মঙ্গলগ্রহ থেকে প্রথমবারের মতো নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার দৌড়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের নাসাকে পেছনে ফেলতে পারে। চীনের লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে মঙ্গল থেকে প্রায় ৫০০ গ্রাম নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসা। বিপরীতে, একই সময়সীমা ধরে এগোনোর মতো স্পষ্ট পরিকল্পনা ও অর্থায়ন বর্তমানে নাসার নেই।
চীনের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা চায়না ন্যাশনাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিএনএসএ) ‘তিয়ানওয়েন-৩’ মিশনের মাধ্যমে এই নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। মিশনটি ২০২৮ সালের দিকে উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যবহার করা হবে দুটি লং মার্চ-৫ ভারী রকেট। চীনের চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে নমুনা ফিরিয়ে আনার মিশনেও এই রকেট ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২৮-২৯ সালের উৎক্ষেপণই গুরুত্বপূর্ণ
মিশনটির সম্ভাব্য উৎক্ষেপণস্থল চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হাইনান প্রদেশের ওয়েনচাং স্পেস লঞ্চ সাইট। মঙ্গল ও পৃথিবীর কক্ষপথের অবস্থান অনুকূল হওয়ার কারণে মঙ্গল অভিযানের সুযোগ আসে প্রায় ২৬ মাস পরপর।
তিয়ানওয়েন-৩-এর জন্য ডিসেম্বর ২০২৮ থেকে জানুয়ারি ২০২৯ সময়ের উৎক্ষেপণ জানালা লক্ষ্য করা হয়েছে। ফলে ২০৩১ সালের মধ্যে নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে চাইলে উৎক্ষেপণে বড় ধরনের বিলম্বের সুযোগ থাকবে না।

পাঁচটি প্রধান অংশ নিয়ে মিশন
তিয়ানওয়েন-৩ মিশনে থাকবে পাঁচটি প্রধান উপাদান—ল্যান্ডার, অ্যাসেন্ডার, সার্ভিস ক্যাপসুল, অরবিটার এবং পৃথিবীতে পুনঃপ্রবেশের মডিউল।
মিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য মঙ্গলে জীবনের অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজে বের করা। তিয়ানওয়েন-৩-এর প্রধান বিজ্ঞানী হৌ জেংচিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রাচীন জীবনের সঙ্গে মিল থাকতে পারে এমন অণুজীবের চিহ্নের সন্ধান করবেন বিজ্ঞানীরা। একই সঙ্গে প্রত্যাশার বাইরে কোনো অস্বাভাবিক আবিষ্কারের সম্ভাবনাও খোলা রাখা হচ্ছে।
হৌ চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়াকে এসব তথ্য জানান। তিনি হেফেইয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন কনফারেন্সের পাশে কথা বলেন। চীনের ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন ল্যাবরেটরি বা তিয়ানদু ল্যাবরেটরি আয়োজিত এ সম্মেলনে এ বছর ৪০টির বেশি দেশের অংশগ্রহণ ছিল।
মঙ্গল সম্পর্কে নতুন তথ্যের সম্ভাবনা
মঙ্গলের নমুনায় প্রাণের কোনো চিহ্ন পাওয়া না গেলেও তা বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে জানিয়েছেন হৌ। তাঁর মতে, নমুনাগুলোর অণুবীক্ষণিক, আণবিক ও আইসোটোপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মঙ্গলের ভূতত্ত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে গ্রহটি অতীতে বসবাসযোগ্য ছিল কি না, সে সম্পর্কেও ধারণা মিলতে পারে।
মিশনের বিভিন্ন সরঞ্জাম ইতোমধ্যে প্রোটোটাইপ তৈরির পর্যায়ে রয়েছে। হৌ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিকে জানিয়েছেন, মিশনের কাজ এগিয়ে চলছে এবং চীনের বিভিন্ন দল এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে।

অবতরণস্থল নির্ধারণে বড় চ্যালেঞ্জ
তিয়ানওয়েন-৩-এর জন্য উপযুক্ত অবতরণস্থল নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীন ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সম্ভাব্য স্থান চূড়ান্ত করার আশা করছে। এ লক্ষ্যে পুরো মঙ্গলগ্রহের একটি নতুন প্রজন্মের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরির কাজ চলছে।
অবতরণস্থল বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এলাকার ভূতাত্ত্বিক বয়স, অতীতে পানির উপস্থিতির প্রমাণ, বসবাসযোগ্যতার সম্ভাবনা এবং সম্ভাব্য জীবনের চিহ্ন সংরক্ষণের উপযোগী ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা হচ্ছে।
পৃথিবীতে নমুনা ফেরানোর পর সেগুলো নিরাপদে সংরক্ষণও হবে আরেকটি জটিল কাজ। এ জন্য হেফেইয়ের নির্মাণাধীন ডিপ-স্পেস সায়েন্স সিটির প্রথম পর্যায়ে একটি প্ল্যানেটারি প্রোটেকশন ল্যাবরেটরি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে চীন।
এই গবেষণাগারে নমুনা জীবাণুমুক্তকরণ, সিলমোহর খোলা, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সম্ভাব্য জৈবিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সংস্থা কমিটি অন স্পেস রিসার্চের (কসপার) নির্ধারিত প্রোটোকল অনুসরণ করার কথা রয়েছে। এসব নির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর জীবাণু দিয়ে মঙ্গলকে দূষিত হওয়া ঠেকানো এবং মঙ্গল থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করা।
চীনের তিয়ানওয়েন-৩ মিশন সফল হলে মঙ্গলগ্রহের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দেশটি নাসাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















