২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা বিশ্ব রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গতিপথ আমূল বদলে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে দুটি বিমান আঘাত হানে, আরেকটি পেন্টাগনে বিধ্বস্ত হয়। চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে ভেঙে পড়ে। ১৯ হামলাকারী ছাড়া নিহত হন ২ হাজার ৯৭৬ জন—যাদের অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ, যারা সেদিন আর দশটি দিনের মতোই কাজে বা নিজ নিজ গন্তব্যে বের হয়েছিলেন।
কিন্তু সেই দিনটি আর সাধারণ থাকেনি। সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে বিশ্বের ধারণা বদলে গেল। একই সঙ্গে বদলে গেল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, যুদ্ধ এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের দর্শন।
পঁচিশ বছর পর তাই আবেগের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন করা জরুরি: ৯/১১-এর পর পৃথিবী কি সত্যিই নিরাপদ হয়েছে?
ভয়ের রাজনীতি এবং যুদ্ধের বিস্তার
হামলার পর আল-কায়েদা এটিকে পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে প্রচার করেছিল। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের কেন্দ্রস্থলে আঘাত হানার সক্ষমতাকে তারা নিজেদের আদর্শের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করে। মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সংঘাতের যে বয়ান তারা তৈরি করতে চেয়েছিল, সেটিও এই হামলার মধ্য দিয়ে নতুন শক্তি পায়।
এই বয়ান ছিল বিপজ্জনক এবং বিভ্রান্তিকর। নিরপরাধ মানুষ হত্যার কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বৈধতা নেই। কিন্তু উগ্রপন্থীদের এই প্রচারণাকে শুধু অস্বীকার করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ উগ্রবাদী ধারণা শূন্যস্থান থেকে জন্ম নেয় না।
আদর্শ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয় বঞ্চনার অনুভূতি, অপমান, পরিচয়ের সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সহিংসতার অভিজ্ঞতা এবং নানা ধরনের ক্ষোভ। উগ্রবাদী সংগঠনগুলো এসব অনুভূতিকে একটি সহজ ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে দেয়—আমরা নিপীড়িত, তারা শত্রু, আর সহিংসতাই সমাধান।
৯/১১-এর পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার অনেক ঘটনাই সেই প্রচারণার জন্য নতুন উপাদান তৈরি করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তাদের আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়, কারণ তারা আল-কায়েদাকে আশ্রয় দিয়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয়। নিরাপত্তা নীতিতে সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে আগাম সামরিক পদক্ষেপের ধারণাও গুরুত্ব পায়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ চালায়। অথচ ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেনের সরকার এবং আল-কায়েদা ছিল পৃথক সত্তা; পরবর্তী তদন্তেও ৯/১১ হামলায় তাদের সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবু ৯/১১-পরবর্তী ভয় ও রাজনৈতিক পরিবেশ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যেখানে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জনসমর্থন সংগঠিত করা তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।
এক সন্ত্রাসী সংগঠনের পতনের পর আরেকটির উত্থান
আল-কায়েদার গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও পরিচালনাগত সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছিল। ২০১১ সালে পাকিস্তানে অভিযান চালিয়ে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকেও হত্যা করা হয়।
কিন্তু একজন নেতা নিহত হওয়া কিংবা একটি সংগঠনের কাঠামো ভেঙে দেওয়া আর উগ্রবাদী চিন্তার পুনরুৎপাদনের পরিবেশ দূর করা এক বিষয় নয়।
আফগানিস্তান পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধে। ইরাকে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়া, সংঘাতের বিস্তার এবং সামাজিক ভাঙন নতুন উগ্রপন্থী সংগঠনের জন্য সুযোগ তৈরি করে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি ইসলামিক স্টেট। সংগঠনটি দেখিয়ে দেয়, পুরোনো জিহাদি নেটওয়ার্ক দুর্বল হলেও নতুন কাঠামো, নতুন প্রচারণা এবং ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে উগ্রবাদ আবারও সংগঠিত হতে পারে।
এখানেই ৯/১১-পরবর্তী যুগের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি দেখা যায়। সন্ত্রাসবাদ দমনের উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধই এমন কিছু পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে নতুন ধরনের উগ্রবাদ বিকাশের সুযোগ পেয়েছে।
যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১-পরবর্তী আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের যুদ্ধে সরাসরি প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছেছে। যুদ্ধের কারণে অবকাঠামো ধ্বংস, রোগ, ক্ষুধা এবং জনসেবা ভেঙে পড়ার মতো পরোক্ষ ক্ষয়ক্ষতিও হিসাব করলে মানবিক মূল্য কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায়।
এই পরিসংখ্যান নিরাপত্তার প্রচলিত সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
নিরাপত্তা মানে শুধু কোনো শহরে সন্ত্রাসী হামলা না হওয়া নয়। একজন মানুষ যদি যুদ্ধের কারণে ঘর হারান, একটি পরিবার যদি খাদ্য ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়, কোনো সমাজ যদি দীর্ঘ সংঘাতের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পারস্পরিক আস্থা হারায়—তাহলে সেই সমাজকে কতটা নিরাপদ বলা যায়?
