দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর একটি বড় ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরায়েল। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আলি তাহের রিজের নিচে থাকা দুই কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ দুটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করতে এক হাজার টনেরও বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, বিস্ফোরণের ফলে এমন শক্তিশালী কম্পন তৈরি হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার হিসাবে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য। বিস্ফোরণের পর আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে এবং ঘটনাস্থল থেকে ব্যাপক আগুন ও ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, ভূগর্ভস্থ এই অবকাঠামো হিজবুল্লাহর বাদর ইউনিটের একটি কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে বহু রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের পাশাপাশি ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, মাইন ও বিস্ফোরক মজুত ছিল বলে দাবি করেছে তারা।
ইসরায়েলি বাহিনীর প্রকাশ করা ছবিতে রাতের আকাশে বড় একটি আগুনের গোলা ও ধোঁয়ার স্তম্ভ দেখা যায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অবকাঠামো নির্মাণে দুই দশকের বেশি সময় লেগেছে এবং এর পরিকল্পনা ও অর্থায়নের সঙ্গে ইরান যুক্ত ছিল।
ঘটনার পর দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আলি তাহের রিজ থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত নবাতিয়েহ শহরের এক বাসিন্দা জানান, বিস্ফোরণের প্রায় ১৫ সেকেন্ড পর বিকট শব্দ শোনা যায়। পুরো বাড়ি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে। আতঙ্কে মানুষ চিৎকার করতে থাকে, শিশুরা কান্না শুরু করে এবং অনেকে গাড়ি নিয়ে বৈরুতের দিকে চলে যেতে শুরু করেন।
উপকূলীয় শহর সাইদাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। শহরটি বিস্ফোরণস্থল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে।
ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে, গত সপ্তাহে কয়েক মাসের লড়াইয়ের পর তারা আলি তাহের রিজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তাদের দাবি, ওই এলাকার আটটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করার একটি অভিযানও এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় একটি কথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে হিজবুল্লাহ বা লেবাননের সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের এই দাবির বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে সংঘাত বাড়ার মধ্যেই এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলা হয়েছে। নবাতিয়েহ আল-ফাওকা এবং টায়ার জেলার মানসুরিসহ কয়েকটি এলাকায় নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনীও তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এমটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের নবাতিয়েহ শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় সেনা মোতায়েন বাড়ানোর মাধ্যমে স্থিতিশীলতা জোরদার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। গত ২ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানোর পর লেবাননও ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশে স্থল অভিযান চালায়। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো লেবাননের ভূখণ্ডের প্রায় ৫ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে। একই সময়ে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যেও পৃথক একটি সমঝোতা হয়।
লেবানন-ইসরায়েল কাঠামোর অধীনে হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণ, দক্ষিণ লেবানন থেকে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং ওই এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ সরাসরি ওই সমঝোতার অংশ ছিল না এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনাও প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুদ্ধের তীব্রতা কমলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ও বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলমান সংঘাতে দেশটিতে অন্তত ৪ হাজার ৩৬২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৯৫ জন নারী ও ২৫৯ জন শিশু রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে নিহতদের মধ্যে কতজন যোদ্ধা এবং কতজন বেসামরিক নাগরিক, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংঘাতে তাদের ৪০ জন সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান সম্প্রসারণ এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আলি তাহের রিজের নিচের এই বিশাল ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। ভবিষ্যতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা কতটা কার্যকর হবে এবং ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে কতটা সেনা প্রত্যাহার করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















