপরিহার্য।
মানুষের সিদ্ধান্তই শেষ কথা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কর্মীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে দূরে সরে যাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রযুক্তি কী ভালোভাবে করতে পারে, কোথায় এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং কীভাবে নিজের দক্ষতার সঙ্গে একে মিলিয়ে ব্যবহার করা যায়—এ বিষয়ে কর্মীদের যথেষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই দ্রুত উত্তর তৈরি করুক, কোন প্রশ্ন করা দরকার এবং কোন উত্তর বিশ্বাসযোগ্য—সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মানুষকেই নিতে হবে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে তাই প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি, সৃজনশীলতা ও দক্ষতাকে আরও শক্তিশালী করাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















