চার্লি কার্কের মৃত্যুর এক বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতিতে তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংগঠনটির বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতিতে এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।
তবে কার্ক যেসব তরুণ ভোটারকে রিপাবলিকান শিবিরের দিকে টেনে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের সবাই এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি একইভাবে অনুগত নেই। ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তরুণ ভোটারদের এই জোট আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য নতুন পরীক্ষার কারণ হতে পারে।
কার্কের মৃত্যুর এক বছর পূর্তিতে বৃহস্পতিবার ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচন-সংক্রান্ত সম্মেলনে তাকে স্মরণ করা হচ্ছে। একই সময়ে দলটি তরুণ পুরুষ ভোটারদের মধ্যে সমর্থন কমে যাওয়ার লক্ষণও দেখছে। এই তরুণ পুরুষরাই ট্রাম্পের ২০২৪ সালের বিজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভোটব্যাংক ছিল।
৩১ বছর বয়সী কার্ককে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইউটাহ ভ্যালি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিতর্ক অনুষ্ঠানের সময় গলায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় টাইলার রবিনসনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। গত সপ্তাহে ইউটাহর এক বিচারক প্রসিকিউশনকে রবিনসনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন।
কার্কের মৃত্যুর পরের এক বছরে তিনি যে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, সেটি নানা চাপের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। তার হত্যাকাণ্ড নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত জেফ্রি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে তরুণ ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে।
ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া রিপাবলিকান পার্টির ২৪ বছর বয়সী চেয়ারম্যান জশ হলস্টেইন কার্কের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হন স্কুলে পড়ার সময় টার্নিং পয়েন্টের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে। তিনি মনে করেন, কার্কের আকস্মিক মৃত্যুর পর সংগঠনের কিছুটা পুনর্গঠন স্বাভাবিক হলেও আন্দোলনটি থেমে যায়নি।
হলস্টেইনের দাবি, কার্কের মৃত্যুর পর শুধু ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতেই টার্নিং পয়েন্টের কয়েক ডজন নতুন শাখা গড়ে উঠেছে। তার মতে, ডালাসের স্মরণসভা তরুণ ভোটারদের সামনে দেশের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ এবং তরুণদের সমৃদ্ধির বিষয়গুলো আবারও তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বড় কারণ
তরুণ ভোটারদের অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। হার্ভার্ড ইয়ুথ পোলের মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরুর দিকে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী আমেরিকানদের অর্ধেক বলেছেন, মূল্যস্ফীতি তাদের ওপর ‘অনেক বেশি’ প্রভাব ফেলেছে। ৪৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অথবা তাদের আর্থিক নিরাপত্তা খুবই কম।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়েও তরুণদের মধ্যে বিরোধিতা তুলনামূলকভাবে বেশি। সাম্প্রতিক ইউগভ-ইকোনমিস্ট জরিপে মাত্র ১৬ শতাংশ তরুণ বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে অনীহা বাড়ছে। তরুণ পুরুষদের মধ্যে ব্যাপক অনুসারী থাকা রক্ষণশীল গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ইসরায়েলের স্বার্থের দ্বারা অতিরিক্তভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
কার্কও মৃত্যুর কয়েক মাস আগে এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে তিনি জানিয়েছিলেন, অনেক তরুণ রক্ষণশীল মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলের প্রভাব অতিরিক্ত। তবে একই সঙ্গে ইসরায়েলবিরোধী সমালোচনার কিছু ক্ষেত্রে ইহুদিবিদ্বেষের উপাদান ঢুকে পড়ার বিষয়েও তিনি সতর্ক করেছিলেন। ভ্যান্সের জুনে প্রকাশিত একটি বইয়ে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ও রক্ষণশীল রাজনীতি নিয়ে গবেষক নিকোল হেমার মনে করেন, তরুণ রক্ষণশীলদের সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টির দূরত্ব তৈরির পেছনে ইসরায়েল ও অর্থনীতি—দুই বিষয়ই বড় ভূমিকা রাখছে। তার মতে, ট্রাম্পকে ঘিরে তরুণদের মধ্যে অর্থনৈতিক অসন্তোষও এখন স্পষ্ট।
তরুণ পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে
তরুণ ভোটারদের মধ্যে এই অসন্তোষের প্রভাব জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, গত মাসে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী পুরুষদের মাত্র ৩২ শতাংশ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজের অনুমোদন দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই হার ছিল ৪৩ শতাংশ।
