২৬ আগস্ট ২০২৬ নেপালের ভোতে কোশি–ত্রিশূলী অঞ্চলে যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা শুধু একটি মানবিক দুর্যোগ নয়; এটি দেশটির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও বসতি পরিকল্পনা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে। বহু প্রাণহানি, নিখোঁজ মানুষ, ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি এবং বিপর্যস্ত সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর পর নেপালের সামনে এখন জরুরি একটি সিদ্ধান্ত—ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্থাপনাগুলো কি আগের জায়গাতেই আবার তৈরি করা হবে, নাকি এই সুযোগে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির কাঠামোই বদলে ফেলা হবে?
কেশভ ভট্টরাই ও আম্বিকা পি. অধিকারীর বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, পুনর্গঠনকে শুধু আগের অবস্থায় ফেরার প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ, টেকসই ও উৎপাদনশীল বসতি গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যেতে হবে।
এই বিপর্যয়ের প্রকৃতি বোঝাও জরুরি। প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বরফ, শিলা, ভূমিধস, নদীর প্রবাহ ও পলির সম্মিলিত প্রভাবে একটি ধারাবাহিক বিপর্যয় তৈরি হওয়ার কথা উঠে এসেছে। ফলে এটিকে শুধু প্রচলিত বন্যা হিসেবে দেখলে ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা ধরা পড়বে না। হিমালয়ের পরিবেশ বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বসতি ও অবকাঠামো পরিকল্পনার পুরোনো ধারণাগুলোও বদলানো প্রয়োজন।
দুর্যোগের মানবিক মূল্যই প্রথম সত্য
৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫৫ এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ ছিল। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ, কাদা, ভবন ও জলবিদ্যুৎ স্থাপনার ভেতর থেকে মানুষ উদ্ধারে কাজ করছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে হাজার হাজার শিশু নিরাপদ পানি ও শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছে; বহু স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবারের গল্প। একটি বাড়ি হারানো মানে শুধু একটি ভবন হারানো নয়—এর সঙ্গে হারিয়ে যায় সঞ্চয়, স্মৃতি, জমির অধিকার, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।
তাই পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা। দ্রুত ঘর তুলে দেওয়ার নামে মানুষকে আবার একই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়।

একই বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি সতর্কবার্তা দিচ্ছে
২০২৫ সালের জুলাইয়ে একই সীমান্তবর্তী নদী ব্যবস্থায় বন্যায় সড়ক, সেতু, শুল্ক অবকাঠামো, যানবাহন ও জলবিদ্যুৎ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পুনর্গঠনের পরও মাত্র প্রায় ১৪ মাসের মধ্যে বৃহত্তর অঞ্চলে আবার ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে।
এই ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিলে ঝুঁকি দূর হয় না।
একটি সড়ক যদি বারবার একই বন্যায় অচল হয়, একটি সেতু যদি বারবার ধ্বংস হয় কিংবা কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্প একই ধরনের প্রাকৃতিক বিপদের মুখে পড়ে, তাহলে তার নির্মাণব্যয়কে শুধু বর্তমান প্রকল্পের খরচ দিয়ে বিচার করা যায় না। বারবার মেরামত, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, মানুষের চলাচল বন্ধ হওয়া এবং জরুরি সেবা বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থনৈতিক ক্ষতিও হিসাব করতে হবে।
সুতরাং পুনর্গঠনের অর্থনীতি হওয়া উচিত ‘আজ কত খরচ’ নয়, বরং ‘আগামী কয়েক দশকে কত ক্ষতি এড়ানো যাবে’—এই প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে।
ঝুঁকির মানচিত্র ছাড়া উন্নয়ন নয়
