০৩:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চীনা পণ্য কিনতে বিনিময় কৌশলে নিষেধাজ্ঞা এড়াচ্ছে ইরান দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চিরকুট বিতর্কে চীন ফিলিপাইন শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরেও কাটছে না বাণিজ্য জট ট্রাম্প কিম চতুর্থ বৈঠক আয়োজনে মধ্যস্থতায় প্রস্তুত হলো চীন মিয়ানমারে টিন খনি চালু হলো জাতিসংঘ তদন্ত প্রত্যাখ্যান করল সরকার  হোয়াইট হাউসের সহকারীদের নগদ উপহার নিয়ে উঠল নৈতিকতার প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের দুই অংশের প্রতীক নিয়ে উপনির্বাচনে দ্বন্দ্ব  নেপালে বন্যা পুনর্গঠনে পাঁচশ কোটি ডলার সহায়তা চাইল সরকার এশিয়া কাপ সেমিফাইনালে আজ ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ নারী দল রিপাবলিকান জিতলে প্রতি আমেরিকানকে নগদ অর্থ দেবেন ট্রাম্প

আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রাখাইন ভাষা পাঠ্যক্রম চালু

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার স্কুলগুলোয় রাখাইন ভাষা পাঠ্যক্রম হিসেবে চালু করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা রাখাইন ভাষায় পাঠ নিতে পারছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে চলমান সংঘাত ও রোহিঙ্গা সংকটের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান গত নয় সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে বিষয়টি জানায়। এক স্থানীয় শিক্ষকের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ধীরে ধীরে অন্যান্য শ্রেণিতেও বর্মি ভাষার পরিবর্তে রাখাইন ভাষা পড়ানো হবে। দুই হাজার তেইশ সাল থেকে রাজ্যজুড়ে অভিযান চালিয়ে আরাকান আর্মি এখন সতেরোটি টাউনশিপের মধ্যে চৌদ্দটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। এই বিপুল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের কারণেই এখন তারা কেবল সামরিক নয়, শিক্ষা ও প্রশাসনের মতো নাগরিক পরিষেবাও নিজেদের মতো করে সাজাতে পারছে।

রাজ্যের রাজধানী সিটওয়ে এবং বন্দরনগরী কিয়াউকপিউর নিয়ন্ত্রণ ঘিরে দুই হাজার পঁচিশের ফেব্রুয়ারি থেকে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। চিন রাজ্যের পালেতোয়া শহরেও, যা আরাকান আর্মি দুই হাজার চব্বিশ সালে দখল করেছিল, এখন শিক্ষার্থীদের একই ভাষা-নীতির আওতায় আনা হচ্ছে। একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে শিক্ষাব্যবস্থার এমন রূপান্তর দেখায় যে তারা কেবল সামরিক নয়, প্রশাসনিক কর্তৃত্বও কতটা সুসংহত করে ফেলেছে। রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় সংহত করার এই প্রয়াস দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। শিক্ষা খাতে ইউনাইটেড লীগ অব আরাকানের তৎপরতা নতুন নয়। এর আগে সংগঠনটি নিজস্ব শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা চালু করে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে নিজেদের কাঠামোর আওতায় এনেছে। একই সঙ্গে মংডু এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলিম শিক্ষক নিয়োগেরও উদ্যোগ নিয়েছিল তারা, যদিও সেই উদ্যোগ ঘিরে স্থানীয় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মতভেদও রয়েছে। এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, আরাকান আর্মি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, একটি সমান্তরাল রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তোলার কাজেও এগিয়ে যাচ্ছে পরিকল্পিতভাবে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের গুরুত্ব সীমান্তের এপার-ওপার ছাপিয়ে যায়। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন প্রশ্নে রাখাইনে প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি, আর আরাকান আর্মির এই ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে। আগামী দিনে জান্তা সরকার বা আন্তর্জাতিক মহল এই পদক্ষেপে কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা নজরে রাখা জরুরি হবে। বাংলাদেশ সরকারকেও ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসন আলোচনায় কেন্দ্রীয় জান্তা সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে সম্পর্কের ধরন নতুন করে ভাবতে হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। সীমান্তের দুই পাশে ক্ষমতার বাস্তবতা যত বদলাচ্ছে, ততই ঢাকার নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি হয়ে উঠছে। স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো কতটা টেকসই হবে, তার ওপরও নির্ভর করছে দীর্ঘমেয়াদে রাখাইনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

