কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার শান্ত উপকূলীয় শহর পেন্ডার হারবারে হঠাৎ হাজির হয়েছে একটি মা গ্রিজলি ও তার তিন শাবক। প্রায় ৩ হাজার মানুষের এই এলাকায় কালো ভালুকের উপস্থিতি পরিচিত হলেও গ্রিজলি এখানে বিরল। ফলে বন্দর, সড়ক ও বসতবাড়ির আশপাশে তাদের ঘোরাফেরায় স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
বৃহস্পতিবার দুপুরে শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিরাপদে ভেতরে থাকার নির্দেশ দেয়। স্থানীয় মেরিনার দিকে একটি সড়কও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে ফোন ও ফেসবুক গ্রুপে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভালুক নিয়ে সতর্কবার্তা।
তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায়, মানুষকে আক্রমণ করার চেয়ে খাবারের প্রতিই বেশি আগ্রহী ভালুকগুলো। শহরে ঢুকে তারা আপেল খাওয়ার পর মহাসড়ক ধরে চলে যায়।
গ্রিজলির পুরোনো আবাসে নতুন প্রত্যাবর্তন
প্রাদেশিক মানচিত্রে পেন্ডার হারবার অঞ্চল থেকে গ্রিজলিকে বিলুপ্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার গ্রিজলিরা এমন এলাকাতেও ফিরছে, যেখানে তাদের উপস্থিতির কোনো জীবন্ত স্মৃতি নেই।
এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দাবানল, শিকার নিষেধাজ্ঞা, কম তুষারপাত এবং খাবারের সংকট—সবই ভালুকের চলাচলের ধরন বদলে দিতে পারে। নব্বইয়ের দশকে এলাকায় এল্ক পুনঃপ্রবর্তনও গ্রিজলির আগমনে ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ এই প্রাণী শিকারিদের আকর্ষণ করে।
আগস্টের শুরুতে মা ভালুকটি তার তিন শাবককে নিয়ে অয়েস্টার বে এলাকায় যায়। সেখানে মানুষের চোখের সামনেই তারা ঝিনুক ও ক্ল্যাম খায়। ১৪ আগস্ট স্থানীয় প্রাণী উদ্ধারকর্মী ট্যামি ট্রেফ্রি ফেসবুকে বাসিন্দাদের ভালুকগুলোকে জায়গা দেওয়ার আহ্বান জানান এবং গ্রিজলির মুখোমুখি হলে শান্ত থাকার পরামর্শ দেন।
মানুষের আচরণও বদলানোর প্রশ্ন
পরদিন অ্যামেলিয়া ডান নামের এক বাসিন্দা শূকরকে খাবার দেওয়ার সময় ভালুকগুলোর মুখোমুখি হন। প্রথমে ভয় পেলেও আগের পরামর্শ মনে করে তিনি পাত্র না বাজিয়ে শান্তভাবে ভালুকগুলোকে চলে যেতে বলেন। কিছুক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণের পর ভালুকগুলো ফিরে যায়।
পরে ট্রেফ্রি বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন—এর মধ্যে ছিল নেকড়ের লোম, আলো, শব্দ এবং বৈদ্যুতিক বেড়া। তবে সবাই এসব ব্যবস্থা নিতে রাজি নন। কেউ কেউ ভালুকের দিকে কুকুরও লেলিয়ে দিয়েছেন।
গ্রিজলি শিকার একসময় বৈধ ছিল
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় কয়েক দশক আগে বড় মাংসাশী প্রাণী হত্যার জন্য পুরস্কার দেওয়া হতো। ১৯৬০-এর দশকে গ্রিজলি শিকার নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ২০১৭ সালে প্রাদেশিক সরকার গ্রিজলির ট্রফি শিকার নিষিদ্ধ করে।
সানশাইন কোস্ট বেয়ার অ্যালায়েন্সের প্রধান এভলিন কার্কালডির মতে, একসময় গ্রিজলিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল। এখন তাদের সংখ্যা পুনরায় বাড়ছে।
গত আগস্টের শেষ দিকে পেন্ডার হারবারের পরিবারটি প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে চলে যায় এবং পরে কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সাঁতরে যায়। স্থানীয় সংরক্ষণ কর্মকর্তা ডিন মিলার তখন স্বস্তি পেলেও আশঙ্কা করেছিলেন, ভালুকগুলো আবার ফিরতে পারে।
সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে তাদের আবার হাইওয়ে ১০১ ধরে দক্ষিণে, মেইডেরা পার্কের দিকে যেতে দেখা যায়। বৃহস্পতিবার তারা মেরিনার কাছে আপেল খায় এবং মানুষের উপস্থিতিতেও খুব একটা বিচলিত হয়নি।
কর্তৃপক্ষের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
মিলারের মতে, মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে ভালুকগুলোর অভ্যস্ততা বাড়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। স্কুলের কাছাকাছি তাদের অবস্থান স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।
কেউ কেউ ভালুকগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানালেও মিলার জানিয়েছেন, এমন পদক্ষেপে প্রাদেশিক জীববিজ্ঞানীসহ একাধিক পক্ষের সমন্বয় এবং জটিল প্রস্তুতি প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে এলাকায় ‘টেক্স’ নামে পরিচিত একটি গ্রিজলিকে একাধিকবার স্থানান্তর করা হয়েছিল। পরে সেটি জনবসতিতে ফিরে আসতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত টেক্সাডা দ্বীপে কৃষকদের গবাদিপশুর ওপর হামলার অভিযোগের পর গুলিতে মারা যায়। ঘটনাটির জন্য সংশ্লিষ্ট কৃষকদের ৬ হাজার কানাডীয় ডলার জরিমানাও করা হয়।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার হিসাবে, জননিরাপত্তার কারণে সংরক্ষণ কর্মকর্তারা গত বছর ২৪টি গ্রিজলি হত্যা করেছেন এবং ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত তিনটিকে হত্যা করা হয়েছে। পেন্ডার হারবারের বর্তমান পরিবারটির ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি শুধু ভালুকের নিরাপত্তা নয়—মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব, সেটিও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















