জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ১৭ জুলাইয়ের প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে চীনা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে উচ্চ রেজোলিউশনের স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করেছিল তেহরান। হামলার সঙ্গে ওই স্যাটেলাইট চিত্রের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র—এমনটাই জানিয়েছেন ঘটনার বিষয়ে অবগত কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে যুদ্ধ চলাকালে ইরানকে চীনা সহায়তা মার্কিন বাহিনীর জন্য প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে এনেছে। তবে কোন চীনা প্রতিষ্ঠান ছবি সরবরাহ করেছে, তা প্রকাশ করেননি তারা। একই সঙ্গে বেইজিং সরাসরি এই হামলায় জড়িত ছিল—এমন অভিযোগও করেননি।
জর্ডানে প্রাণঘাতী হামলা
১৭ জুলাই উত্তর-পূর্ব জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটির আবাসিক এলাকায় ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন। হামলায় তিন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং চারজন আহত হন। আহতদের চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ওই ঘাঁটিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনটি পৃথক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটি ছিল মার্কিন বাহিনীর প্রথম প্রাণহানির ঘটনা। একই সঙ্গে হামলাটি অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি ঘাঁটিতেও মার্কিন সেনা ও সামরিক সম্পদ সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট করে দেয়।
হামলার তিন দিনের মধ্যেই ইরান ঘাঁটির তিনটি পৃথক এলাকার ক্ষয়ক্ষতির উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি প্রকাশ করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে প্রকাশ্য নিম্ন রেজোলিউশনের স্যাটেলাইট ছবিতেও ওই তিন এলাকায় ২০টির বেশি স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়।
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার আগে কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা কর্মকর্তাদের সতর্ক করে আসছিল যে দেশটির কিছু প্রতিষ্ঠান ইরানকে এমন স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহ করছে, যা মার্কিন সেনা ও সামরিক সম্পদ শনাক্ত করতে কাজে লাগতে পারে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দেয় এবং অভিযোগ করে, ইরানকে স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহ করা মার্কিন ও অংশীদার দেশের সেনাদের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
১৭ জুলাইয়ের হামলার সঙ্গে যুক্ত স্যাটেলাইট চিত্রের বিষয়টি মার্কিন কর্মকর্তারা চীনা কর্মকর্তাদের কাছেও তুলেছেন। জবাবে চীন প্রমাণ দাবি করে এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে চীনা কোম্পানির সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস নির্দিষ্ট অভিযোগের জবাব না দিলেও মুখপাত্র লিউ চ্যাং বলেন, সংঘাতকে ব্যবহার করে কিছু পক্ষ অন্য দেশকে ‘বিদ্বেষপূর্ণভাবে যুক্ত ও কলঙ্কিত’ করছে। ইরানের সঙ্গে চীনের সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইরানের হামলার সক্ষমতা বাড়ার ইঙ্গিত
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের রাডার, স্যাটেলাইট ও অন্যান্য সরঞ্জামে মার্কিন হামলার ফলে দেশটির যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা কমে যায়। সে সময় ইরান অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল, যা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর অবস্থান সম্পর্কে তাদের সীমিত ধারণার ইঙ্গিত দেয়।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, গ্রীষ্মকালে ইরানের লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা উন্নত হতে দেখা যায়। সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক জিম লসনের মতে, চীনা উৎস থেকে পাওয়া নতুন উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি ঘাঁটির সাম্প্রতিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে এবং দ্রুত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বাছাই করতে ইরানকে সহায়তা করতে পারে। হামলার পরের ছবি হামলার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং পরবর্তী হামলার স্থান নির্ধারণেও কাজে লাগতে পারে।
তবে ইরানের গোয়েন্দা সক্ষমতার একমাত্র উৎস চীনা প্রযুক্তি নয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান নিজস্ব স্যাটেলাইট ও মানব গোয়েন্দা উৎসের পাশাপাশি রাশিয়া থেকেও গোয়েন্দা তথ্য ও ছবি পেয়ে থাকে।
চীনা স্যাটেলাইট ছবি ইরানকে সহায়তার বৃহত্তর একটি প্রবাহের অংশ। এর সঙ্গে নেভিগেশন সেবা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশও রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, চীন ইরানকে মার্কিন নৌ-সম্পদ শনাক্ত বা অনুসরণ করতেও সহায়তা করতে পারে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে ওয়াশিংটন প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। ফলে ইরানের হামলায় চীনা স্যাটেলাইট তথ্যের সম্ভাব্য ভূমিকার এই নতুন তথ্য দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















