ভারতের সভাপতিত্বে ব্রিকসের এবারের শীর্ষ সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার বিরোধ যেমন জি-২০কে ঐকমত্যের কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল, এবার মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একই ধরনের পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে ব্রিকসের। এই পরিস্থিতিতে সম্মেলন সফলভাবে পরিচালনা করা ভারতের জন্য নিছক আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে জোটটির ভবিষ্যৎ বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যৌথ ঘোষণা না হওয়া ইতিমধ্যেই সমস্যার মাত্রা স্পষ্ট করেছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় করা যায়নি। ভারত, রাশিয়া, চীনসহ অন্যান্য সদস্য সমঝোতার চেষ্টা করলেও ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। শীর্ষ সম্মেলনেও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্রিকসের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই সংশ্লিষ্ট দুই দেশের ওপর অন্য সদস্যদের পক্ষ থেকে একটি ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানোর চাপ থাকা স্বাভাবিক।
ভারতের কূটনৈতিক পরীক্ষা
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতের গুরুত্ব কোনোভাবেই শুধু আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব রয়েছে। হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচল উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি ভারতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিস্তৃত। ফলে দিল্লি চাইবে ব্রিকস সম্মেলন থেকে এমন একটি যৌথ ঘোষণা আসুক, যাতে সদস্যদের কেউ আলাদা আপত্তি জানিয়ে না থাকে।
কিন্তু এই সম্মেলনের গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে নয়। বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও ব্রিকসকে নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
ট্রাম্পের একতরফা নীতি ও নতুন বাস্তবতা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। শুল্ককে বাণিজ্যিক হাতিয়ার থেকে রাজনৈতিক চাপের উপকরণে পরিণত করা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একতরফা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিকতার প্রতি অবজ্ঞা—এসব পদক্ষেপ বিশ্বরাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গেও নানা ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি করছে। কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তার উদাহরণ। এমন পরিস্থিতিতে অনেক দেশই বুঝতে পারছে যে একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৌশলগতভাবে নিরাপদ নয়।
এখানেই ব্রিকসের গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। ট্রাম্প যদি ব্রিকসকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে তিনি সংগঠনটির প্রকৃত চরিত্রকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করছেন। ব্রিকসের সদস্যদের স্বার্থ এক নয়, তাদের রাজনৈতিক অবস্থানও অভিন্ন নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অধিকতর ভারসাম্য ও বিকল্প তৈরি করার প্রয়োজন অনেকের মধ্যেই অভিন্ন।
ডলার থেকে দূরে সরে যাওয়ার বাস্তবতা
ব্রিকসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি তোলা হয়, তা হলো এটি ডলারের আধিপত্য ভাঙতে চায়। বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। ব্রিকসের মূল লক্ষ্য ডলারকে হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং বিকল্প অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এর পেছনে একটি সহজ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। যদি একটি দেশের নিয়ন্ত্রিত আর্থিক অবকাঠামো অন্য দেশকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজবে। নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ যত বেশি রাজনৈতিক হাতিয়ার হবে, ততই ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর আগ্রহ বাড়বে।
অবশ্য এই পরিবর্তন দ্রুত ঘটবে না। ভারতসহ ব্রিকসের বহু দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর বাণিজ্যিক, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। তাই ডলারনির্ভর আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা রাতারাতি বদলে যাবে—এমন ধারণা অবাস্তব। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করারও কারণ নেই।
ব্রিকস এখনো অসম্পূর্ণ
ব্রিকসকে নিয়ে দুটি বিপরীত ধরনের অতিরঞ্জন দেখা যায়। কেউ মনে করেন, এটি পশ্চিমা বিশ্বের বিকল্প হিসেবে ইতিমধ্যেই একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা তৈরি করেছে। আবার কেউ মনে করেন, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণে সংগঠনটির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দুটিই অতিসরলীকরণ।
ব্রিকস এখনো একটি চলমান প্রকল্প। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, চীনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এবং ভারত-চীন সম্পর্কের জটিলতা সংগঠনটির কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে। ভারতের পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ব্রিকসকে সরল পশ্চিমবিরোধী কাঠামো হিসেবে দেখার ধারণাকে দুর্বল করে।
