মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সুরক্ষিত স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ হামলারও নতুন করে হুমকি দিয়েছেন।
ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জাহাজ চলাচল ঘিরে বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সংঘর্ষও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তীব্র হয়েছে।
নির্বাচনের পর যুদ্ধ শেষ হওয়ার দাবি
বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান আর দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না এবং দেশটি নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, তিনি মনে করেন নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। তাঁর দাবি, ইরান চাপে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যেই তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প এর আগেও একাধিক সময়সীমার কথা বলেছেন। এবার তাঁর বক্তব্যের বিপরীতে হোয়াইট হাউসের কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে সতর্ক করেছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ট্রাম্পের বর্তমান প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ পর্যন্তও গড়াতে পারে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে।

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলার হুমকি
ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামের একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থাপনায় হামলার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত নাতানজ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার কাছে অবস্থিত এই এলাকায় মাটির অনেক গভীরে তৈরি দুটি সুড়ঙ্গভিত্তিক স্থাপনা রয়েছে বলে জানা যায়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে।
ট্রাম্প বলেছেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে কিছু কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের নজরে এসেছে। ইরানকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, দেশটি যেন কোনো ধরনের ‘বাড়াবাড়ি’ না করে, কারণ প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে খুব কঠোর হামলা চালাবে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকেই ট্রাম্প এই স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে সামরিক হামলা শুরু করে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ ছিল ওই অভিযানের অন্যতম কারণ। তবে তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল ফের বাধাগ্রস্ত
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ আবারও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।
হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু চলতি মাসে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় সেই অগ্রগতি অনেকটাই থমকে গেছে।
প্রাথমিক জাহাজ চলাচল-তথ্য অনুযায়ী, বুধবার মাত্র সাতটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। আগের ১০ দিনের দৈনিক গড়ের তুলনায় এটি প্রায় অর্ধেক।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা
ইরান জানিয়েছে, বুধবার হরমুজ প্রণালির কাছে তারা ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে। একের পর এক এসব পাল্টাপাল্টি হামলা যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সমুদ্রপথে সংঘর্ষ বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব তেলের দাম এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে বলে উদ্বেগ বাড়ছে।
সৌদি আরব-হুথি সংঘর্ষেও উত্তেজনা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের লড়াইও তীব্র হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দ্বিতীয় যুদ্ধক্ষেত্রও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হুথি হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের চারটি শহরে অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে খামিস মুশাইত শহরও রয়েছে।

হুথিরা জানিয়েছে, তারা খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটি এবং আশপাশের শহরগুলোর তেল অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর সৌদি আরবে এটি অন্যতম বড় হুথি হামলা বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
বৃহস্পতিবার খামিস মুশাইতে নতুন করে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সৌদি কর্তৃপক্ষ সতর্কতা তুলে নেয়।
যুদ্ধের রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর
ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপরও চাপ তৈরি করছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই তাঁর প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টির হাতে থাকবে কি না, তা নির্ধারিত হবে। ট্রাম্পের দাবি, ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে ওই নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে চাইছে।
তবে যুদ্ধ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্পের নতুন বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সৌদি আরব-হুথি সংঘর্ষের বিস্তার—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরিধি আরও বাড়ার আশঙ্কাই এখন বেশি দৃশ্যমান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















