২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। কিন্তু এক শতাব্দীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই হামলার ক্ষত এখনো শুকায়নি। বিশেষ করে হামলার পর উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে ছুটে যাওয়া প্রথম সাড়ির উদ্ধারকর্মীদের অনেকেই আজও এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করছেন।
নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপে হামলার পরপরই পুলিশ, দমকলকর্মী, জরুরি চিকিৎসাকর্মী, উদ্ধারকর্মী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ছুটে গিয়েছিলেন মানুষের জীবন বাঁচাতে। তখন তাদের সামনে ছিল ধ্বংসস্তূপ, ধোঁয়া, আগুন ও বিপুল পরিমাণ ধুলাবালি। কিন্তু সেই সময়ের ভয়াবহ পরিবেশ যে তাদের শরীরে বহু বছর ধরে গভীর প্রভাব ফেলবে, তা অনেকেই তখন বুঝতে পারেননি।
গ্রাউন্ড জিরোতে কাজ করার সময় বাতাসে ছড়িয়ে থাকা ধুলা, ধোঁয়া ও বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে আসেন অসংখ্য উদ্ধারকর্মী। সময়ের সঙ্গে তাদের অনেকের শরীরে দেখা দিতে থাকে গুরুতর নানা রোগ। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারসহ এমন কিছু অসুস্থতা রয়েছে, যা তাদের ৯/১১-পরবর্তী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত হচ্ছে।
হামলার দিন যারা মানুষের জীবন রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের অনেকেই এরপর দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নিয়েছেন। কেউ কেউ কাজ চালিয়ে গেছেন অসুস্থ শরীর নিয়েই। আবার অনেকে সেই ২৫তম বার্ষিকী পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারেননি।
৯/১১-এর তাৎক্ষণিক প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ভয়াবহ। তবে সময় যত গড়িয়েছে, সেই হামলার আরেকটি দীর্ঘ মৃত্যুর হিসাবও সামনে এসেছে। হামলার দিন যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের একটি অংশ পরবর্তী বছরগুলোতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। ফলে ৯/১১-এর মানবিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শুধু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে এ কারণে ৯/১১ এখন শুধু একটি ঐতিহাসিক সন্ত্রাসী হামলার নাম নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সংকটেরও প্রতীক। যারা উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের জন্য সেই দিনের ঘটনা শেষ হয়নি। বহু মানুষের ক্ষেত্রে ধ্বংসস্তূপের সেই কাজের প্রভাব তাদের শরীরে ও জীবনে বছরের পর বছর ধরে থেকে গেছে।
প্রতি বছর ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার নিহতদের স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে স্মরণ করা হয় সেই সব উদ্ধারকর্মীকেও, যারা বিপদের তোয়াক্কা না করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু ২৫ বছর পরও তাদের একটি অংশের মৃত্যু ও অসুস্থতার খবর মনে করিয়ে দিচ্ছে—৯/১১-এর ক্ষত শুধু স্মৃতিতে নয়, মানুষের শরীরেও রয়ে গেছে।
রয়টার্সের ভিডিও সাংবাদিক এরিকা স্ট্যাপলটন এই দীর্ঘমেয়াদি মৃত্যুর মিছিল এবং ৯/১১-এর প্রথম সাড়ির উদ্ধারকর্মীদের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরেছেন।
দীর্ঘস্থায়ী এক মানবিক ট্র্যাজেডি
৯/১১ হামলার পর উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া মানুষদের অনেকেই সেই সময় নিজেদের দায়িত্ব হিসেবেই কাজটি করেছিলেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষ খোঁজা, আহতদের উদ্ধার করা এবং নিখোঁজদের সন্ধান করা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বছরের পর বছর পর সেই একই মানুষদের অনেককে দেখা গেছে ক্যানসার ও অন্যান্য ভয়াবহ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে।
এ কারণে ৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকীতে শুধু হামলার দিনটির স্মৃতি নয়, পরবর্তী ২৫ বছরের স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও আলোচনায় আসছে। হামলার পর যারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকের জীবন যে দীর্ঘ সময় ধরে সেই দিনের ছায়ায় আটকে রয়েছে, সেটিই এখন এই ঘটনার অন্যতম বেদনাদায়ক দিক।
৯/১১-এর তাৎক্ষণিক ধ্বংস একসময় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দৃশ্যমানভাবে মুছে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপে কাজ করা মানুষের শরীরে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তার অনেকগুলো আজও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। কেউ চিকিৎসাধীন, কেউ পরিবারকে রেখে চলে গেছেন, আবার কেউ এখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
২৫ বছর পর তাই ৯/১১-এর মৃত্যুর হিসাবকে শুধু একটি দিনের পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। হামলার পর শুরু হওয়া দীর্ঘ স্বাস্থ্য সংকটও সেই মৃত্যুর মিছিলের অংশ। আর সেই কারণেই ২০০১ সালের সেই দিনটি পেরিয়ে গেলেও এর প্রভাব এখনো শেষ হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















