জনপ্রিয় আর্থিক বিষয়বিষয়ক নির্মাতা ভিভিয়ান টু এবার তাঁর পরিচিত ‘ইয়োর রিচ বাফ’ ভাবমূর্তিকে নিয়ে হাজির হয়েছেন নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আর্থিক পরামর্শের অ্যাপে। বুধবার পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে আইফোনের জন্য চালু হয়েছে ‘আস্ক ডলি’। অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী বাজারসংক্রান্ত খবর, অর্থনৈতিক তথ্য ও আর্থিক পরামর্শ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি।
পরিচিত ভাষায় আর্থিক পরামর্শ
ভিভিয়ান টুর দাবি, প্রচলিত আর্থিক অ্যাপগুলোর তুলনায় তাঁর উদ্যোগের বড় পার্থক্য হলো উপস্থাপনার ধরন। জটিল আর্থিক বিষয়কে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ও কথোপকথনের মতো ভাষায় তুলে ধরাই এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অ্যাপের একটি অংশে ঋণের খরচ বোঝাতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার পরিবর্তন করলে বন্ধকী ঋণ, ঋণ কার্ড ও সঞ্চয়ী হিসাব—সবকিছুর ওপরই তার প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ কঠিন আর্থিক বিষয়কে সহজ ও পরিচিত শব্দে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ভিভিয়ান টু বলেন, তাঁর লক্ষ্য হলো আর্থিক পরামর্শকে যেন কেবল উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ মনে না হয়। বরং সাধারণ মানুষও যেন সহজে নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
মাসিক সাবস্ক্রিপশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানব পরামর্শ
‘আস্ক ডলি’-তে দুটি ধরনের সদস্যপদ রাখা হয়েছে। মাসে ১৯ ডলারের সদস্যপদে ব্যবহারকারীরা ‘পকেট ডলি’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আর্থিক সহকারীর সঙ্গে সীমাহীন কথোপকথনের সুযোগ পাবেন। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ব্যয়ের পরামর্শ এবং অর্থনৈতিক খবরও থাকবে।
আর মাসে ৫৯ ডলারের উচ্চতর সদস্যপদে প্রতি মাসে তিনবার প্রত্যয়িত আর্থিক পরিকল্পনাবিদের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শের সুযোগ থাকবে। নতুন সুবিধাগুলোও আগে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন এই সদস্যরা।
অ্যাপটি অবশ্য ব্যবহারকারীদের অর্থ নিজে সংরক্ষণ বা পরিচালনা করবে না।
ব্যবসার আয় আসবে যেভাবে
সদস্যপদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং পণ্য বা সেবার সুপারিশ থেকে কমিশনের মাধ্যমেও আয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অংশীদারত্বগুলো আর্থিক পরিকল্পনাবিদদের মাধ্যমে যাচাই করা হবে এবং ব্যবহারকারীদের কাছে সেগুলো প্রকাশ করা হবে।
ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার বাজারে অবশ্য প্রতিযোগিতা কম নয়। বিভিন্ন আর্থিক পরামর্শ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা অ্যাপের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় বিনিয়োগ পরামর্শসেবা এবং বড় ব্যাংকগুলোর নিজস্ব বিনামূল্যের আর্থিক পরিকল্পনা সুবিধাও রয়েছে।
ভিভিয়ান টুর বিশাল অনুসারীভিত্তি
৩২ বছর বয়সী ভিভিয়ান টু আগে ওয়াল স্ট্রিটে ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্থিক বিষয় নিয়ে পরামর্শ দিতে শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীর সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। রয়েছে একটি পডকাস্ট ও দুটি বই।
তাঁর প্রথম বই অবলম্বনে একটি ধারাবাহিক নির্মাণের কাজও চলছে। টুর দাবি, গত ১২ মাসে তাঁর প্রতিষ্ঠানের আয় হয়েছে ৮২ লাখ ডলার এবং প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠানে ছয়জন পূর্ণকালীন কর্মী ও আটজন খণ্ডকালীন কর্মী কাজ করছেন।
ব্যক্তিগত পরিস্থিতিকেও গুরুত্ব দিতে চান টু
ভিভিয়ান টুর মতে, আর্থিক পরিকল্পনা শুধু আয়, ব্যয় ও সঞ্চয়ের হিসাব নয়। একজন মানুষের পারিবারিক দায়িত্ব, উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও এতে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি এমন এক ব্যবহারকারীর উদাহরণ দিয়েছেন, যিনি কাগজে-কলমে আর্থিকভাবে বেশ ভালো অবস্থায় থাকলেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভাই বা বোনের ভবিষ্যৎ ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। সেই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর আর্থিক পরিকল্পনায় অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজনীয়তা যুক্ত করা হয়েছিল।
টুর ভাষায়, এ ধরনের সূক্ষ্ম ব্যক্তিগত বিষয়ই তিনি প্রচলিত আর্থিক পরামর্শের বাইরে নিয়ে আসতে চান।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজন কতটা
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন প্রজন্মের মানুষ আর্থিক পরামর্শের জন্য একই সঙ্গে পেশাদার, বাবা-মা, বন্ধু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করার প্রবণতা দেখাচ্ছে। ফলে এক জায়গায় বিভিন্ন উৎসের তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে এমন অ্যাপের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি উদ্বেগও আছে। মানুষের আর্থিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই মানব পরামর্শদাতা ছাড়া কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে দেওয়া পরামর্শ অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাধারণ হয়ে যেতে পারে।
এই কারণেই ‘আস্ক ডলি’-র উচ্চতর সদস্যপদে সরাসরি মানব আর্থিক পরিকল্পনাবিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নিজের ওপর নির্ভরতা কমাতেও চান টু
অনুসারীদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক আর্থিক পরামর্শের অনুরোধ পাওয়ার পরই এই অ্যাপ তৈরির চিন্তা আসে বলে জানিয়েছেন ভিভিয়ান টু। এটি তৈরিতে তিনি ১০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছেন বলেও জানান।
তবে তাঁর কাছে প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিনির্ভরতা কমানো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্মাতাদের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পুরো প্রতিষ্ঠান একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল থাকা।
তাই টুর লক্ষ্য, একসময় ‘আস্ক ডলি’ যেন শুধু ‘ইয়োর রিচ বাফ’-এর অনুসারীদের জন্য নয়, বরং এমন মানুষের কাছেও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে যারা তাঁকে অনুসরণই করেন না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সেবার সমন্বয়ে ভিভিয়ান টুর এই উদ্যোগ তাই শুধু নতুন একটি আর্থিক অ্যাপের যাত্রা নয়; একই সঙ্গে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্মাতারা কীভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত পরিচিতিকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় রূপ দিচ্ছেন, তারও একটি নতুন উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