নেপালের জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজন একটি জাতীয় ঝুঁকি-ভিত্তিক বসতি পরিকল্পনা। কোন জমিতে বসতি করা যাবে, কোথায় কঠোর শর্তে নির্মাণ করা যাবে এবং কোন এলাকায় স্থায়ী নির্মাণ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত—এসব সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নিতে হবে।
এ জন্য একটি জাতীয় স্মার্ট বসতি মানচিত্রভাণ্ডার তৈরি করা যেতে পারে। এতে শুধু জমির অবস্থান বা মালিকানার তথ্য থাকবে না। নদী, বন্যার গতিপথ, ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ, ভূমিকম্প, পাহাড়ের ঢাল, পানির উৎস, হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ, বন, জীববৈচিত্র্য, সড়ক, স্কুল, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জনসংখ্যার ঝুঁকির তথ্য একসঙ্গে থাকতে হবে।
এমন একটি ব্যবস্থা মানুষকে জমি কেনা বা বাড়ি নির্মাণের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানাবে। একই তথ্য ব্যবহার করতে পারবে স্থানীয় সরকার, প্রকৌশলী, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরাও।
আর এই তথ্য স্থির থাকবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পাহাড়ের ভৌগোলিক ও জলবিদ্যাগত পরিস্থিতিও বদলাচ্ছে। তাই ঝুঁকি মানচিত্রকে নিয়মিত হালনাগাদ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
হিমালয়ের ঝুঁকি বদলে যাচ্ছে
নেপাল এমন একটি অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণ করছে যেখানে তাপমাত্রা, তুষার, হিমবাহ, ভূগর্ভস্থ বরফস্তর ও নদীপ্রবাহের স্বাভাবিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণায়নের প্রবণতা এবং হিমবাহের দ্রুত ভর হারানোর তথ্য ইতোমধ্যে এই পরিবর্তনের ব্যাপ্তি দেখিয়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বরফের ওপর পড়ে না। পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হতে পারে, নদীর প্রবাহের চরিত্র বদলাতে পারে, নতুন জলাধার তৈরি হতে পারে এবং পুরোনো জলাধার দ্রুত পানি ছাড়তে পারে। একটি হিমবাহ-ধসের সঙ্গে ভূমিধস বা ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ যুক্ত হলে বিপর্যয়ের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ কারণে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার বাইরে আরও বিস্তৃত একটি বহু-ঝুঁকির কাঠামোতে চিন্তা করা প্রয়োজন।
৪৭টি বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ শুধু একটি সংখ্যা নয়
নেপাল, চীন ও ভারতের প্রধান হিমবাহ-অববাহিকাগুলোতে হাজার হাজার হিমবাহ-হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। অধিকাংশই কোশি অববাহিকায়।
এর অর্থ এই নয় যে ৪৭টি হ্রদ থেকে ৪৭টি বন্যা আসন্ন। বরং এসব হ্রদকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যবেক্ষণ, সতর্কতা ও ঝুঁকি হ্রাসের ব্যবস্থা নিতে হবে।
আর ঝুঁকির তালিকায় শুধু হিমবাহ-হ্রদ থাকবে না। অস্থিতিশীল হিমবাহ, বরফ-শিলা ঢাল, ভূমিধস-সৃষ্ট বাঁধ, ছোট পাহাড়ি হ্রদ এবং দ্রুত পরিবর্তিত নদীখাতও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
পরিকল্পনার একক হওয়া উচিত পুরো নদী অববাহিকা। একটি হ্রদ কোথায় অবস্থিত তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেটি ভেঙে গেলে পানি ও ধ্বংসাবশেষ কোন পথে কত দ্রুত নিচে নামবে এবং পথে কী কী স্থাপনা পড়বে।
পুনর্বাসন হবে, কিন্তু মানুষের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত কিছু পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়তো অনিবার্য হতে পারে। কিন্তু এটিকে প্রশাসনিক নির্দেশে মানুষের জায়গা বদলের সহজ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যাবে না।
দুর্যোগে বাড়ি ধ্বংস হয়েছে মানেই জমির মালিকানা শেষ হয়ে যায় না। মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলেই তার জমি পরিত্যক্ত হয়ে যায় না। পুনর্বাসনের ভিত্তি হতে হবে সম্মতি, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, নিরাপদ আবাসন, জীবিকার পুনর্বিন্যাস এবং সামাজিক মর্যাদা।
পরিবারগুলোকে একটি মাত্র বিকল্প না দিয়ে একাধিক সুযোগ দেওয়া যেতে পারে—নিরাপদ জমির বিনিময়ে জমি, প্রস্তুত বাড়ি, সমবায়ী আবাসন, আবাসন ভাউচার, নগদ সহায়তা কিংবা ভূমি-পুলিংয়ের অংশীদারিত্ব।

কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো জমির মালিকানা বজায় রেখে সেখানে স্থায়ী নির্মাণ নিষিদ্ধ করা সম্ভব। সেই জমি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, সবুজ এলাকা, উন্মুক্ত স্থান বা পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন বসতি যেন মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে পরিবারকে সরিয়ে দিলে তারা আবার পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফিরে যেতে পারে।
নতুন বসতি হবে নিরাপদ, কিন্তু জীবন্তও
নেপালের পাহাড় খালি করার কোনো প্রয়োজন নেই। পাহাড়ি বসতি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রয়োজন হলো পাহাড়ে কোথায় এবং কীভাবে বসতি গড়ে উঠবে, সে বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।
একটি পাহাড়ি শহরকে সমতলের ছোট সংস্করণ হিসেবে পরিকল্পনা করলে চলবে না। পানি, ঢাল, রাস্তা, তুষার, হিমবাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় পরিবেশের নিজস্ব সীমা রয়েছে।
আবার শুধু বেশি উচ্চতায় উঠে গেলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কোনো নদী-তীরবর্তী সমতল জমি বন্যায় বিপজ্জনক হতে পারে, কোনো ঢাল ভূমিধসে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, আবার কোনো স্থিতিশীল শিলাস্তরের ওপরের এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে।
তাই নতুন বসতির আগে ভূ-আকৃতি, মাটির স্থিতিশীলতা, বন্যার গভীরতা ও গতি, ধ্বংসাবশেষের সম্ভাব্য গতিপথ, ভূমিকম্প, পানির উৎস এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা যাচাই করতে হবে।
‘আগে পানি, পরে প্লট’ হওয়া উচিত নীতি
নতুন বসতি পরিকল্পনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার। জমি ভাগ করে খণ্ড তৈরি করার পর পানি, পয়োনিষ্কাশন ও অন্যান্য সেবা খোঁজা যাবে না।
প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে পানির নিরাপত্তা।
একটি নতুন বসতি শুষ্ক মৌসুমে কত পানি পাবে, তার উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, পানি সংরক্ষণ ও পরিশোধনের ব্যবস্থা কী, পয়োনিষ্কাশন কীভাবে হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত খণ্ড অনুমোদন করা উচিত নয়।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাধার, জলাভূমি, নদীর স্বাভাবিক জায়গা এবং ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের অঞ্চলকে বসতির অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
প্রকৃতিকে উন্নয়নের শত্রু ভাবার সময় শেষ
বন্যা মোকাবিলায় নদীর পাশে কংক্রিটের দেয়াল বানানোই একমাত্র সমাধান নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জায়গা, জলাভূমি, বন, উন্মুক্ত মাঠ, প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের অঞ্চলও একটি বসতির নিরাপত্তা অবকাঠামো।
রাস্তা বা নদীর পাশে দীর্ঘ ফিতার মতো ছড়িয়ে থাকা বসতি ঝুঁকি বাড়ায় এবং একই সঙ্গে সড়ক, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের ব্যয়ও বাড়ায়। এর পরিবর্তে স্থিতিশীল জমিতে তুলনামূলক ঘন, হাঁটাচলাযোগ্য ও সেবাভিত্তিক বসতি তৈরি করা অধিক কার্যকর।
প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা করলে একই জমি নিরাপত্তা, পরিবেশ, বিনোদন ও জীবিকার কাজে ব্যবহার করা যায়।

স্মার্ট বসতি শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়
স্মার্ট শহর বা স্মার্ট বসতি বললেই প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর কথা মনে করা হয়। কিন্তু নেপালের ক্ষেত্রে স্মার্টনেসের মাপকাঠি হওয়া উচিত মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার সক্ষমতা।
একটি স্মার্ট বসতিতে আগাম সতর্কতা থাকবে, কিন্তু সতর্কতার পর কোথায় যেতে হবে তারও ব্যবস্থা থাকবে। বিদ্যুৎ থাকবে, কিন্তু বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে। রাস্তা থাকবে, কিন্তু একটি সেতু ভেঙে গেলে বিকল্প পথও থাকবে।
