মৃত্যুর কয়েক দশক পরও বলিউডের সিনেমা ও সংগীতে বারবার ফিরে আসছেন কিংবদন্তি উস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান। তাঁর কালজয়ী কাওয়ালি ও গজল নতুন সংগীতায়োজন, পুনর্নির্মাণ ও কণ্ঠে পর্দায় নতুন জীবন পাচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর সংগীতের আবেগ, আধ্যাত্মিকতা ও শক্তিশালী কণ্ঠশৈলীর সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হচ্ছে।
‘শাহেনশাহ-এ-কাওয়ালি’ হিসেবে পরিচিত নুসরাত ফতেহ আলী খান ঐতিহ্যবাহী সুফি সংগীতের ধারা কাওয়ালিকে পাকিস্তানের ছোট পরিসরের আসর থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ ও পশ্চিমা সংগীত উৎসব পর্যন্ত পৌঁছে দেন। তাঁর অসাধারণ কণ্ঠসীমা ও সৃষ্টিশীল সংগীতভাবনা পরবর্তী বহু শিল্পীকে প্রভাবিত করেছে। সিনেমায় তাঁর গান ব্যবহৃত হয়েছে কখনো পুনর্নির্মাণ, কখনো অভিযোজন, আবার কখনো মূল রেকর্ডিংয়ের অংশবিশেষ ব্যবহারের মাধ্যমে।
মির্জাপুর ও ধুরন্ধরে নুসরাতের গান
সাম্প্রতিক উদাহরণগুলোর একটি ‘মির্জাপুর: দ্য ফিল্ম’-এর ‘সাঁসোঁ কি মালা’। নুসরাতের মূল কণ্ঠের সঙ্গে মধুর শর্মা ও বৈভব পানির নতুন পরিবেশনা যুক্ত করে গানটিকে নতুন আবহ দেওয়া হয়েছে। সিনেমার মিড-ক্রেডিট দৃশ্যে রাসিকা দুগালের অভিনীত বীনা ত্রিপাঠী ও তার অতীতের একটি অধ্যায়ের সঙ্গে গানটি ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে এই গান বলিউডে নতুন নয়। এর আগে ১৯৯৬ সালের ‘জিত’ এবং ১৯৯৭ সালের ‘কয়লা’ সিনেমাতেও ‘সাঁসোঁ কি মালা’ ব্যবহৃত হয়েছিল। দুটি ছবিতেই অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান ও মাধুরী দীক্ষিত।
অন্যদিকে আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর ২’-এ রয়েছে ‘জান সে গুজরতে হ্যায়’। গানটি নুসরাতের ১৯৭৭ সালের ক্লাসিক ‘দিল পে জখম খাতে হ্যায়’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুনভাবে তৈরি করেছেন শাশ্বত সচদেব। এতে নুসরাত ফতেহ আলী খান ও সচদেবের কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা ও আবেগের টানাপোড়েনঘন সিনেমার আবহে গানটি নাটকীয়তা আরও বাড়িয়েছে।
বারবার নতুন রূপে ফিরেছে যে গানগুলো
নুসরাতের প্রভাব অবশ্য সাম্প্রতিক কয়েকটি সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর জনপ্রিয় সৃষ্টি ‘মেরে রাশকে কামার’ ২০১৭ সালের ‘বাদশাহো’ সিনেমায় নতুনভাবে উপস্থাপন করেন তানিশক বাগচি। গানটির কণ্ঠ দেন রাহাত ফতেহ আলী খান।
‘ইয়ে জো হালকা হালকা সুরুর হ্যায়’ থেকেও তৈরি হয়েছে একাধিক নতুন কাজ। ২০১৬ সালে এটি ‘হালকা হালকা’ নামে নতুনভাবে আসে এবং ২০১৮ সালের ‘ফ্যানি খান’ সিনেমাতেও গানটির ব্যবহার দেখা যায়।
‘সিম্বা’ সিনেমায় ‘তেরে বিন’ গানটির মাধ্যমে নুসরাতের ‘তেরে বিন নেহি লাগদা’ নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছায়। নুসরাতের ভাতিজা রাহাত ফতেহ আলী খান ও আসিস কৌরের কণ্ঠে গানটি পুনরায় রেকর্ড করা হয়।
২০১৮ সালের ‘রেইড’ সিনেমায় ‘সানু এক পাল চেইন না আভে’ নতুনভাবে পরিবেশন করেন রাহাত ফতেহ আলী খান। একই ছবিতে নুসরাতের আরেক সৃষ্টি ‘নিত খাইর মাঙ্গা’ অপেক্ষাকৃত কোমল অ্যাকুস্টিক বিন্যাসে ব্যবহৃত হয়।
‘কিন্না সোহনা তেনু রব নে বানায়া’ জায়গা করে নিয়েছে ‘রাজা হিন্দুস্তানি’ (১৯৯৬) ও ‘মারজাভাঁ’ (২০১৯)-এর মতো সিনেমায়। আর অষ্টম শতকের পাঞ্জাবি সুফি কবি বাবা বুল্লেহ শাহর লেখা ও নুসরাতের কণ্ঠে জনপ্রিয় ‘মেরা পিয়া ঘর আয়া’ ১৯৯৫ সালের ‘ইয়ারানা’ সিনেমায় নতুন রূপ পায়। আনু মালিকের বাণিজ্যিক জ্যাজধর্মী সংগীতায়োজন এবং কবিতা কৃষ্ণমূর্তির কণ্ঠে গানটি মাধুরী দীক্ষিতের জনপ্রিয় নৃত্যগানে পরিণত হয়।
নুসরাতের সংগীতের এই ধারাবাহিক প্রত্যাবর্তন দেখায়, সময় বদলালেও তাঁর সৃষ্টির আবেগ ও আবেদন হারায়নি। নতুন সংগীতায়োজন ও শিল্পীদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁর কাওয়ালি ও গজল আজও সিনেমার গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
নুসরাত ফতেহ আলী খান ৪৮ বছর বয়সে আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান; তাঁর কিডনি ও লিভার বিকলতার সঙ্গে এর যোগ ছিল। কিন্তু তাঁর সংগীত থেমে যায়নি। বরং পর্দায় ও নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে বারবার ফিরে এসে তিনি এখনো প্রমাণ করে চলেছেন, কেন তাঁকে ‘শাহেনশাহ-এ-কাওয়ালি’ বলা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















