০৩:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চীনা পণ্য কিনতে বিনিময় কৌশলে নিষেধাজ্ঞা এড়াচ্ছে ইরান দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চিরকুট বিতর্কে চীন ফিলিপাইন শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরেও কাটছে না বাণিজ্য জট ট্রাম্প কিম চতুর্থ বৈঠক আয়োজনে মধ্যস্থতায় প্রস্তুত হলো চীন মিয়ানমারে টিন খনি চালু হলো জাতিসংঘ তদন্ত প্রত্যাখ্যান করল সরকার  হোয়াইট হাউসের সহকারীদের নগদ উপহার নিয়ে উঠল নৈতিকতার প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের দুই অংশের প্রতীক নিয়ে উপনির্বাচনে দ্বন্দ্ব  নেপালে বন্যা পুনর্গঠনে পাঁচশ কোটি ডলার সহায়তা চাইল সরকার এশিয়া কাপ সেমিফাইনালে আজ ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ নারী দল রিপাবলিকান জিতলে প্রতি আমেরিকানকে নগদ অর্থ দেবেন ট্রাম্প

 নেপালে বন্যা পুনর্গঠনে পাঁচশ কোটি ডলার সহায়তা চাইল সরকার

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার একশ চৌদ্দয় পৌঁছেছে, আর প্রায় চার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। সীমান্তের ওপারে চীনের অংশেও ষোলো জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং পাঁচশ ছেচল্লিশ জন নিখোঁজ। প্রাথমিক পুনর্গঠনের জন্য পাঁচশ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে নেপাল সরকার, আর এই আবেদনকে তারা জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রধান ধরমরাজ উপ্রেতি এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভয়াবহ দুর্যোগ বলে বর্ণনা করেছেন। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কর্তৃপক্ষের ভূতাত্ত্বিক প্রকাশ পোখরেল বলেছেন, নেপালের মতো দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে তেমন অবদান না রাখলেও এমন ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। এই যুক্তির ভিত্তিতেই বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূতাবাসগুলোর কাছে সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জাতিসংঘে চব্বিশ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেওয়ার আগেই এই আন্তর্জাতিক তদবির শুরু করেছেন।

উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশের একুশ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। বিভিন্ন জেলায় অন্তত চার হাজার সত্তর জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহ জানিয়েছেন, উদ্ধার ও ত্রাণ পর্ব পেরিয়ে সরকার এখন পুনর্বাসনের দিকে এগোচ্ছে। এ পর্যন্ত পুনর্গঠনের জন্য দেশীয়ভাবে প্রায় একশ কোটি নেপালি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আবেদনের তুলনায় সামান্য অংশমাত্র এবং দুর্গম পার্বত্য এলাকার পুরো পুনর্গঠনের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলায় হেলিকপ্টার ও স্থল জরিপে অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ধরা পড়েছে। অন্তত আটচল্লিশটি ঝুলন্ত সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে আটাশটি সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করতে হবে, ফলে দুর্গম পাহাড়ি জনপদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, কেননা সড়ক ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় প্রচলিত উপায়ে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পঁচাত্তর নাগরিকের খোঁজ মেলেনি বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যাদের মধ্যে ষোলো জনকে ইতিমধ্যে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। দুর্যোগের ব্যাপ্তি বোঝাতে গিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, একই সময়ে দেশের ভেতরে ও সীমান্তের ওপারে দুই দিক থেকেই উদ্ধার তৎপরতা সমন্বয় করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কেননা ধ্বংসস্তূপের বিস্তৃতি দুই দেশের প্রশাসনিক সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