স্কুল, হাসপাতাল ও জরুরি স্থাপনাগুলোকে সাধারণ ভবনের মতো করে নির্মাণ করা যাবে না। তাদের পানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও প্রবেশপথের বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে হবে।
নির্মাণেও স্থানীয় জ্ঞানকে আধুনিক প্রকৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। নেপালের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে স্থানীয় জলবায়ু, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও উপকরণের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বহু অভিজ্ঞতা রয়েছে। আধুনিক ভূমিকম্প, অগ্নি, আর্দ্রতা ও কাঠামোগত নিরাপত্তার সঙ্গে সেই জ্ঞানকে যুক্ত করা যেতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তাকেও বসতি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে
দুর্যোগে যখন সড়ক বন্ধ হয়ে যায়, তখন খাদ্য সরবরাহও বিপর্যস্ত হয়। দূরবর্তী বাজারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল বসতি তাই দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি স্থিতিশীল নয়।
নতুন বসতিতে কৃষিজমি রক্ষা, পারিবারিক ও সামাজিক বাগান, সবুজঘর, ফলের বাগান, কৃষিবনায়ন, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং শীতল সংরক্ষণাগারের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।
এতে স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।
তবে স্থানীয় উৎপাদনকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কীটপতঙ্গ, উদ্ভিদরোগ ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষাগার, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পণ্যের গতিপথ অনুসরণ, নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার এবং বাজার পর্যন্ত শীতল সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন।
রেমিট্যান্স হতে পারে পুনর্গঠনের শক্তি
নেপালের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৩ সালে প্রবাসী আয় দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান ছিল। নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাবেও এর বিশাল অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট।
কিন্তু যদি প্রবাসী আয় মূলত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়ি নির্মাণে ব্যয় হয়, তাহলে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ও অনিচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
এখানে সরকারের ভূমিকা মানুষের ব্যক্তিগত অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং নিরাপদ ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।
নিরাপদ আবাসন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, ডিজিটাল সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় ব্যবসায় প্রবাসী আয় বিনিয়োগের জন্য বিশেষ আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
ফিরে আসা অভিবাসীদের জন্য উদ্যোক্তা তহবিলও গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে বিদেশ থেকে আসা অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল মূলধনে পরিণত হবে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি দরকার
নেপালের মতো দেশের পক্ষে এত বড় পুনর্গঠন শুধু রাষ্ট্রীয় বাজেট দিয়ে করা কঠিন। বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন, জলবায়ু তহবিল, প্রবাসী বন্ড, ভূমি-পুলিং, বেসরকারি আবাসন অর্থায়ন, বিমা ও অন্যান্য ঝুঁকি-অর্থায়ন ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
তবে একটি শর্ত অবশ্যই থাকতে হবে—সরকারি অর্থ যেন বারবার একই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে একই ধরনের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে ব্যয় না হয়।
নিরাপদ বসতি গড়ে তুলতে যে সরকারি বিনিয়োগে জমির মূল্য বাড়বে, তার একটি অংশ জনসেবা উন্নয়নে ফেরত আনার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিমা ও ঋণের শর্তে ঝুঁকি-মানচিত্রের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