২০২৪ সালের নির্বাচনে তরুণ পুরুষদের ৪৬ শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। ২০২০ সালের তুলনায় এটি ছিল ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ফলে তরুণ পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্পের সেই শক্তিশালী সমর্থন ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
টার্নিং পয়েন্টের মুখপাত্র অ্যান্ড্রু কোলভেট বলেন, গত বছরই কার্ক তরুণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে দেখেছিলেন। বিশেষ করে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশে প্রশাসনের ভূমিকা, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে তরুণদের হতাশা কার্ক লক্ষ্য করেছিলেন।
তার ভাষায়, কার্ক এসব বিভাজন ও অসন্তোষের জায়গাগুলো বুঝতে পেরেছিলেন এবং সেগুলোকে রাজনৈতিক বার্তার অংশ করে তুলছিলেন।
তবে কার্কের মৃত্যুর পর টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএর সাংগঠনিক বিস্তার থেমে যায়নি, বরং তা আরও দ্রুত হয়েছে। কোলভেটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংগঠনটির সারা দেশে ৩ হাজার ৫০০টির বেশি উচ্চবিদ্যালয় শাখা রয়েছে, যা এক বছরে ১৮০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রয়েছে ১ হাজার ৫০০টির বেশি শাখা, যা ৬০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
কার্ক নেই, কিন্তু সংগঠন টিকে আছে
চার্লি কার্কের গড়ে তোলা সাংগঠনিক কাঠামো এবং তরুণ ভোটারদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী বলে মনে করেন তার রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে বই লেখা কাইল স্পেন্সার।
তবে তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন তথাকথিত ‘ওক’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক লড়াই চালাচ্ছে, বিশেষ করে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচির বিরুদ্ধে অবস্থান—তা তরুণ রক্ষণশীলদের জন্য আগের মতো কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তৈরি করছে না।
স্পেন্সারের মতে, কার্ক নিজে থাকলে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সামলাতে তার উত্তরসূরিদের তুলনায় বেশি সক্ষম হতে পারতেন।
একই সময়ে কিছু তরুণের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী চিন্তার প্রতি নতুন আগ্রহও দেখা যাচ্ছে। ফলে তরুণদের রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন শুধু রক্ষণশীলদের দিকেই যাচ্ছে না; প্রগতিশীল কণ্ঠগুলোর প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক ভূমিকা আরও স্পষ্ট করে দিতে পারে। টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনফরমেশন অ্যান্ড রিসার্চ অন সিভিক লার্নিং অ্যান্ড এনগেজমেন্টের ৫ হাজার ৫৪৯ তরুণের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ৫৬ শতাংশ বলেছেন, তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে ‘অত্যন্ত সম্ভাব্য’।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে একই ধরনের জরিপের তুলনায় এই হার ২ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। সাধারণত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভোটার উপস্থিতি বেশি থাকে। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনে তরুণদের এমন আগ্রহ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
রক্ষণশীল ধারার ভাষ্যকার এবং একসময় কার্কের সঙ্গে টার্নিং পয়েন্টে কাজ করা জ্যাক পোসোবিয়েক মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি হলে কার্ক তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করতেন।
তার মতে, তরুণদের সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহকে শুধু আক্রমণ বা অপমান করে ঠেকানো যাবে না। কেন তারা এমন ধারণার দিকে ঝুঁকছে, তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো কী এবং তারা কী অনুভব করছে—সেটা আগে বুঝতে হবে।
কার্কের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাই এখন এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে এবং রিপাবলিকান রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। অন্যদিকে, তিনি যে তরুণ ভোটারদের রক্ষণশীল রাজনীতির দিকে নিয়ে এসেছিলেন, তাদের একটি অংশ অর্থনৈতিক চাপ, ইরান যুদ্ধ ও সরকারের বিভিন্ন নীতিতে হতাশ হয়ে ট্রাম্পের প্রতি আগের মতো সমর্থন দেখাচ্ছে না।
ফলে কার্কের মৃত্যুর এক বছর পর টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএর সাংগঠনিক শক্তি যেমন বেড়েছে, তেমনি তরুণ ভোটারদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে রিপাবলিকান পার্টির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই তরুণ ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তনের মাত্রা কতটা গভীর, তার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিতে পারেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















