সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা বেড়ে যাওয়ার পর ইরানকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সতর্ক করেছে পাকিস্তান। একই সময়ে সৌদি আরব ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক নিজেদের প্রতিরক্ষা সমন্বয়ও জোরদার করেছে।
সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে পাকিস্তান ইরানের কাছে সৌদি আরবের এই সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে। ইসলামাবাদ চায়, ইয়েমেনের ইরানঘনিষ্ঠ হুতিদের ওপর তেহরান তার প্রভাব ব্যবহার করে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বন্ধ করুক। পাকিস্তানের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছানো ঠেকানো, যেখানে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
মঙ্গলবার হুতিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকায় একটি বিমানঘাঁটি এবং আশপাশের কয়েকটি শহরের তেল অবকাঠামোতে হামলা চালায়। সৌদি কর্তৃপক্ষের হিসাবে এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবের ওপর এটি ছিল সবচেয়ে বড় হুতিদের হামলাগুলোর একটি।
এর পর বুধবার হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, গত ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে সৌদি যুদ্ধবিমান ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ইয়েমেনের এই সংঘাত এমন এক সময়ে আরও তীব্র হয়েছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ফলে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘর্ষ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইতোমধ্যে জাহাজ চলাচল এবং তেল সরবরাহ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে।
পাকিস্তানের সতর্কবার্তা
পাকিস্তানের সতর্কবার্তার গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। ইসলামাবাদ বলছে, সৌদি ভূখণ্ডে হামলা হলে ওই চুক্তির আওতায় যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ দেশটির টেলিভিশনে বলেছেন, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর আগ্রাসন হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সৌদি আরবে ‘উসকানিহীন আগ্রাসন’ বা সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এখনই ইয়েমেনে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার কথা বলছেন না। তাদের বক্তব্য, সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক চুক্তিটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক এবং এর আওতা সৌদি ভূখণ্ড সুরক্ষার মধ্যেই সীমিত।
এক পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা রিয়াদে বৈঠক করে পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়ে সমন্বয় করেছেন। তিন দেশই একমত হয়েছে যে তাদের সেনারা ইয়েমেনে প্রবেশ করবে না। প্রয়োজনে সৌদি ভূখণ্ড থেকেই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরেক পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের পাল্টা হামলায় পাকিস্তানের সেনারা সরাসরি অংশ নেবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে সৌদি আরবের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনী সামরিক, কারিগরি, স্থল বা আকাশ সহায়তা দিতে পারে। বিদেশের মাটিতে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করবে না পাকিস্তানি বাহিনী।

ইরানের ভিন্ন বক্তব্য
পাকিস্তানের মাধ্যমে দেওয়া বার্তার জবাবে ইরান জানিয়েছে, তারা হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে না। ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পাকিস্তানের বার্তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তেহরানের অবস্থান হলো—হুতিদের ওপর ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই।
তবে ইরানের দুটি সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহেই তেহরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা চালাতে উৎসাহিত করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান অতিরিক্ত অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কয়েকজন কমান্ডার ইয়েমেনে গিয়ে হামলার সমন্বয়ে সহায়তা করেছেন বলেও তারা দাবি করেন।
এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এক আঞ্চলিক কূটনীতিক জানান, ইসলামাবাদ এখন মূলত হুতিদের হামলা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। কারণ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে রিয়াদ পাকিস্তানের কাছে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় আরও সক্রিয় সামরিক ভূমিকা চাইতে পারে।
ওই কূটনীতিক বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের চুক্তি থাকলেও তিনি আশা করছেন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাবে না, যেখানে পাকিস্তানকে বাস্তবে যুদ্ধে নামতে হবে। আপাতত ইসলামাবাদ কূটনৈতিক সমাধানের পথেই এগোতে চায়।
ইরানের কৌশল কি উল্টো ফল দিতে পারে?
আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মতে, সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ইরানি কৌশল উল্টো ফল দিতে পারে।
তেহরান যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে চায়, তাহলে এর ফলে সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অন্যান্য দেশ আরও বেশি নিরাপত্তা সহযোগিতায় জড়িয়ে পড়তে পারে।

অর্থাৎ, ইরান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চাইছে, সংঘাতের বিস্তার তার বদলে ওই দেশগুলোর সামরিক সমন্বয় আরও জোরদার করতে পারে।
ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শিগগিরই তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী।
তবে কাতার নীরবে নতুন কিছু প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।
এক আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের সামরিক প্রতিক্রিয়া আপাতত ইরানের দিকে সরাসরি না গিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধেই সীমিত থাকবে। রিয়াদের কর্মকর্তারাও মনে করেন না যে সৌদি আরবে হুতিদের হামলা চালিয়ে তেহরানের বৃহত্তর লক্ষ্য—যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার—অর্জন করা সম্ভব হবে।
ওই সূত্রের মতে, সৌদি আরব ওয়াশিংটনের ওপর অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার সম্ভাবনাও কম। কারণ ট্রাম্প মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখাই ইরানকে আলোচনায় আনতে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, ইরান কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে এবং কতদিন তা সহ্য করতে পারবে। আঞ্চলিক সূত্রগুলোর মতে, ট্রাম্প সরাসরি সামরিক সমাধানের বদলে অবরোধের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে সমঝোতায় যেতে চাইছেন।
তবে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা এবং তার পাল্টা জবাব যদি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে ইয়েমেনের যুদ্ধ নতুন করে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