চীনের সঙ্গে নেপালের প্রধান স্থলবাণিজ্য পথও এই বন্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভারতনির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নতুন করে ধাক্কা খেয়েছে কাঠমান্ডুর জন্য। বাংলাদেশও একাধিকবার প্রতিবেশী দেশের নদী থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢলের শিকার হয়েছে, তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু-ক্ষতিপূরণ তহবিলে নেপালের এই তদবির কতটা সাড়া পায়, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও নজির হয়ে উঠতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনে যাদের দায় সবচেয়ে কম, বিপর্যয়ের মাত্রা তাদের জন্যই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে বারবার, আর নেপালের এই আন্তর্জাতিক তদবিল সেই পুরনো বৈষম্যের প্রশ্নকেই নতুন করে বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরল। পুনর্গঠনের অর্থ ঠিক কতটা আসে, তার ওপরই নির্ভর করছে দুর্গম পার্বত্য জনপদের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার গতি।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনা পণ্য কিনতে বিনিময় কৌশলে নিষেধাজ্ঞা এড়াচ্ছে ইরান

 নেপালে বন্যা পুনর্গঠনে পাঁচশ কোটি ডলার সহায়তা চাইল সরকার

০২:৪৮:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার একশ চৌদ্দয় পৌঁছেছে, আর প্রায় চার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। সীমান্তের ওপারে চীনের অংশেও ষোলো জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং পাঁচশ ছেচল্লিশ জন নিখোঁজ। প্রাথমিক পুনর্গঠনের জন্য পাঁচশ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে নেপাল সরকার, আর এই আবেদনকে তারা জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রধান ধরমরাজ উপ্রেতি এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভয়াবহ দুর্যোগ বলে বর্ণনা করেছেন। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কর্তৃপক্ষের ভূতাত্ত্বিক প্রকাশ পোখরেল বলেছেন, নেপালের মতো দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে তেমন অবদান না রাখলেও এমন ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। এই যুক্তির ভিত্তিতেই বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূতাবাসগুলোর কাছে সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জাতিসংঘে চব্বিশ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেওয়ার আগেই এই আন্তর্জাতিক তদবির শুরু করেছেন।

উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশের একুশ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। বিভিন্ন জেলায় অন্তত চার হাজার সত্তর জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহ জানিয়েছেন, উদ্ধার ও ত্রাণ পর্ব পেরিয়ে সরকার এখন পুনর্বাসনের দিকে এগোচ্ছে। এ পর্যন্ত পুনর্গঠনের জন্য দেশীয়ভাবে প্রায় একশ কোটি নেপালি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আবেদনের তুলনায় সামান্য অংশমাত্র এবং দুর্গম পার্বত্য এলাকার পুরো পুনর্গঠনের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলায় হেলিকপ্টার ও স্থল জরিপে অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ধরা পড়েছে। অন্তত আটচল্লিশটি ঝুলন্ত সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে আটাশটি সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করতে হবে, ফলে দুর্গম পাহাড়ি জনপদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, কেননা সড়ক ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় প্রচলিত উপায়ে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পঁচাত্তর নাগরিকের খোঁজ মেলেনি বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যাদের মধ্যে ষোলো জনকে ইতিমধ্যে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। দুর্যোগের ব্যাপ্তি বোঝাতে গিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, একই সময়ে দেশের ভেতরে ও সীমান্তের ওপারে দুই দিক থেকেই উদ্ধার তৎপরতা সমন্বয় করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কেননা ধ্বংসস্তূপের বিস্তৃতি দুই দেশের প্রশাসনিক সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

চীনের সঙ্গে নেপালের প্রধান স্থলবাণিজ্য পথও এই বন্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভারতনির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নতুন করে ধাক্কা খেয়েছে কাঠমান্ডুর জন্য। বাংলাদেশও একাধিকবার প্রতিবেশী দেশের নদী থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢলের শিকার হয়েছে, তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু-ক্ষতিপূরণ তহবিলে নেপালের এই তদবির কতটা সাড়া পায়, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও নজির হয়ে উঠতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনে যাদের দায় সবচেয়ে কম, বিপর্যয়ের মাত্রা তাদের জন্যই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে বারবার, আর নেপালের এই আন্তর্জাতিক তদবিল সেই পুরনো বৈষম্যের প্রশ্নকেই নতুন করে বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরল। পুনর্গঠনের অর্থ ঠিক কতটা আসে, তার ওপরই নির্ভর করছে দুর্গম পার্বত্য জনপদের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার গতি।