আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীন থেকে কয়েকশ কোটি ডলারের পণ্য কিনতে একটি বিনিময়ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করছে ইরান বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। জ্বালানি তেল রপ্তানির বিপরীতে সরাসরি নগদ লেনদেনের বদলে ঋণ-সুবিধা ব্যবহার করে এই কৌশলে প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চুহাই চেনরং এবং তুলনামূলক অপরিচিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান চুশিনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এই ব্যবস্থা, যেখানে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক প্রতিষ্ঠান আমদানি অর্থ পরিশোধ তদারক করে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বলে সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে। গত এক বছরে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দুইশ কোটি থেকে আড়াইশ কোটি ডলার সমমূল্যের লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান ওষুধ, কোভিড টিকা, যানবাহন, যোগাযোগ সরঞ্জামের পাশাপাশি কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামও সংগ্রহ করেছে, যা গত এক বছরে অন্তত একবার ব্যবহারও করা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। দুই হাজার একুশ সাল থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেও প্রাথমিকভাবে এটি মূলত চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহেই সীমাবদ্ধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কঠোরতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়ায় ধীরে ধীরে এই বিনিময় ব্যবস্থার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, তারা স্বাধীনভাবে এই লেনদেনগুলো যাচাই করতে পারেনি এবং চীনা কোম্পানির নিবন্ধন তালিকায় চুশিন নামের প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বও খুঁজে পায়নি, ফলে পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে গিয়ে এমন জটিল বিনিময় কাঠামো তৈরি করার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের আইনি ঝুঁকি এড়ানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা, যদিও এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই থাকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর এমন জটিল আর্থিক কাঠামো বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কতটা গভীর, তা সামনে আনে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা, কেননা আন্তর্জাতিক লেনদেনে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে তা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য
নিষেধাজ্ঞা যতই কঠোর হোক, অর্থ ও পণ্যের প্রবাহ থামাতে তা সবসময় যথেষ্ট নয়, বরং নতুন নতুন কৌশলে সেই প্রবাহ ঠিকই পথ খুঁজে নেয়। ইরান-চীন এই বিনিময় ব্যবস্থা তারই সাম্প্রতিক এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের বিনিময় কাঠামো শনাক্ত করে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে বিষয়টি সামনে আসায় ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা-প্রয়োগ সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চীনা কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এখনো এই প্রতিবেদনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি, ফলে অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অনুসন্ধানের পর্যায়েই
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