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থাকবে। সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ককে প্রতিহত করতে হবে, গোয়েন্দা সহযোগিতা জোরদার করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে হবে। নিজেদের জনগণকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব।
কিন্তু সন্ত্রাস দমনের কৌশল যদি কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে, তাহলে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অমীমাংসিত থেকে যায়।
উগ্রবাদের লড়াই শুধু অস্ত্রের নয়
উগ্রবাদ মূলত ধারণা, পরিচয় ও বয়ানেরও লড়াই। একজন মানুষ কেন সহিংস কোনো মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ধর্মীয় মতাদর্শের মধ্যে খুঁজলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
কেউ অপমানিত বা অবহেলিত বোধ করতে পারেন। কেউ সমাজে নিজের জায়গা খুঁজে না পেয়ে কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে পরিচয় ও স্বীকৃতি খুঁজতে পারেন। আবার যুদ্ধ ও সহিংসতার দৃশ্য বারবার দেখার অভিজ্ঞতা কারও মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।
উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো এই আবেগগুলোকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অর্থ দেয়। তারা প্রতিটি ক্ষোভের জন্ম দেয় না; বরং বিদ্যমান ক্ষোভগুলোকে একত্র করে একটি শত্রু নির্ধারণ করে এবং সহিংসতাকে তার প্রতিকারের পথ হিসেবে হাজির করে।
এ কারণেই রাষ্ট্রের নীতিও সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ফলাফল নির্ধারণ করে। বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক দখল, নীতির ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর সম্মিলিত শাস্তির অভিযোগ—এসব এমন প্রচারণার উপাদান হয়ে উঠতে পারে, যা উগ্রবাদীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।
এর অর্থ শক্তি প্রয়োগের অধিকার রাষ্ট্রের নেই—এমন নয়। বরং শক্তি প্রয়োগের সঙ্গে ন্যায়বিচার, সামঞ্জস্য, জবাবদিহি এবং সংঘাত-পরবর্তী সমাজ পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
সাফল্যের মাপকাঠি কি বদলানো দরকার?
সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সাফল্য সাধারণত কতজন জঙ্গি নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে, কতটি প্রশিক্ষণশিবির ধ্বংস হয়েছে কিংবা কতটি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে—এসব দিয়ে বিচার করা হয়।
কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে: নতুন প্রজন্মের কতজন মানুষ সহিংসতাকে অর্থবহ বা ন্যায্য পথ হিসেবে দেখতে শুরু করছে?
সামরিক অভিযান একটি প্রশিক্ষণশিবির ধ্বংস করতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থা যোগাযোগের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে পারে। পুলিশ সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ একা সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা দূর করতে পারে না, যা উগ্রবাদী বক্তব্যকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
সেখানে প্রয়োজন অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান কিন্তু অনেক কঠিন কিছু কাজ—রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বৈষম্য ও বঞ্চনার কারণগুলো মোকাবিলা করা, স্থানীয় সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করা এবং সহিংসতার বাইরে এমন পরিচয় ও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা, যেখানে তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পারে।
৯/১১-এর স্মৃতি এবং পরবর্তী শিক্ষাগুলো
৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তিতে নিহতদের স্মরণ করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু স্মরণ যদি কেবল শোক ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই ইতিহাস থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া হবে না।
সেই শিক্ষা হলো, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ভয়কে নীতিনির্ধারণের একমাত্র চালিকাশক্তি বানানো বিপজ্জনক। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখারও কোনো প্রয়োজন নেই।
পৃথিবীকে এমন একটি পথ খুঁজতে হবে যেখানে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থাকবে, কিন্তু সেই লড়াইয়ের নামে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে না যা নতুন ক্ষোভ, বিচ্ছিন্নতা ও ঘৃণাকে উসকে দেয়।
সন্ত্রাসবাদ অবশ্যই পরাজিত করতে হবে। কিন্তু শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে জয় যথেষ্ট নয়। যদি সন্ত্রাস দমনের প্রতিক্রিয়াই নতুন প্রজন্মের মধ্যে ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়, তাহলে একের পর এক যুদ্ধ জেতা সম্ভব হলেও বৃহত্তর লক্ষ্য—একটি সত্যিকার অর্থে নিরাপদ সমাজ—অর্জন করা কঠিন হয়ে থাকবে.
আরিফ বুদি সেতিয়াওয়ান 



















