মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন শুধু যৌথ সামরিক মহড়া বা প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে বিরোধ নয়। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক জোটব্যবস্থা নতুন করে মূল্যায়নের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা। ট্রাম্প এখন স্পষ্টভাবে দেখতে চাইছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশের নিরাপত্তার জন্য বিপুল অর্থ ও সামরিক শক্তি ব্যয় করে, সেসব মিত্র বিনিময়ে ওয়াশিংটনকে কী দিচ্ছে।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বার্ষিক যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার আগে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যৌথ সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, এসব মহড়া ব্যয়বহুল এবং উত্তর কোরিয়ার কাছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বৈরী বার্তা পাঠায়।
তবে বিষয়টি শুধু উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে নয়। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না করায়ও ট্রাম্প অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন যখন সহযোগিতা চেয়েছে, সিউলের জবাব ছিল কার্যত—‘না, ধন্যবাদ।’
নিরাপত্তার বিনিময়ে মূল্য চায় ওয়াশিংটন
কোরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৫৩ সালের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে এই সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্র শুধু সেনা মোতায়েন করে না; গোয়েন্দা সহযোগিতা, সামরিক সরঞ্জাম, কমান্ড কাঠামো, বিমান ও নৌ সক্ষমতার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়াকে পারমাণবিক প্রতিরোধের নিশ্চয়তাও দেয়।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে, এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল্য দক্ষিণ কোরিয়াকে আরও বেশি বহন করা উচিত। তাঁর প্রথম মেয়াদেও তিনি সিউলের কাছ থেকে মার্কিন সেনা মোতায়েনের ব্যয় ভাগাভাগিতে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেছিলেন।
বর্তমান কাঠামোতেও দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন সেনা উপস্থিতির ব্যয় বহনে অর্থ দেয়। ২০২৬ সালে দেশটির অবদান প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন উন, অর্থাৎ প্রায় ১১০ কোটি মার্কিন ডলার।
ট্রাম্পের যুক্তি হলো, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ধনী মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধা দীর্ঘদিন তুলনামূলক কম খরচে পেয়েছে। তাই এখন তাদের আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে, আরও বেশি মার্কিন অস্ত্র কিনতে হবে এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্যোগেও পাশে দাঁড়াতে হবে।
বাণিজ্যও এখন নিরাপত্তার হিসাবের অংশ
ট্রাম্পের কাছে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য আলাদা বিষয় নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদেই দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল।
২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট রপ্তানি রেকর্ড ৭০ হাজার ৯৪০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ২৯০ কোটি ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে যায়। একই সময়ে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, গাড়ি, অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শুল্ক বা বাজারসুবিধা কমানোর হুমকি সিউলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলার যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।
ফলে এখন শুল্ক, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও অস্ত্র কেনাকাটা—সবকিছুকে একই বৃহত্তর দর-কষাকষির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও নির্ভরশীল সিউল
দক্ষিণ কোরিয়াকে দুর্বল মিত্র বলা যাবে না। দেশটির নিজস্ব সামরিক বাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রতিরক্ষা শিল্পও দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। কামান, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌযান উৎপাদনে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৭৮০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সিউলের নির্ভরতা রয়েছে—মার্কিন পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ছাতার ওপর দক্ষিণ কোরিয়া এখনও নির্ভরশীল।
এই নির্ভরতার কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি উপেক্ষা করা সিউলের পক্ষে সহজ নয়। নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে গেলে দক্ষিণ কোরিয়াকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হবে।
ইরান যুদ্ধেই প্রকাশ পেল মতপার্থক্য
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে ইরানকে ঘিরে।
দক্ষিণ কোরিয়া জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আসে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প ও অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিন্তু নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিতে সিউল অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার দৃষ্টিতে, উত্তর কোরিয়া তার স্থায়ী ও তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যের একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে কোরীয় উপদ্বীপে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আইনগত বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।
ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র যদি দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তার জন্য সেনা, অর্থ ও পারমাণবিক প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন স্বার্থে সিউলের কাছ থেকেও দৃশ্যমান সহযোগিতা প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক—এটাই তাঁর অবস্থানের মূল কথা।
বদলে যাচ্ছে আমেরিকার জোটনীতি
দক্ষিণ কোরিয়াকে ঘিরে বিরোধ আসলে বৃহত্তর মার্কিন নীতির একটি পরীক্ষামাত্র। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব থেকে সরিয়ে নিতে চান—এমনটা নয়। বরং তিনি চান, বৈশ্বিক নেতৃত্বের খরচ অন্য দেশগুলো আরও বেশি বহন করুক।
ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ, মার্কিন অস্ত্র কেনা এবং আমেরিকান শিল্পকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও আরও বড় ভূমিকা রাখতে হবে।
চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি, রাশিয়াকে ঘিরে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যয় এবং একাধিক অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার বিপুল খরচ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন তার সম্পদের ব্যবহার নতুন করে হিসাব করছে।
ট্রাম্পের লক্ষ্য তাই পুরোপুরি পিছু হটা নয়; বরং কম খরচে এবং বেশি প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে মার্কিন প্রভাব ধরে রাখা।
জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এই নীতির একটি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জোটব্যবস্থার শক্তি দীর্ঘদিন ধরে এসেছে এর পূর্বানুমানযোগ্যতা থেকে। মিত্ররা জানত, প্রয়োজনের সময় ওয়াশিংটন তাদের পাশে থাকবে।
কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চয়তা যদি বাণিজ্য ঘাটতি, বিনিয়োগ, অস্ত্র কেনা কিংবা মার্কিন সামরিক অভিযানে রাজনৈতিক সমর্থনের সঙ্গে ক্রমাগত যুক্ত হতে থাকে, তাহলে মিত্র দেশগুলোও নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানোর কথা ভাবতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়া এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি। দেশটি অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী, সামরিকভাবে সক্ষম এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে তার নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনও ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল।
তাই সিউলকে একদিকে বেশি অর্থ ব্যয়, বেশি অস্ত্র কেনা ও বেশি বিনিয়োগের চাপ সামলাতে হচ্ছে; অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার নিজস্ব বাস্তবতা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সায় দেওয়াও তার পক্ষে সম্ভব নয়।
ট্রাম্পের দক্ষিণ কোরিয়া নীতি শেষ পর্যন্ত মার্কিন নেতৃত্বকে সস্তা করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি যদি মিত্রদের আরও বেশি স্বনির্ভর হয়ে ওঠার দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন জোটব্যবস্থাই নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের বার্তা তাই স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতা আর নিঃশর্ত সুবিধা হিসেবে দেখা হবে না। এর সঙ্গে থাকবে অর্থনৈতিক অবদান, প্রতিরক্ষা ব্যয়, বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনের সময় রাজনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার প্রত্যাশা। দক্ষিণ কোরিয়া সেই নতুন হিসাবের বাইরে থাকছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