নদী অববাহিকা অনুযায়ী পরিকল্পনা, প্রশাসন অনুযায়ী বাস্তবায়ন
নদী ও পাহাড় প্রশাসনিক সীমানা মানে না। তাই পরিকল্পনায় নদী অববাহিকা ও পরিবেশগত অঞ্চলকে গুরুত্ব দিতে হবে, যদিও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে।
কেন্দ্রীয় সরকার ঝুঁকি-তথ্যের মানদণ্ড, জাতীয় নির্মাণ ও পুনর্বাসন নীতি এবং বড় অর্থায়নের দায়িত্ব নিতে পারে। প্রাদেশিক সরকার বৃহত্তর অবকাঠামো ও বসতি গুচ্ছের সমন্বয় করবে। স্থানীয় সরকার ভূমি শ্রেণিবিন্যাস, নির্মাণ অনুমোদন ও স্থানীয় সেবা পরিচালনা করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই ব্যবস্থার স্থায়ী অংশীদার করতে হবে। হিমবাহ বিজ্ঞান থেকে ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা, নদী প্রকৌশল থেকে জনস্বাস্থ্য—গবেষণার ফল যেন সরাসরি নীতিনির্ধারণে পৌঁছায়।
সীমান্ত পেরিয়ে সহযোগিতা এখন অপরিহার্য
হিমালয়ের ঝুঁকি একটি দেশের সীমানায় থেমে থাকে না। তাই নেপাল, চীন ও ভারতের মধ্যে হিমবাহ, নদী, আবহাওয়া, ভূমিকম্প, নতুন জলাধার ও ভূমিধসের তথ্য দ্রুত বিনিময়ের কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন।
উপগ্রহ ও ভূমিভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে সমন্বিত করা গেলে বিপজ্জনক পরিবর্তন অনেক আগে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
এটি শুধু একটি দেশ থেকে আরেক দেশকে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা হওয়া উচিত নয়। বরং একই বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক আঞ্চলিক ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ কাঠামো গড়ে তোলা দরকার।
কারণ পাহাড়ের বিপদ সীমান্তের কাঁটাতারে থেমে থাকে না।
নেপালের সামনে এখন যে সিদ্ধান্ত
ভোতে কোশি–ত্রিশূলীর বিপর্যয়কে কোনোভাবেই একটি ‘সুযোগ’ হিসেবে রোমান্টিক করে দেখা উচিত নয়। যে পরিবার স্বজন হারিয়েছে, ঘর হারিয়েছে বা এখনও নিখোঁজ প্রিয়জনের অপেক্ষায় আছে, তাদের কাছে এটি নিঃসন্দেহে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।
তবে পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো একটি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
নেপাল চাইলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে গতকালের অবকাঠামোকে আবার দাঁড় করাতে পারে। অথবা সেই অর্থকে ব্যবহার করতে পারে আগামী দিনের ঝুঁকি কমানোর জন্য।
দ্বিতীয় পথটি কঠিন। কিন্তু সেটিই অধিক দূরদর্শী।
পুনর্গঠনের সাফল্য শুধু কতটি বাড়ি তৈরি হলো, কত কিলোমিটার রাস্তা হলো বা কত টাকা খরচ হলো—এ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, ভবিষ্যতের কতটা ক্ষতি এড়ানো গেল।
নেপাল ভূমিকম্প বন্ধ করতে পারবে না। হিমবাহের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারবে না। পাহাড়ি নদীর মৌসুমি শক্তিও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষ কোথায় বসবাস করবে, কোথায় স্কুল ও হাসপাতাল তৈরি হবে, রাস্তা কোন পথে যাবে, নদীকে কতটা জায়গা দেওয়া হবে, দুর্যোগের সতর্কবার্তা কীভাবে পৌঁছাবে এবং সরকারি অর্থ বারবার ঝুঁকি মেরামতে যাবে নাকি ঝুঁকি কমাতে—এসব সিদ্ধান্ত নেপালের নিজের হাতে।
সত্যিকারের স্মার্ট বসতি তাই কোনো প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়। এটি এমন এক দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চুক্তি, যেখানে মানুষের নিরাপত্তা, ভূগোল, পরিবেশ, অর্থনীতি, অবকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা একই পরিকল্পনার অংশ।
কেশভ ভট্টরাই ও আম্বিকা পি. অধিকারীর প্রস্তাবিত দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই: দুর্যোগের পর শুধু পুনর্গঠন নয়, প্রয়োজন নতুনভাবে নির্মাণ—যাতে আগামী বিপর্যয়ের ক্ষতি কমে এবং উন্নয়ন মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
২০২৬ সালের ধ্বংসযজ্ঞ নেপালের জন্য অতীত ফিরিয়ে আনার পরীক্ষা নয়; বরং ভবিষ্যৎকে কতটা নিরাপদ করে গড়া যায়, তার পরীক্ষা।
কেশভ ভট্টরাই ও আম্বিকা পি. অধিকারী 


