কিন্তু ব্রিকসের উদ্দেশ্য তো কখনো একটি সামরিক বা আদর্শিক জোট তৈরি করা ছিল না। এর গুরুত্ব হলো—ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোকে এমন একটি মঞ্চে আনা, যেখানে তারা নিজেদের অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলোতে সহযোগিতা করতে পারে।
ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন
ভারতের জন্য ব্রিকসের মূল্যায়ন করতে হলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ভারতের সব কূটনৈতিক বিকল্প একটি মাত্র শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে।
ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া, চীন এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। বরং এই বহুমুখী সম্পর্কই ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব বাড়ানোও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের অংশ। বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রয়োজন হলে একা ভারতের পক্ষে সেই পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট চাপ তৈরি করা কঠিন। তাই ব্রিকসের মতো বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন।
এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকসের প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে ভারতের স্বার্থ অভিন্ন। বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যেসব বিষয়ে স্বার্থের মিল রয়েছে, সেখানেই সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা উচিত।
চীন-রাশিয়া ও ভারতের সমীকরণ
এবারের সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অংশগ্রহণ বিশেষ আগ্রহ তৈরি করবে। দীর্ঘ সময় পর তাঁর ভারত সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দুই দেশের সম্পর্কের সামনে সীমান্ত বিরোধসহ নানা জটিলতা রয়েছে। নয়াদিল্লিতে ভারত ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনা হলে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতিও সম্মেলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য বাড়াবে। ভারত, রাশিয়া ও চীনের নেতাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ আন্তর্জাতিক মহলে অবশ্যই আলাদা মনোযোগ তৈরি করবে। ইরানের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে।
কেউ কেউ যুক্তি দেন, রাশিয়া ও চীন যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোয়, তাহলে ভবিষ্যতে ব্রিকসের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। এমনকি ট্রাম্প, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা তৈরি হলে ভারতসহ ব্রিকসের অন্য সদস্যরা প্রান্তিক হয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু এই ধারণা ধরে নেয় যে পুতিন ও শি ট্রাম্পের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থা রেখে নিজেদের কৌশল সাজাবেন। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এমন নিশ্চয়তা দেয় না। বড় শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। একটি সম্ভাব্য বৈঠক বা সাময়িক সমঝোতা কোনো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ করে দেয় না।
ব্রিকসের ভবিষ্যৎ কোথায়
ব্রিকসের প্রকৃত সম্ভাবনা হয়তো কোনো আকস্মিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনে নয়, বরং ধীরে ধীরে বাস্তব সহযোগিতার অবকাঠামো তৈরিতে। সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি ও বাজারের আকার বাড়ছে। ফলে পারস্পরিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগে সহযোগিতার সুযোগও বাড়ছে।
ভারত ডিজিটাল জনপরিকাঠামোর ক্ষেত্রে নিজের অভিজ্ঞতা ব্রিকসের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে। নতুন উন্নয়ন ব্যাংককে আরও শক্তিশালী করতে মূলধন বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। নতুন সরবরাহশৃঙ্খল, সংযোগ প্রকল্প এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা রয়েছে।
এসব উদ্যোগ রাতারাতি বিশ্বব্যবস্থা পাল্টে দেবে না। ব্রিকসও এমন কোনো প্রস্তুত প্রতিষ্ঠান নয়, যা পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ কার্যকর। কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভারসাম্য বদলায় ধীরে ধীরে। দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্পও একদিনে তৈরি হয় না।
ব্রিকসের গুরুত্ব তাই তার বর্তমান অর্জনের চেয়ে ভবিষ্যতে কী নির্মাণ করতে পারে, তার ওপর বেশি নির্ভরশীল। সদস্যদের সব স্বার্থ এক না হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সহযোগিতার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
আর ঠিক এখানেই ব্রিকসের সমালোচকদের জন্য একটি অস্বস্তিকর সত্য রয়েছে। সংগঠনটির দুর্বলতা বাস্তব, কিন্তু তার প্রয়োজনীয়তাও বাস্তব। যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতি যত বেশি দেশকে বিকল্প সম্পর্ক, বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক কাঠামোর কথা ভাবতে বাধ্য করবে, ব্রিকসের মতো মঞ্চের গুরুত্বও তত বাড়তে পারে।
কানওয়াল সিবাল 



