পাঠ্যবই বদলে যাওয়াটা যতটা না ভাষার লড়াই, তার চেয়ে বেশি ক্ষমতার প্রশ্ন, আর রাখাইনে ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডই এখন বলে দিচ্ছে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে আলোচনার টেবিলে ভবিষ্যতে কার সঙ্গে বসতে হবে, তা নির্ধারণেও এই প্রশাসনিক বাস্তবতা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনা পণ্য কিনতে বিনিময় কৌশলে নিষেধাজ্ঞা এড়াচ্ছে ইরান

আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রাখাইন ভাষা পাঠ্যক্রম চালু

০২:১৯:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার স্কুলগুলোয় রাখাইন ভাষা পাঠ্যক্রম হিসেবে চালু করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা রাখাইন ভাষায় পাঠ নিতে পারছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে চলমান সংঘাত ও রোহিঙ্গা সংকটের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান গত নয় সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে বিষয়টি জানায়। এক স্থানীয় শিক্ষকের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ধীরে ধীরে অন্যান্য শ্রেণিতেও বর্মি ভাষার পরিবর্তে রাখাইন ভাষা পড়ানো হবে। দুই হাজার তেইশ সাল থেকে রাজ্যজুড়ে অভিযান চালিয়ে আরাকান আর্মি এখন সতেরোটি টাউনশিপের মধ্যে চৌদ্দটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। এই বিপুল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের কারণেই এখন তারা কেবল সামরিক নয়, শিক্ষা ও প্রশাসনের মতো নাগরিক পরিষেবাও নিজেদের মতো করে সাজাতে পারছে।

রাজ্যের রাজধানী সিটওয়ে এবং বন্দরনগরী কিয়াউকপিউর নিয়ন্ত্রণ ঘিরে দুই হাজার পঁচিশের ফেব্রুয়ারি থেকে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। চিন রাজ্যের পালেতোয়া শহরেও, যা আরাকান আর্মি দুই হাজার চব্বিশ সালে দখল করেছিল, এখন শিক্ষার্থীদের একই ভাষা-নীতির আওতায় আনা হচ্ছে। একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে শিক্ষাব্যবস্থার এমন রূপান্তর দেখায় যে তারা কেবল সামরিক নয়, প্রশাসনিক কর্তৃত্বও কতটা সুসংহত করে ফেলেছে। রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় সংহত করার এই প্রয়াস দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। শিক্ষা খাতে ইউনাইটেড লীগ অব আরাকানের তৎপরতা নতুন নয়। এর আগে সংগঠনটি নিজস্ব শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা চালু করে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে নিজেদের কাঠামোর আওতায় এনেছে। একই সঙ্গে মংডু এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলিম শিক্ষক নিয়োগেরও উদ্যোগ নিয়েছিল তারা, যদিও সেই উদ্যোগ ঘিরে স্থানীয় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মতভেদও রয়েছে। এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, আরাকান আর্মি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, একটি সমান্তরাল রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তোলার কাজেও এগিয়ে যাচ্ছে পরিকল্পিতভাবে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের গুরুত্ব সীমান্তের এপার-ওপার ছাপিয়ে যায়। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন প্রশ্নে রাখাইনে প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি, আর আরাকান আর্মির এই ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে। আগামী দিনে জান্তা সরকার বা আন্তর্জাতিক মহল এই পদক্ষেপে কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা নজরে রাখা জরুরি হবে। বাংলাদেশ সরকারকেও ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসন আলোচনায় কেন্দ্রীয় জান্তা সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে সম্পর্কের ধরন নতুন করে ভাবতে হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। সীমান্তের দুই পাশে ক্ষমতার বাস্তবতা যত বদলাচ্ছে, ততই ঢাকার নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি হয়ে উঠছে। স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো কতটা টেকসই হবে, তার ওপরও নির্ভর করছে দীর্ঘমেয়াদে রাখাইনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

পাঠ্যবই বদলে যাওয়াটা যতটা না ভাষার লড়াই, তার চেয়ে বেশি ক্ষমতার প্রশ্ন, আর রাখাইনে ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডই এখন বলে দিচ্ছে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে আলোচনার টেবিলে ভবিষ্যতে কার সঙ্গে বসতে হবে, তা নির্ধারণেও এই প্রশাসনিক বাস্তবতা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।